শতায়ু ৩ যমজ বোনের বিশ্বরেকর্ড

ঠিকানা রিপোর্ট : শুধু আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র নয়, বলতে গেলে সমগ্র বিশ্বে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন ফ্লোরাল পার্কের শত বছর জীবন লাভকারী ৩ যমজ বোন। গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের জেনরটলজির সিনিয়র কনসালট্যান্ট সুপারসেনটেনারিয়ান (শতায়ুদের চেয়ে বেশি বয়সীদের) বিশেষজ্ঞ রবার্ট ডি ইয়াং ২৪ জুন বলেন (নির্ভরযোগ্য ডকুমেন্ট সংগ্রহ সাপেক্ষে), আমি দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে বলতে চাচ্ছি যে কার্চনার পরিবারে ১৯২০ সালের ২৩ আগস্ট জন্মগ্রহণকারী ৩ যমজ কন্যা নিঃসন্দেহে শুধু আমেরিকা নয়, সমগ্র বিশ্বে সর্বাপেক্ষা দীর্ঘ আয়ু লাভকারী ৩ যমজ বোন। ইয়াং আরও জানান, বর্তমান রেকর্ড অনুসারে সর্বাপেক্ষা বেশি আয়ু লাভকারী ৩ যমজ হচ্ছেন ফেইথ, হোপ ও চ্যারিটি কার্ডওয়েল। তাদের জন্ম হয়েছিল ১৮৯৯ সালের ১৮ মে টেক্সাসের এলমে। ইয়াং বলেন, পারিবারিক বর্ণনার ভিত্তিতে তাদের নাম গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। তবে ওই ৩ যমজের মধ্যে জ্যেষ্ঠ ফেইথ কার্ডওয়েল ৯৫ বছর ১৩৭ দিন বয়সে ১৯৯৪ সালের ২ অক্টোবর পরলোকগমন করেছিলেন। ইয়াং আরও বলেন, ফেইথ, হোপ ও চ্যারিটি কার্ডওয়েলের জন্মতারিখ এবং দীর্ঘায়ু লাভ সংশ্লিষ্ট কোনো সঠিক তথ্য ও নির্ভরযোগ্য দলিলপত্র গিনেস কর্তৃপক্ষের নিকট নেই।
ইয়ং বলেন, বর্তমানে একসাথে ৮ যমজ শিশু জন্মগ্রহণের ইতিহাসও যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে। তবে ১৯২০ সালে একসাথে ৩ সমলিঙ্গ যমজের জন্ম হওয়া ছিল সন্দেহাতীতভাবে বিরল ঘটনা। তাই ক্যামেরাসহ ঝাঁকে ঝাঁকে সংবাদকর্মী ১৯২০ সালের ২৩ আগস্ট জড়ো হয়েছিলেন ব্রুকলিনের ফ্ল্যাটবুশ সেকশন অ্যাপার্টমেন্টের তৃতীয় তলায় জন্মগ্রহণকারী ফ্রান্সেস হরনবার্গার, মার্গুরিটে মিলার এবং ক্যাথলিন রথের ছবি তোলার জন্য। সংবাদমাধ্যমগুলো মার্জরি ও ওয়াল্টার কার্চনারের পরিবারের জন্ম নেওয়া হরনবার্গার, মিলার ও রথের ছবি গুরুত্বের সাথে প্রকাশ করেছিলেন।
পারিবারিক তথ্যানুযায়ী জ্যেষ্ঠ সমলিঙ্গ যমজ ক্যাথারিনের জন্মলগ্নের ওজন ছিল ৬ পাউন্ড, মধ্যম ফ্রান্সেসের ওজন ছিল সাড়ে ৫ পাউন্ড এবং কনিষ্ঠ মিলারের ওজন ছিল সাড়ে ৪ পাউন্ড। জন্মলগ্নের পর দ্য ট্রিপস ছদ্মনামে তারা সর্বমহলে পরিচিতি লাভ করেন। যাহোক, জাগতিক ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবেলা করে হরনবার্গার, মিলার ও রথ নামের ৩ সমলিঙ্গ যমজ বোন শৈশব, কৈশোর, যৌবন ও বার্ধক্যের সিঁড়ি ও নবতির গ-ি মাড়িয়ে শতায়ু লাভ করতে যাচ্ছেন। আমেরিকান মহিলাদের স্বাভাবিক গড় আয়ু ৮০ বছর পেরিয়ে হরনবার্গার, মিলার ও রথের ৯৮ বছর বেঁচে থাকা ও শতায়ু লাভকে অনেকেই বিস্ময়কর ব্যাপার-স্যাপার বলে মনে করছেন। ইয়াং আরও বলেন, আমার বিশ্বাস দ্য লঙ্গেস্ট-লিভিং ট্রিপলেটদের ইতিহাসে (সর্বাপেক্ষা দীর্ঘকাল বেঁচে থাকা ৩ যমজের) শতায়ু লাভকারী হরনবার্গার, মিলার ও রথ প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। পারিবারিক সূত্রে আরও জানানো হয় যে ক্রিচনার ট্রিপলেটদের গ্রেইস হাডাড নামের এক বড় বোন ছিলেন। ১০ মে তিনি কুয়োগুতে প্রায় ১০২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯২০ সালে ওয়ারেন জি হার্ডেন যুক্তরাষ্ট্রের ২৯তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। একই বছর সংবিধানের ঊনবিংশ সংশোধনীর মাধ্যমে মহিলাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছিল। সাড়া জাগানো ক্রীড়াবিদ বেবি রুথ সে বছরই ইয়াঙ্কিজের পক্ষে প্রথম খেলা শুরু করেছিলেন। মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটলেও ১৯২০ সাল পর্যন্ত আমেরিকাসহ সমগ্র বিশ্বকে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষসহ নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তাই শৈশব ও কৈশোরে দ্য ট্রিপস নামে পরিচিত ৩ যমজ বোনকেও নানা প্রতিকূলতার ঘাত-প্রতিঘাতে জর্জরিত হতে হয়েছিল। অনেকগুলো ভয়াবহ অভিশাপ মোকাবেলা করতে হয়েছিল তাদের।
উল্লেখ্য, ১৯২৯ থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রকে ঐতিহাসিক ডিপ্রেশন বা ভয়াবহ আর্থিক মন্দার শিকার হতে হয়েছিল। সেই ডিপ্রেশনের তরঙ্গাভিঘাতে হরনবার্গার, মিলার ও রথ পরিবারের সদস্যদেরও চরম দুর্দশার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। তদুপরি তৎকালীন সামাজিক রীতিনীতির নানা বেড়াজাল ও প্রতিবন্ধকতা বারবার তাদের চলার পথে বাধা সৃষ্টি করেছিল। স্মর্তব্য, ১৯২০ থেকে ২০১৯ সাল সুদীর্ঘ ১০০ বছর। এই শত বছরে হাডসন নদে বয়ে গেছে রাশি রাশি জলপ্রবাহ। বিশ্বজুড়ে রাজ্য-সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন এবং ক্ষমতার হাতবদলের কাহিনি না-ই বললাম। আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের ২৯তম প্রেসিডেন্টের কার্যকাল শেষ হয়ে বর্তমানে ৪৫তম প্রেসিডেন্টের কার্যকাল চলছে। তাই ১৯২০ ও তার পরবর্তী কয়েক বছরের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্রীয় পরিবেশ মহিলাদের সহজাত প্রতিভার বিকাশে কী ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল, তা বর্তমানের রঙিন চশমার ফাঁক দিয়ে কল্পনাও করা যাবে না।
