শঙ্কা দূর হতে চলেছে হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রীর!

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮ মামলা: দূতাবাসের সহযোগিতার আশ্বাস

ঠিকানা রিপোর্ট : আমেরিকার ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টম ইনফোর্সমেন্ট গত ৬ জুলাই ঘোষণা দেয়, আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেসব বিদেশি ছাত্রছাত্রী রয়েছে, তাদের আমেরিকা ত্যাগ করতে হবে। এই আদেশের ফলে আমেরিকায় লেখাপড়া করতে আসা হাজার ছাত্রছাত্রীর জীবন হুমকির মুখে পড়ে। অনিশ্চিত এক অবস্থার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীরাও। অনলাইনে ক্লাস ও বিদেশি শিক্ষার্থীদের দেশত্যাগের যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নির্দেশনা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। আর শিক্ষার্থীদের মঙ্গল নিশ্চিত করতে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ওয়াশিংটনের বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে দুইটি বিশ্ববিদ্যালয়সহ ১৮টি স্টেট ইতিমধ্যেই মামলা করেছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশের প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে এবং আসন্ন সেপ্টেম্বর সেশনে তাদের ক্লাস শুরু হওয়ার কথা। ওয়াশিংটনের বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস মিনিস্টার শামীম আহমেদ ঠিকানাকে জানান, আমেরিকায় প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রী রয়েছে। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের সাথে আমাদের কথা হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে তাদের যতটুকু সাহায্য দরকার, আমরা তা করব।
ঠিকানার এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইন অথবা অন-ক্যাম্পাস পদ্ধতিতে ক্লাস নিতে পারে। যদি অন-ক্যাম্পাস পদ্ধতিতে ক্লাস নেওয়া হয়, তবে শিক্ষার্থীদের কোনো সমস্যা হবে না।’ অনেক ছাত্রছাত্রী তা-ই জানিয়েছে। তারা আরো জানায়, আমেরিকার হোমল্যান্ড সিকিউরিটির এই সিদ্ধান্ত অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই মানতে নারাজ। তারা চেষ্টা করছে অনলাইনের পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতিতে ক্লাস নেওয়ার। ফলে কাউকে আর আমেরিকা থেকে বের করতে পারবে না। তা ছাড়া ছাত্রছাত্রীরা আরো জানিয়েছে, যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস হবে সেখানেই তারা ট্রান্সফার নিয়ে চলে যাবে। প্রেস মিনিস্টার আরো জানান, এ নিয়ে আপাতত শঙ্কার কোনো কারণ নেই। প্রথমে যেভাবে ধারণা করা হয়েছিল, ছাত্রছাত্রীরা বিপদে পড়ে যাবে, এখন আর সেই বিপদের আশঙ্কা নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সাত হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রান্সফার করার নিয়ম অনেক সহজ জানিয়ে আরেকটি সূত্র জানায়, সমমান বা যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ট্রান্সফার পদ্ধতি আছে। এগুলো নেওয়ার যথেষ্ট সুযোগ আছে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ইতিমধ্যে অনলাইন ক্লাস নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে এবং এই সিদ্ধান্ত আগামী সেশনের জন্য সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর থাকবে বলে ওই সূত্র জানায়।
আরেকটি সূত্রে জানা গেছে, ইতিমধ্যে হার্ভার্ড ও এমআইটি শিক্ষার্থীদের চলে যাওয়ার বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। সাথে যোগ দিয়েছে আরো ১৮টি স্টেট। ইতিমধ্যে ১৮টি স্টেট মামলা দায়ের করেছে। আশা করা হচ্ছে, এ বিষয়ে একটি ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যাবে।
বিভিন্ন দেশের সরকারও এ বিষয়ে তাদের উদ্বেগের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে। ভারতের প্রায় দুই লাখ শিক্ষার্থী আমেরিকায় পড়াশোনা করে। সম্প্রতি একটি বৈঠকে তারা এই উদ্বেগের বিষয়ে জানালে যুক্তরাষ্ট্র সরকার বিষয়টি বিবেচনা করবে বলে জানিয়েছে।
প্রসঙ্গত, বিশ্বের ২৫টি দেশের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে যুক্তরাষ্ট্রে। এর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশনের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সালে মার্কিন অর্থনীতিতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অবদান ছিল প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি বিদেশি শিক্ষার্থী হচ্ছে চীনের। এ তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ভারত।
