লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু!

রেক্স আইটি ইনস্টিটিউটের প্রতারণা

রাজধানী ডেস্ক : খোদ রাজধানীতেই অখ্যাত এক প্রতিষ্ঠানের প্রলোভনে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন কয়েক শ’ মানুষ। রেক্স আইটি ইনস্টিটিউট নামে এ প্রতিষ্ঠান ঘোষণা দেয় যে, তাদের প্রতিষ্ঠানে এক লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে এক মাসেই লাভ দেওয়া হবে ৮৮ হাজার টাকা। মাসেই ৮৮ শতাংশ লাভ প্রায় দ্বিগুণ। এ লাভ কে ছাড়তে চায়। একদল অতি লোভী মানুষ বাস্তবতা বুঝতে চাননি। তারা বুঝতে চাননি এটা অসম্ভব ব্যাপার। ফলে ওই প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে এখন সর্বস্বান্ত তারা।

তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে, জমি বিক্রি করে, বাবার সারাজীবনের সঞ্চয় তুলে ৬৮ লাখ ২১ হাজার টাকা জমা দেন খন্দকার আবু বকর সিদ্দিক প্রিন্স। শুধু তিনিই নন, প্রায় ৭০০ মানুষ তাদের সর্বস্ব বিনিয়োগ করেন। প্রথম কয়েক মাসে তাদের লভ্যাংশের কিছু টাকা দেওয়া হয়। এরপরই শুরু হয় টালবাহানা। একপর্যায়ে রেক্স আইটি ইনস্টিটিউট নামের প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার আবদুস সালাম পলাশের বিরুদ্ধে মামলা করেন ভুক্তভোগীরা। সেসব মামলায় গ্রেফতার করে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। তবে অতি লোভে পড়ে জমা দেওয়া বিপুল অর্থের কী হবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। এই টাকা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে জানা গেছে।

অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে একটি মামলার তদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্ত সংস্থাটির ঢাকা মহানগর অঞ্চলের বিশেষ পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ বলেন, মামলার প্রধান আসামি আবদুস সালাম পলাশসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে চার ভুক্তভোগীর এক কোটি ১৯ লাখ ৩৭ হাজার টাকা আত্মসাতের প্রমাণ মিলেছে। তাদের অভিযুক্ত করে সম্প্রতি এ মামলার চার্জশিট দিয়েছে পিবিআই।

তদন্ত সূত্র জানায়, দুই বছর আগে ধানমন্ডির ২৭ নম্বর সড়কের ৪/এ নম্বর ভবনে রেক্স আইটি ইনস্টিটিউট নামে একটি কম্পিউটার ও আউটসোর্সিং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান খোলেন পলাশ। এরপর তিনি ফেসবুকে কস্ট পার অ্যাকুইজিশন বা সিপিএ মার্কেটিং বিভাগে ভর্তির বিজ্ঞাপন দেন। বিজ্ঞাপন দেখে খন্দকার আবু বকর সিদ্দিক প্রিন্স ১০ হাজার টাকা কোর্স ফি দিয়ে ভর্তি হন। কোর্স চলাকালে রেক্স আইটি ইনস্টিটিউটের পরিচালনা পরিষদের সদস্য মনিরাতুল জান্নাত ও আজিজুল হক মাউনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এক দিন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা তাকেসহ ভর্তি হওয়া প্রায় ৭০০ ছাত্রকে সিপিএ ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে বিনিয়োগের কথা বলে প্রলুব্ধ করেন। তারা বলেন, সিপিএ মার্কেটিংয়ে বিনিয়োগ করা টাকার ৩০ থেকে ৮৮ শতাংশ পর্যন্ত লাভ আসবে। এতে প্রলুব্ধ হয়ে ছাত্ররা নিজেদের সাধ্যমতো বিনিয়োগ করেন। তাদের মধ্যে প্রিন্স গত বছরের ১৮ মে থেকে চলতি বছরের ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত মোট ৬৮ লাখ ২১ হাজার টাকা জমা দেন। প্রথম দফায় বিনিয়োগের এক মাস পর তাকে ৮০ শতাংশ লাভসহ টাকা ফেরত দেওয়া হয়।

খন্দকার আবু বকর সিদ্দিক প্রিন্স জানান, পেইড মার্কেটিং খাতে বিনিয়োগ করে লাভ পাওয়া যায় বলে জানতেন তিনি। তবে রেক্স আইটি অস্বাভাবিক লভ্যাংশের কথা জানায়। যেহেতু তার বা অন্য ভুক্তভোগীদের নিজস্ব অ্যাকাউন্ট ছিল না, তাই রেক্সের চেয়ারম্যান আবদুস সালাম পলাশের অ্যাকাউন্ট থেকে বিনিয়োগের কথা বলা হয়। তারা এতে আপত্তি করেননি। এমনকি নির্দিষ্ট সময় পরপর তাদের টাকা বেড়ে যাওয়ার হিসাবের রেজিস্ট্রশনশট দেখানো হতো। প্রিন্স ১৫ লাখ টাকা বিনিয়োগের দুই মাস পর তার টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় ২৫ লাখ টাকা। এতে তার লোভ বেড়ে যায়। তিনি ভাবেন, লাভের টাকা তুলে কাজ নেই বরং সেটাও বিনিয়োগ করলে টাকা বাড়তেই থাকবে। পাশাপাশি বিভিন্ন জায়গা থেকে ঋণ নিয়েও বিনিয়োগ করা যায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করেন তিনি। এরপর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে টালবাহানা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। এপ্রিল থেকে আর কোনো লভ্যাংশই দেওয়া হয় না। তারা টাকা ফেরত চাইলে আসল বা লাভের কিছুই দিতে পারবে না বলে জানায় কর্তৃপক্ষ। এ পর্যায়ে ভুক্তভোগীদের কয়েকজন মিলে পলাশের বিরুদ্ধে একটি করে মামলা করেন। এ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে ৩৫টির বেশি মামলা হয়েছে।

এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইর পরিদর্শক মোহাম্মদ জুয়েল মিঞা জানান, আবদুস সালাম পলাশ, তার সহযোগী মনিরাতুল জান্নাত ও আজিজুল হক মাউন মিলে প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে প্রিন্স ছাড়াও অনেকের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তাদের মধ্যে আবদুল জব্বার ২৪ লাখ ৫৮ হাজার, সৈয়দ মো. ইব্রাহিম নাদিম ২১ লাখ ৫৮ হাজার ও আবদুল জলিল আরিফ পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছেন। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ-বিধির ৪০৬/৪২০/১০৯ ধারার অপরাধ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে জানায় পুলিশ।