রোহিঙ্গা ফেরাতে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে বাংলাদেশ

ঠিকানা ডেস্ক : রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্মম গণহত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১১ লাখ রোহিঙ্গা নিয়ে সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহলের অনুরোধে মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলেও তাদের প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে এখন এগিয়ে আসছে না তারা। প্রত্যাবাসনে বাধ্য করতে মিয়ানমারকেও কোনো ধরনের চাপ দিচ্ছে না আন্তর্জাতিক মহল। দুই বছরে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক তৎপরতাও তেমন কাজে আসছে না। পরপর দুইবার প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ায় বাংলাদেশের হতাশা যেমন বাড়ছে, তেমনি অনিশ্চয়তাও তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর অপতৎপরতাও যুক্ত হয়েছে প্রত্যাবাসনে বাধা সৃষ্টি করতে। এ অবস্থায় রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে দিতে বাংলাদেশ কঠোর অবস্থান নিতে যাচ্ছে।

কূটনৈতিক সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক মহলের অনুরোধে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলেও প্রত্যাবাসনে তাদের ভূমিকা নিয়ে আসন্ন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সম্মেলনে জোরাল বক্তব্য তুলে ধরবে বাংলাদেশ। বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘ ও নিরাপত্তা পরিষদ কার্যকর কী পদক্ষেপ নেবে, সে বিষয়ে জোর দেবে বাংলাদেশ। বিশেষ করে, রাখাইনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে বাধ্য করতে আন্তর্জাতিক মহল কী করবে, সে বিষয়ে বাংলাদেশ জানতে চাইবে। এ লক্ষ্যে আসন্ন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সম্মেলনে একটি সেশনও থাকবে বলে সম্প্রতি জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক। এ ছাড়া রাখাইনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে মিয়ানমারকেও আন্তর্জাতিকভাবে জবাবদিহিতার জায়গায় নেওয়ার চেষ্টা করবে বাংলাদেশ। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে কী ধরনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, তা পর্যবেক্ষণে বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি কমিশন গঠন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

সূত্র জানায়, গত ২২ আগস্ট রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আশাবাদী ছিল বাংলাদেশ। এ জন্য সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াটি সরাসরি পর্যবেক্ষণ ও রোহিঙ্গাদের উৎসাহিত করতে ঢাকায় নিযুক্ত চীন ও মিয়ানমার দূতাবাসের প্রতিনিধিরা কক্সবাজার গিয়েছিলেন। কিন্তু তাতেও প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়ায় ঘরে-বাইরে নানা সমালোচনার মুখে পড়ছে সরকারও। ফলে বিষয়টি আরও শক্ত হাতে পরিচালনার সিদ্ধান্তের দিকে যাচ্ছে সরকার। এ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন গত ২৩ আগস্ট বলেন, এখন থেকে শক্ত অবস্থানের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের সে দেশে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার ও আন্তর্জাতিক মহলকে রাজি করাতে বাংলাদেশ সরকার কাজ করবে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সফল করার দায়িত্ব আন্তর্জাতিক মহল ও মিয়ানমারের। কারণ, আমরা আন্তর্জাতিক মহলের কথা শুনেছি। মানবিক দিক থেকে আমাদের যা যা করার ছিল, সব করেছি। এখন রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব মিয়ানমারের এবং এ কাজে বাধ্য করার দায়িত্ব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের। তাদের নাগরিকদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের বুঝিয়ে দেশে ফেরত নেওয়ার দায়িত্ব মিয়ানমারের। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীন, রাশিয়া, ভারত ও মিয়ানমার এখন আমাদের অবস্থানের সঙ্গে একবাক্যে সমর্থন দিচ্ছে।পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি জোর দাবি জানাব। আমরা আন্তর্জাতিক মহলকে বলব তারা যেন মিয়ানমারে যায়। এ জন্য একটি কমিশন করা যেতে পারে। কমিশন, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা এবং অন্যান্য সবার এখন কাজ হচ্ছে মিয়ানমার যাওয়া। সেখানে গিয়ে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা। আমাদের এখানে তাদের আর কাজ নেই। সেখানে যদি তাদের প্রবেশ করতে না দেয়, তাহলে আমি বলব তারা মিয়ানমারের সঙ্গে ব্যবসা করে কেন? যুক্তরাষ্ট্রে মিয়ানমার এখনও জিএসপি সুবিধা পায় কেন? তিনি বলেন, ‘আমি বলব, জাতিসংঘ রোহিঙ্গা ইস্যুতে কিছু ভুল করেছে। তবে এখন সবাইকে নতুন করে ভাবতে হবে।’ মিয়ানমারের উদ্দেশে তিনি বলেন, মিয়ানমারকে তাদের লোকদের মধ্যে আস্থা আনতে হবে। এ দায়িত্ব মিয়ানমারের, আমাদের না। আমরা অনেক করেছি। নিজেদের এবং এ অঞ্চলের শান্তিশৃঙ্খলার স্বার্থে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে হবে।’