রোহিঙ্গা এখন গলার কাঁটা

চুক্তি-বিচার সব ডেমকেয়ার : একজনকেও ফেরত নেবে না মিয়ানমার

বিশেষ প্রতিনিধি : চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক আদালতের নির্দেশনার পরও বাংলাদেশ থেকে একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত নেয়নি মিয়ানমার। রোহিঙ্গাদের আর দেশে ফিরিয়ে নিতে হবে না বলে প্রায় নিশ্চিত দেশটি। আন্তর্জাতিক আদালতে হেরে যাওয়া বা ভর্ৎসনায় তারা একটুও লজ্জিত নয়। বরং চুরির ওপর শিনাজুরির মতো হাসছে কূটনৈতিক বিজয়ের হাসি। তার ওপর করোনা মহামারি তাদের জন্য বাড়তি আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী দুই সদস্য চীন ও রাশিয়া শুরু থেকেই মিয়ানমারের পক্ষে। আমেরিকা এমনকি বন্ধুরাষ্ট্র কৌশলে নীরব দর্শকের গ্যালারিতে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে ভালো বন্ধু হিসেবে পরিচিত ভারতও রোহিঙ্গা ইস্যুতে কখনো গোপনে, কখনো-বা প্রকাশ্যে মিয়ানমারকেই সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে!
আন্তর্জাতিক বিশ্বের অন্য যারা মাঝেমধ্যে মিয়ানমারকে টুকটাক চাপ দিত, তারাও করোনাকালে এ নিয়ে মাথা ঘামানোর ফুরসত পাচ্ছে না। বাংলাদেশের লবি, দেন-দরবার, তদবিরও থমকে গেছে। এই সুযোগে কূটনীতির মারপ্যাঁচে কোণঠাসা না হয়ে জবরদস্তিই করে যাচ্ছে মিয়ানমার। আর দমে যাচ্ছে বাংলাদেশ। রাখাইনে গত কিছুদিন ধরে যে বিধ্বংসী অভিযান ও নিষ্ঠুরতা চলছে, তা নিয়ে টুঁ শব্দও হচ্ছে না। গণমাধ্যমে কোনো খবরও নেই। উপরন্তু বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা সরদারদের কারো কারো সঙ্গে মিয়ানমারের গোপন সংযোগ তৈরি হয়েছে। সেখান থেকে নানা কৌশল সাপ্লাই করা হচ্ছে তাদের জন্য। এর অংশ হিসেবে এবার ২৫ আগস্টে সরবে তৃতীয় ‘রোহিঙ্গা জেনোসাইড রিমেম্বার ডে’ পালন করেনি রোহিঙ্গারা। বলা হয়েছে, আওয়াজ না দিতে। নীরব থাকতে।
এর আগে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে বড় আকারে সমাবেশ আয়োজন, মসজিদে মসজিদে দোয়া, ব্যানার-ফেস্টুন, টি-শার্ট ইত্যাদি নিয়ে ব্যাপক পরিসরে দিনটি পালন করে বিশ্ব গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়েছে রোহিঙ্গারা। এবার সে ধরনের কিছুতে যায়নি। রোহিঙ্গাদের সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইট ফর পিস অ্যান্ড হিউমিনিটি-এআরএসপিএসের নেতাদের মতিগতি রহস্যজনক। টেকনাফ ও উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে রোহিঙ্গা সংগঠন ভয়েস অব রোহিঙ্গা, স্টুডেন্ট ইউনিয়ন, রোহিঙ্গা স্টুডেন্ট নেটওয়ার্ক, রোহিঙ্গা ইয়ুথ ফর লিগ্যাল অ্যাকশন, রোহিঙ্গা ইয়ুথ ফেডারেশন, রোহিঙ্গা কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম, এডুকেশন ফর রোহিঙ্গা জেনারেশন, রোহিঙ্গা ওমেন ফর জাস্টিস অ্যান্ড পিস ইত্যাদি সংগঠন বেশ তৎপর।
অসহায় হয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের অসহায়ত্ব কেটে গেছে আরো আগেই। এরা এখন পরাক্রমশালী। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, মাদক-অস্ত্র ব্যবসা, মানবপাচারসহ নানা অপকর্মে এরা লিড করছে। গত তিন বছরে বিভিন্ন থানায় দেড় হাজারের মতো মামলা হয়েছে তাদের নামে। অপকর্মের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় মাঝেমধ্যে ক্রসফায়ারে খরচ করে দিতে হচ্ছে। স্থানীয় রাজনীতিক ও জনপ্রতিনিধিরাও বেশ নির্ভর করছেন তাদের ওপর। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেও বেশ সমাদর। রাখাইনে ধাওয়া খেয়ে কক্সবাজারে আছড়ে পড়ার পর স্থানীয় পর্যায়ে শুরু হওয়া সহযোগিতা এখন বিশ্বপরিসরেও। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাদের এখন বহু হিতাকাক্সক্ষী। চতুর্মুখী আশীর্বাদে রোহিঙ্গাদের অপকর্ম এখন আর ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্প বা আশপাশে সীমিত নয়। একসময় তাদের প্রতি যাদের সহমর্মিতা-ভালোবাসা কাজ করত, তারাও তিন বছরের ব্যবধানে থ বনে গেছে।
