লু রোমান্টিসিজমে অন্য খেলা

দিল্লি টু ঢাকা : মূল টার্গেট চীন দমন

বিশেষ প্রতিনিধি : শীত আক্রান্ত বাংলায় লু হাওয়ার আফটার শক বোঝার ধুম যাচ্ছে। কারও যমদূত, কারও ত্রাতা মনে করা মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু কোনো নতুন বার্তা দিলেন না। তার কদিন আগে সফরে আসা প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের দূত আরেক কূটনীতিক রিয়ার অ্যাডমিরাল আইলিন লাউবাচারের কথাগুলোই বলে গেছেন। এর আগ থেকে যা বলে আসছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস। তফাত কেবল বলার ধরনে আর শব্দ-বাক্যের মারপ্যাঁচে।
চীনা বংশোদ্ভূত মঙ্গোলীয় এ মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় রোমান্টিসিজম চলছিল কদিন। তিনি কাকে ফেভার করেন, কাকে কোন চাপ দেন- এ প্রতীক্ষায় ছিলেন অনেকে। সেই প্রতীক্ষার অবসান হয়নি, ঘোরও কাটেনি। বরং সবাইকে আরো ঘোরে ফেলে চলে গেছেন। র‍্যাব বছরখানেক আগের চেয়ে ভালো হয়ে গেছে, বিচারবহির্ভূত হত্যা কমেছে মর্মে বার্তা দিয়েছেন। সেই সঙ্গে জানিয়েছেন, এ কারণেই নতুন করে আর স্যাংশন দেওয়া হয়নি। সরকারপক্ষ তার এমন কথায় জৌলুশ পেয়েছে। লুর এমন মূল্যায়নে র‍্যাবের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আগে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা যে সঠিক, সেই বার্তাও পরিষ্কার। ওই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আভাসও দেননি।
ডোনাল্ড লুর কথাবার্তা ও মন্তব্য ছিল খেয়াল করার মতো ঘোচানো। তার দেওয়া ইংরেজি বক্তব্যের বঙ্গানুবাদ : যুক্তরাষ্ট্রের একটা কমিটমেন্ট আছে, গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার। আমরা যখন সমস্যা দেখি, তখন কথা বলি, পরামর্শ দিই। আমরা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলি। তার এই ২২ শব্দের মধ্যে স্পষ্ট অন্তত পাঁচটি তাগিদ লুকানো। এগুলো হচ্ছে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা, আন্দোলনে বাধা না দেওয়া এবং সুষ্ঠু-গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। নাগরিক সমাজের সঙ্গে বৈঠকের সময় লুর উপরিউক্ত মন্তব্যের কিছুটা ব্যাখ্যা মিলেছে। সেখানে তিনি জানতে চেয়েছেন, সামনের সুষ্ঠু নির্বাচনে বিএনপি আসবে কি না? নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মন্তব্যের মতো জানতে চেয়েছেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের গ্যারান্টি আছে কি না? জবাবে এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার কথা জানিয়েছেন ডোনাল্ড লু। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর আগামীতে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ওয়াদাকে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করতে চায় বলেও জানিয়েছেন তিনি। বলেন, নির্বাচনের আগে গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার সমুন্নত রাখার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দিয়ে যাবে।
লুর এসব হাইলি ডিপ্লোম্যাটিক কথার মাঝে প্রচুর ইঙ্গিত। একে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। লাউবাচার বা লু সফর করে চলে গেছেন, মানে যুক্তরাষ্ট্রের কার্যক্রম শেষ নয়। দেশটি বাংলাদেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে-করছে, তা স্পষ্ট। সমাবেশে সমান অধিকার, স্বাধীন মতপ্রকাশের নিশ্চয়তা দেওয়া ও ভিন্নমত দমনে ভয়ভীতি প্রদর্শন না করার আহ্বান নির্দেশের মতো করে বলে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এসব সফর কেবল বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনকে উপলক্ষ করেই নয়; রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ, মার্কিন বিনিয়োগ, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলসহ আরো কিছু বিষয় রয়েছে।
চীনের প্রভাব থেকে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়াকে সরাতে সবই করবে যুক্তরাষ্ট্র-এ বার্তাও পরিষ্কার। ডোনাল্ড লু, নামটি নানা কারণে আলোচিত। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায়। কোথাও কোথাও সমালোচিতও। পাকিস্তানের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তার নাম ধরেই বক্তৃতা করেন। চীনের দিকে অতিমাত্রায় ঝুঁকে পড়া ইমরান মনে করেন, তার বিরুদ্ধে বাইডেন প্রশাসনকে বিষিয়ে তুলতে ডোনাল্ড লু’ই কলকাঠি নেড়েছেন। মার্কিন প্রশাসন অবশ্য এ নিয়ে প্রকাশ্যে খুব একটা প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। সাউথ এশিয়া এক্সপার্ট খ্যাত মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু বাংলাদেশ সফর করে গেছেন। দিল্লিতে দুই দিন কাটিয়ে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। বাংলাদেশে দুই দিনের সফর বলা হলেও ছিলেন প্রায় ২৪ ঘণ্টা। সফরে তিনি অনেকের সঙ্গে কথা বলেছেন। কিছু স্টকটেকিংও করে গেছেন।
সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে আলোচনা হলেও দেশের অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কোনো বৈঠকই করেননি লু। রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বা সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক না হওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিএনপি বলছে, তাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। মার্কিনিরাও এর বাইরে নয়। বিএনপির নেতাদের দাবি, ডোনাল্ড লু এসেছিলেন মার্কিন সরকারের কিছু বার্তা দিয়ে যেতে। কাজ শেষে করে চলে গেছেন। কৌশলগত কারণে তাদের সঙ্গে বৈঠক হয়নি।
বিমানবন্দরে নেমেই ডোনাল্ড লুর সরাসরি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় চলে যাওয়ার আগ-পিছও কূটনীতিতে ভরপুর। সেখানে ভোজ বৈঠক চলে প্রায় দেড় ঘণ্টা। মোমেন-লুর সেই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস উপস্থিত ছিলেন। পরদিন ফের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয় তার। একই দিনে স্বরাষ্ট্র এবং আইনমন্ত্রীর সঙ্গেও পৃথক বৈঠক হয়েছে। ওই দিন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের সঙ্গে হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। উপদেষ্টার বাড়িতে ডিনারও করেছেন। আবার তাদের রাষ্ট্রদূত পিটার হাসকে নিজের ব্যক্তিগত জীবনের বন্ধু বলেও জানিয়ে গেছেন। এ-ও বলেছেন, পিটার হাসকে নিয়ে বাংলাদেশে যা ঘটেছে, তা অনাকাক্সিক্ষত। এখানে কে ক্ষমতায় এল আর কে গেল, তাতে মার্কিনিদের কিছুই যায়-আসে না বলেও জানিয়েছেন। এখান থেকেও মেসেজ বুঝে নেওয়ার উপাদান রয়েছে।
মানবাধিকার, গণতন্ত্র, নির্বাচন, শ্রম অধিকার ও বাক-স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বাইডেন প্রশাসন যে কোনো ছাড় দেবে না- সেটাই পুনর্ব্যক্ত করে গেছেন ডোনাল্ড লু। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো বার্তাই মিষ্টি ভাষায় প্রকাশ করেছেন তিনি। শুনতে খুব ইতিবাচক মনে হলেও আদতে ওই বার্তা খুবই শক্ত। তার এ বার্তার পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার কূটনীতিকদের মন্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক কৌশল খুব দুর্বল।