লালমনিরহাটে পুড়িয়ে দেওয়া সেই যুবক ছিলেন নামাজি

ঠিকানা অনলাইন : লালমনিরহাটের পাটগ্রামে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা সেই যুবকের পরিচয় পাওয়া গেছে। নিহত ব্যক্তির নাম শহিদুন্নবী জুয়েল। তার বাড়ি রংপুরের শালবনে।

জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লাইব্রেরি সায়েন্সে পড়ালেখা শেষ করে রংপুরের ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে লাইব্রেরিয়ান হিসেবে চাকরি নেন তিনি। বছরখানেক আগে তাকে বাধ্যতামূলকভাবে রিজাইন করানো হয়। শহিদুন্নবী জুয়েল ব্যক্তিগত জীবনে ধার্মিক ও ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন বলে জানিয়েছেন তার পরিবার ও প্রতিবেশীরা।

চাকরি না থাকাসহ নানা কারণে জুয়েল গত কয়েক দিন ধরে মানসিকভাবে কিছুটা ভারসাম্যহীন ছিলেন বলে জানিয়েছে তার পরিবার। তবে তিনি বদ্ধ উন্মাদ ছিলেন না।

এদিকে শহিদুন্নবী জুয়েলকে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় তিনজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। জেলা প্রশাসন ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে। আগামী ১ নভেম্বর রোববারের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবে কমিটি। ঘটনার শুরুতে কে বা কারা কোরআন শরিফ অবমাননার গুজব ছড়িয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে মাঠে নেমেছে সিআইডি।

জানা গেছে, সুলতান জোবায়ের আব্বাস নামের এক দলিল লেখককে নিয়ে একটি মোটরসাইকেলে করে ২৯ অক্টোবর বৃহস্পতিবার শহিদুন্নবী জুয়েল পাটগ্রামে এক আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে ভারতীয় সীমান্ত এলাকার বুড়িমারী স্থলবন্দর লাগোয়া বাজারে ওই মসজিদটির অবস্থান।

ইউপি চেয়ারম্যান আবু সাইদ নেওয়াজ নিশাদ বলেন, কয়েক ঘণ্টা ধরে তাণ্ডব চললেও পর্যাপ্ত পুলিশ না থাকয় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি।

মসজিদের খাদেম জোবেদ আলী বলেন, নামাজ শেষ হওয়ার পর অপরিচিত দুই লোক এসে গোয়েন্দা পরিচয় দিয়ে আমাকে ধমক দিয়ে বলেন, মসজিদে অস্ত্র আছে। আলমারির চাবি চাইলে ভয়ে চাবি দিই। তারা মসজিদে গিয়ে শেলফ, আলমারি তছনছ করে। এ সময় একটি তাকের ওপর রাখা কোরআন শরিফের পাশে পা রেখে তারা অস্ত্র খোঁজে।

এলাকাবাসী জানান, খাদেম জোবেদ আলী কোরআন অবমাননার কথা অনেককেই বলেছেন। কিন্তু বাসেদ আলী নামের এক মুসল্লিকে তার মুখোমুখি করলে জোবেদ আলী কথা ঘুরিয়ে ফেলেন। এতে জোবেদের ওপর খেপে যান তিনি।

প্রত্যক্ষদর্শীদের কয়েকজন জানান, আবুল হোসেন নামের এক ডেকোরেটর ব্যবসায়ী প্রথম দুই ব্যক্তির একজনকে মারতে মারতে মসজিদ থেকে বের করে আনেন। কিন্তু আবুল হোসেনকে তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাসায় পাওয়া যায়নি। তবে তার স্ত্রী ও মেয়ে জানান, মসজিদের ভেতর গালি দেওয়ায় আবুল হোসেন একজনকে মেরেছিলেন বলে বাসায় ফিরে জানিয়েছিলেন।

জেলা প্রশাসক আবু জাফর বলেন, ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট টি এম এ মোমিনকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বাকি দুই সদস্য অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম ও পাটগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বেগম কামরুন্নাহার। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত কমিটির সদস্যরা ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করছেন। ১ নভেম্বর তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দেবে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম ৩০ অক্টোবর শুক্রবার পাটগ্রাম থানায় উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। সিআইডিসহ অন্যান্য সংস্থা ঘটনার বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে।

লালমনিরহাটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম শুক্রবার সাংবাদিকদের নিহত শহীদুন্নবীর এবং আহত সুলতান জোবায়েরের পরিচয় জানান। তাদের উভয়ের বাড়ি রংপুরে। লালমনিরহাট আধুনিক সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন জোবায়ের।

এদিকে এই ঘটনায় আশরাফুল, আরিফ হোসেন বায়েজিদ ও শরীফ নামের তিনজনকে শুক্রবার গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

সিআইডির ক্রইমসিন সদস্যরা বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। সিআইডির সিনিয়র এএসপি আতাউর রহমান বলেন, মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে। গুজবের উৎস, অর্থাৎ প্রথম কে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়েছে, সেটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ঘটনার কোন পর্যায়ে কারা এবং কীভাবে সম্পৃক্ত হয়েছেন, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

ঠিকানা/এনআই