শুরুতে নানা পদক-পুরস্কার, বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণসহ নানা হিসাব থাকলেও দিনকে দিন রোহিঙ্গাদের নিয়ে সরকারের হিসাব অমিল হয়ে গেছে। দেশে দফায় দফায় ঠাঁই নেওয়া ১১ লাখ রোহিঙ্গার দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে বাংলাদেশ সরকারসহ বিভিন্ন সূত্র থেকে ব্যয়ের জোগান আসছে। এ ছাড়া ত্রাণ বা সহায়তা বাবদ রোহিঙ্গাদের পেছনে দাতাগোষ্ঠী বা অন্য কোনো সূত্র থেকে আর্থিক সহায়তা আসছে। সেখান থেকে কিছু এদিক-সেদিক হচ্ছে। এর বাইরে রোহিঙ্গাদের জন্য সরকার ব্যয় দেখাচ্ছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। এই হিসাবে গত তিন বছরে রোহিঙ্গাদের পেছনে সরকারের সরাসরি ব্যয়ের পরিমাণ ৯০ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল টাকা নিয়ে নানা কাহিনি ও ঘটনা ঘটছে। হিসাব ও টার্গেট বুমেরাং হয়ে যাওয়ায় রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চেষ্টায় নামে সরকার। শুরুতে দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমাধানের চেষ্টা করেছে। পাশাপাশি আঞ্চলিক শক্তিগুলো, যেমন আসিয়ান, ভারত, চীন, কোরিয়া ও জাপানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। বহুপক্ষীয় ব্যবস্থায় যেমন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ, নিরাপত্তা পরিষদ, মানবাধিকার কাউন্সিলসহ অন্যান্য যেসব মেকানিজম আছে, সব জায়গায় ধরনা দিয়েছে। কিন্তু চেষ্টার যোগফল অনুকূলে নয়।
এদিকে রোহিঙ্গাদের অবস্থান ও সংখ্যা নিয়েও ভেতরে ভেতরে গোলমাল যাচ্ছে। বলা হয়ে আসছে, কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলায় প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গার আশ্রয় নেওয়ার কথা। তাদের প্রায় ৯ লাখ এসেছে ২০১৭ সালের আগস্টের পরে। এর আগে ২০১৬ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনী অপারেশন শুরু করলে এবং ২০১২ সালে রাখাইনে জাতিগত দাঙ্গা শুরু হলে অনেক রোহিঙ্গা পালিয়ে আসে। এর আগে ১৯৯২ সালে যে রোহিঙ্গারা পালিয়ে এসেছিল, তাদের মধ্যেও ৩৬ হাজার রোহিঙ্গা এখনো বাংলাদেশে অবস্থান করছে। কিন্তু সবার ঠিক-ঠিকানা মিলছে না। প্রত্যাবাসনের জন্য যাচাই-বাছাই করতে সরকার পাঁচ দফায় ৮ লাখ ৫৩ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা মিয়ানমার সরকারকে দিয়েছিল। প্রথম দফায় ৮ হাজার ৩২ জনের মধ্যে যাচাই-বাছাই করা হয়েছে ৫ হাজার ৩৮৪ জনের। দ্বিতীয় দফায় ২২ হাজার ৪৩২ জনের মধ্যে যাচাই-বাছাই হয়েছে মাত্র ৪ হাজার ৬৫০ জনের। অর্থাৎ সাড়ে আট লাখের মধ্যে ১০ হাজারেরও যাচাই-বাছাই শেষ করেনি মিয়ানমার।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর উদ্যোগ কোভিড-১৯ মহামারির কারণে আরও স্তিমিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে, মহামারির মধ্যেও রাখাইনে বিধ্বংসী অভিযান এবং নিষ্ঠুরতা এখনো চালিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমার। আন্তর্জাতিক আদালতের নির্দেশনাকেও পরোয়া করছে না তারা। রোহিঙ্গা নির্যাতনের কারণে মিয়ানমারকে নিয়ে বিশ্বব্যাপী সমালোচনা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু দিন শেষে কূটনীতির মারপ্যাঁচে তারাই যেন অনেকটা এগিয়ে। কারণ শক্তিশালী কোনো দেশ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে বড় কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। আমেরিকা সেনাবাহিনীর কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে নিষিদ্ধ করেছে, কিন্তু এটা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কোনো প্রভাব ফেলছে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নও রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিল, কিন্তু সেটা বাস্তবে কোনো কাজেই আসেনি।
টেকনাফ ও উখিয়ায় বাংলাদেশির সংখ্যা ৫ লাখ ৭০ হাজার। কিন্তু রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ১১ লাখের মতো। এই রোহিঙ্গাদের জন্য প্রায় সাত একর বনভূমি নষ্ট হয়েছে এবং এর ফলে সেখানকার জীববৈচিত্র্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভূমিধসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কক্সবাজারে জমি কমে যাওয়ায় কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে এবং প্রতিদিন বাড়তি পানি ও অন্যান্য পণ্যের চাহিদার কারণে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে রোহিঙ্গারা এখন বাংলাদেশের জন্য গলার কাঁটা ছাড়া আর কিছুই নয়।