রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: জাতিসংঘে প্রস্তাব পাস মিয়ানমারের বিরুদ্ধে

বিশ্বচরাচর ডেস্ক : রোহিঙ্গা নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিন্দা জানিয়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে আরেকটি প্রস্তাব পাস হয়েছে। গত ১৬ নভেম্বর সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে গৃহীত প্রস্তাবে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছা, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন এবং প্রত্যাবাসনের পর তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাসের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। ইইউ ও ওআইসির যৌথভাবে আনীত প্রস্তাবটি উন্মুক্ত ভোটের মাধ্যমে গৃহীত হয়। ১৪২-২৬ ভোটে প্রস্তাবটি পাস হয়।
চীন, রাশিয়া ও কম্বোডিয়াসহ ১০টি দেশ প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয়। ২৬টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে। জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মুসলিম দেশগুলোর জোট ওআইসির পক্ষে বাংলাদেশ এবং ইউরোপের জোট ইইউর পক্ষে অস্ট্রিয়া যৌথভাবে প্রস্তাবটি উপস্থাপন করে। ওআইসি ও ইইউর সব সদস্য রাষ্ট্র এবং যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও মেক্সিকোসহ ১০৩ দেশ প্রস্তাবটি কো-স্পন্সর করে। প্রস্তাবটি ভোটে যাওয়ার আগে এর যৌক্তিকতা তুলে ধরে ওআইসির পক্ষে তুরস্কের প্রতিনিধি ও ইইউর পক্ষে অস্ট্রিয়ার প্রতিনিধি বক্তব্য রাখেন। তুরস্ক ও অস্ট্রিয়ার বক্তব্য সমর্থন করে প্রস্তাবের পক্ষে ভোটদানের আহ্বান জানায় যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও বাংলাদেশ। ভোটগ্রহণের আগে ও পরে দেয়া বক্তব্যে প্রায় সব সদস্য দেশ রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দেয়ায় বাংলাদেশের অবদানের কথা উল্লেখ করে। অপর দিকে প্রস্তাবে মিয়ানমারের নিন্দার পাশাপাশি মুসলিম জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেয়ার পথ তৈরি করতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন প্রস্তাবের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের প্রতি দায়িত্ব পালনের স্বার্থে প্রস্তাবকে সমর্থন করতে সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান।
গত ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশ থেকে স্বেচ্ছায় রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত না যাওয়া প্রসঙ্গে মাসুদ বিন মোমেন বলেন, মিয়ানমারের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে এবং মিয়ানমারের ছাড়পত্র অনুযায়ী কিছু রোহিঙ্গা পরিবার ও সদস্যদের স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসন কাজ আমরা শুরু করতে সম্মত হয়েছিলাম। কিন্তু তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের আশ্বাসের প্রতি কোনোভাবেই আস্থা রাখতে পারেনি এবং একটি পরিবারও মিয়ানমারে স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে সম্মত হয়নি।
নাগরিকত্বের পূর্ণ নিশ্চয়তা, নিজভূমিতে অধিকার প্রতিষ্ঠা ও ক্ষতিপূরণ দান, সহিংসতা থেকে সুরক্ষা এবং ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পূর্ণ নিশ্চয়তা ছাড়া মিয়ানমারে তারা ফিরে যাবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে। অতএব রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরির নিশ্চয়তার জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে অবশ্যই কাজ করতে হবে। মিয়ানমারে বিদেশিদের বাধাহীন প্রবেশের সুযোগ করে দিতে হবে।
রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় ও মর্যাদার সঙ্গে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে শেখ হাসিনা সরকারের নীতিগত অবস্থানের কথা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আবারও মনে করিয়ে দেন রাষ্ট্রদূত মাসুদ। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের রাখা বা জোর করে ফেরত পাঠানো- এর কোনোটিতেই একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের কোনো স্বার্থ নেই।
প্রস্তাবে ওআইসির পক্ষে বক্তব্যে জাতিসংঘে তুরস্কের স্থায়ী প্রতিনিধি ফরিদুন সিনিরলিগ্লু বলেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে নানা কৌশলে নির্যাতিত হয়ে আসছে। ২০১৭ সালে তাদের ওপর অভিযান ছিল ওই কৌশলেরই একটি ধাপ। সবাই মিলে সমন্বিত একটি কৌশল প্রণয়ন করতে না পারলে এ সংকটের সমাধান অসম্ভব বলে তিনি মতপ্রকাশ করেন। তিনি আরও বলেন, ওআইসি মনে করে, রোহিঙ্গাদের অধিকার নিয়ে মিয়ানমারে বসবাস নিশ্চিত করতে হবে, আর তাদের ওপর নিপীড়নকারীদের শাস্তি না হলেও এটা অসম্ভব।
গত বছরও সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে ওআইসির আহ্বানে উন্মুক্ত ভোটের মাধ্যমে একই বিষয়ে প্রস্তাব গৃহীত হয়। পরবর্তী সময়ে সাধারণ পরিষদের প্লেনারিতে এটি পুনরায় পাস হয়। সে সময় তৃতীয় কমিটির এ প্রস্তাবে ১৩৫টি দেশ পক্ষে, ১০টি দেশ বিপক্ষে ভোট দেয় এবং ২৬টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে। গত বছর সাধারণ পরিষদ গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী মিয়ানমারে জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ প্রতিনিধি নিয়োগ করা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, গত বছরের চেয়েও বেশি ভোটে এবারের প্রস্তাব পাস- মিয়ানমারের বিপক্ষে বিশ্ব জনমতের অধিকতর জোরাল অবস্থানেরই সুস্পষ্ট প্রতিফলন। তৃতীয় কমিটিতে গৃহীত এ প্রস্তাব আগামী ডিসেম্বরে সাধারণ পরিষদের প্লেনারিতে উপস্থাপিত হবে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে চলমান মিয়ানমার সংকটের সুষ্ঠু ও স্থায়ী সমাধানে এ প্রস্তাব তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জোরাল প্রত্যাশা।