কয়েকজন ছাত্র ঠিকানাকে জানায়, প্রথমে শঙ্কার মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম। এখন মনে হচ্ছে, আমেরিকায় লেখাপড়া করতে কোনো অসুবিধা হবে না। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আমাদের সাথে এগিয়ে এসেছে। তারা অনলাইনের পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতিতে ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। আমেরিকার সব স্টেটে তো আর করোনা নেই। আগামী সেপ্টেম্বর থেকে স্কুলও খুলে যাচ্ছে। সেই দিক বিবেচনায় আমাদের আর চিন্তা নেই। তার পরও ট্রাম্প প্রশাসন কী সিদ্ধান্ত নেয়, তা দেখার বিষয়। জামিল হোসেন জানান, এটা আসলে ট্রাম্পের রাজনীতি। তিনি চাচ্ছেন, এই উদ্যোগ কার্যকর হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের স্বার্থেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলে দেবেন। ফলে ট্রাম্পের আশাই পূরণ হবে। তিনি অনেক আগে থেকেই যাচ্ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন খুলে দেয়া হয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের এমন নির্দেশ জারির পর হার্ভার্ডের পক্ষ থেকে প্রথমেই একটি মামলা দায়ের করা হয়। এর সঙ্গে এখন যোগ দিচ্ছে রাজ্যের সরকারগুলো। ফেডারেল আদালতে ১৩ জুলাই সোমবার দায়ের করা মামলায় ম্যাসাচুসেটস রাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল ম্যুরা হেলি বলেন, ইমিগ্রেশন বিভাগের এমন সিদ্ধান্ত কেবল ফ্যাকাল্টি মেম্বার বা শিক্ষার্থীদেরই স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করছে না, পরিবারের লোকজনকেও ঝুঁকিতে ফেলবে।
নিউজার্সির অ্যাটর্নি জেনারেল গারবির গ্রোয়াল বলেন, প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন, অনৈতিক ও বেআইনি। এতে শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে পড়াসহ তাদের অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষার প্রয়াস ব্যাহত হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। কলোরাডো, কানেকটিকাট, ওয়াশিংটন ডিসি, ইলিনয়, ম্যারিল্যান্ড, মিশিগান, ম্যাসাচুসেটস, মিনেসোটা, নেভাদা, নিউ মেক্সিকোসহ ১৮টি অঙ্গরাজ্য এই মামলায় যোগ দিয়েছে।
নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিসিয়া জেমস ১৪ জুলাই এ নিয়ে আদালতে পৃথক একটি মামলা করেন। মামলায় বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত সময় না নিয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের প্রতি যে নির্দেশ জারি করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নযোগ্য নয়। শিক্ষার্থীদের হয়রানি থেকে রক্ষার জন্য আদেশটির স্থগিতাদেশ চেয়ে আর্জি জানানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, ৯/১১-এর পর বাংলাদেশ থেকে শিক্ষার্থী ভিসা দেওয়া কমে গেলে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও যুক্তরাজ্যে পড়তে যাওয়া শুরু করে শিক্ষার্থীরা।
সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, গত ১৪ জুলাই মঙ্গলবার ম্যাসাচুসেটসে ডিস্ট্রিক্ট জাজ অ্যালিসন বুরোফ জানান, যুক্তরাষ্ট্র সরকার, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিট ও ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিউট অব টেকনোলজির মধ্যকার মামলায় সমঝোতা হয়েছে। সরকার নতুন আইন বাতিল ও আগের অবস্থায় ফিরে যাবে।
চলমান প্রক্রিয়া সম্পর্কে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে হোয়াইট হাউস। বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবটির ফলে নেতিবাচক প্রভাবের কথা অনুধাবন করতে পেরেছে হোয়াইট হাউস এবং ওয়েস্ট উইংয়ের অনেকেই এই সিদ্ধান্তটি সুবিবেচনা প্রসূত নয় বলে মনে করেন এবং বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দিহান।
আরেকটি সূত্র জানায়, হোয়াইট হাউস এখন নতুন আবেদনকারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই আইনটি বাস্তবায়ন করার বিষয়ে মনোযোগ কেন্দ্রীভুত করেছে। ইতোমধ্যে যারা যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন তাদের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তটি আর বাস্তবায়ন করা হবে না।
এই সিদ্ধান্তের ফলে আপাতত দেশটিতে অধ্যয়নরত ১০ লাখের বেশি বিদেশি শিক্ষার্থীদের স্বস্তি ফিরবে।