পুনর্বাসনে ব্যর্থ হওয়ায় বাংলাদেশকে দায়ী করছে মিয়ানমার

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে পুনর্বাসনে ব্যর্থ হওয়ায় বাংলাদেশ সরকারকে দোষারোপ করছে মিয়ানমার। দুই দেশের চুক্তি অনুযায়ী গত ১৫ নভেম্বর দুই হাজার রোহিঙ্গা রাখাইন রাজ্যে ফেরত পাঠানোর কথা থাকলেও কোনো রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফেরত যায়নি। মিয়ানমারের পক্ষ থেকে বলে হচ্ছে, দেশটির কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গাদের দেশে গ্রহণ করার অপেক্ষায় ছিল। আর এ দুই হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরতের মাধ্যমে পুনির্বাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে না পারায় বাংলাদেশ সরকারকে দুষছে তারা। এ খবর জানিয়েছে দেশটির স্থানীয় মিডিয়া মিয়ানমার টাইমস।মিয়ানমারের স্থায়ী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউ মাইয়ান্ত থু এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের চুক্তি বাংলাদেশ সরকার মানতে ব্যর্থ হয়েছে। পুনর্বাসন তালিকায় যাদের নাম ছিল, তাদেরকে জানাতে বাংলাদেশ সরকার ব্যর্থ হয়েছে। দুই দেশ যে পর্যায়ে সহমত পোষণ করেছিল, বাংলাদেশ সরকার সে আয়োজন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে তিন ধরনের রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে।
তাদের মধ্যে এক গোষ্ঠী আছে যারা মিয়ানমারে ফেরত না এসে তৃতীয় কোনো দেশে এক্সেতে চায়। দ্বিতীয়ত, যারা গত বছর ২৫ অক্টোবরে যারা রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা চালিয়েছিল এবং তৃতীয়ত যারা মিয়ানিমারে আত্মীয়-স্বজনের কাছে ফেরত আসতে চায়। প্রথম ও দ্বিতীয় ক্যাটাগরির শরণার্থীরা ফেরত আসবে না। তবে আমরা অবশ্যই স্বীকৃত শরণার্থীদেরই দেশে গ্রহণ করব। আর মিয়ানমার সরকার চুক্তি অনুযায়ী তাদেরকে পুনর্বাসন এবং পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাজ চালিয়ে যাবে।
এর আগে গত অক্টোবর মাসে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পুনির্বাসনের চুক্তি সাক্ষর করে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার। গত ১৫ নভেম্বর পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা থাকলেও, রোহিঙ্গারা দেশে সুরক্ষিত নয় বলে আন্তর্জাতিক মহল এ চুক্তি স্থগিতের দাবি জানায়।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ শরণার্থী ত্রাণ ও পুনর্বাসন পরিষদের পক্ষ থেকে জানিয়েছে, পুনর্বাসন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে কেননা শরণার্থীরা ফেরত যেতে চায় না। যদিও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাদের দেশে ফেরত যেতে উৎসাহিত করা হয়েছে।
রাখাইন রাজ্যবিষয়ক কফি আনান পরিষদের একজন সাবেক সদস্য ইউ আয়ে লাউয়িন বলেন, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কাছে প্রমাণ করতে হবে যে তারা দেশে ফিরে সুরক্ষিত থাকবে। শরণার্থী শিবিরে এমন কেউ নেই যারা দেশে ফিরে যেতে চায় না। মূলত, রোহিঙ্গাদের দাবি অনুযায়ী তাদের সুরক্ষা ও জীবিকাসংক্রান্ত নিশ্চয়তা মিয়ানমার সরকার দিলেই এ সমস্যার সহজ সমাধান হবে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আগামী বছর পর্যন্ত স্থগিত

রোহিঙ্গাদের নিজদেশে প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা ২০১৯ সাল পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়েছে। শরণার্থী বিষয়ক ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আবুল কালামের বরাত দিয়ে এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। গত ১৮ নভেম্বর রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এ বছরের শেষে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন পর্যন্ত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। প্রত্যাবাসন শুরু করার জন্য নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী দ্বারা শুরু হওয়া গণহত্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। আরসা বিদ্রোহীদের হামলার জবাবে এই অভিযান শুরু হয় বলে দাবি করে থাকে মিয়ানমার। তবে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের দাবি, সেনা সদস্য ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী বেসামরিক মানুষ তাদের হত্যা, ধর্ষণ এবং ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিতে থাকায় পালাতে বাধ্য হয়েছে তারা। জাতিসংঘ সমর্থিত একটি তদন্ত দল মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গণহত্যা ও জাতিগত নিধনযজ্ঞের উদ্দেশ্যে অভিযান চালানোর অভিযোগ আনে।
এ বছরের অক্টোবরের শেষে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার রোহিঙ্গা মুসলিমদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে একমত হয়।
কিন্তু রোহিঙ্গারা এ পরিকল্পনার বিরোধিতা করতে থাকে। একইসঙ্গে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ও বিভিন্ন দাতা গোষ্ঠীও এখনি মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনার সমালোচনা করে। চুক্তি অনুযায়ী এ মাসের ১৫ তারিখ প্রথমপর্যায়ে ২২০০ রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু শরণার্থী শিবিরে উত্তেজনা দেখা দিলে এ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। রোহিঙ্গারা দাবি করে, তাদের ওপর চালানো গণহত্যার বিচার ও মিয়ানমারের নাগরিকত্ব না দেয়া হলে তারা ফেরত যাবে না।