যা হোক, কৈশোর ও যৌবনে রথ, হর্নবার্গার ও মিলার নামের ৩ যমজ বোন প্রতিবন্ধকতার সহস্র প্রাচীর মাড়িয়ে জীবনে শিক্ষিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দাবানল ও সমান অধিকারের লড়াইয়ের আগুনের তাপ তাদের দেহে লেগেছিল। মানবাধিকার এবং লিঙ্গবৈষম্যের অধিকারের লড়াইয়ে অন্যদের মতো তাদেরও কম-বেশি অংশ নিতে হয়েছিল। এককথায় জাগতিক সহস্র ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে তাদের জীবনধারা সম্মুখপানে এগিয়ে যান।
ফ্লোরাল পার্কের গ্রেইসে ফ্রান্সেস, ক্যাথারিন ও মার্গুরেট কার্চনার শৈশব ও কৈশোর অতিবাহিত করেন এবং সেয়ানহাকা হাইস্কুলে অধ্যয়ন করেন। বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তারা নিয়মিত হকি ও টেনিস খেলতেন। ১৯৩৮ সালে হাইস্কুল গ্র্যাজুয়েশনের পর তারা আপস্টেটের হোবার্ট অ্যান্ড উইলিয়াম স্মিথ কলেজে ভর্তি হন। তিনজন কলেজে ভর্তি হলেও তাদেরকে মাত্র দুজনের বেতন পরিশোধ করতে হতো। রজার হরনবার্গার বলেন, ১৯২৯ সালে স্টক মার্কেটে ধস নামার পর তার দাদা বেশ কয়েক বছর বেকার ছিলেন। তখন তার স্কুলশিক্ষিকা দাদিমা মার্জরি নিজ স্বল্প আয়ে বহু কষ্টে পরিবারের ভরণ-পোষণ নির্বাহ করতেন। অবশ্য সময় থেমে থাকেনি। একপর্যায়ে হরনবার্গার স্কুলশিক্ষিকা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং ফ্লোরাল পার্কে স্থায়ী বসতি গড়েন। পরে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লাইব্রেরি সায়েন্সে ডিগ্রি নেওয়ার পর তিনি লাইব্রেরিয়ান হিসেব কর্মজীবনে জড়িয়ে পড়েন এবং চলতি বছরের ২ জুন ৯৮ বছর বয়সে কুইন্সের জ্যামাইকার চ্যাপিন হোম ফর দ্য এইজিংয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। অন্যদিকে ক্যাথারিন রথ বর্তমানে বসবাস করছেন পেনসিলভানিয়ার এলেন টাউনে। আর মার্গুুরেট মিলার বাস করছেন আপস্টেট বাটাভিয়ায়।
ফ্রান্সেসের ৫৭ বছর বয়সী পুত্র রজার হরনবার্গার বর্তমানে উইসকনসিনের আপেলটাউনের বাসিন্দা। রজার হরনবার্গার বলেন, তার জননী এবং তার খালাদের শতায়ু বা শতায়ুর কাছাকাছি জীবন লাভ বাস্তবিকই বিস্ময়কর ঘটনা। হরনবার্গার আরও জানান যে নবতিপর বৃদ্ধা তার মা ও খালাম্মারা অত্যন্ত সবল, সুস্থ ও কর্মক্ষম ছিলেন এবং আছেন। হরনবার্গার বলেন, তার মা প্রায়ই তাকে প্রসেসড ফুড বর্জনের পরামর্শ দিতেন এবং সর্বদা তাজা শাকসবজি, ফলমূল, মাংস ও আলু খাওয়ার উপদেশ দিতেন। তার মা বলতেন, প্রসেসড ফুডের স্থলে তাজা ফলমূল এবং শাকসবজি খেলে শরীর সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকবে এবং দীর্ঘায়ু লাভ করা যায়।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, হরনবার্গার মিলার ও রথ-৩ যমজই তাদের স্বামীদের সন্ধান পেয়েছিলেন কলেজে অধ্যয়নকালে। হরনবার্গার বিয়ে করেছিলেন হেনরি কোল নামের এক ব্যক্তিকে। দুর্ভাগ্যবশত যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে কোল ১৯৪৬ সালে পরলোকগমন করেন। পরে ফ্লোরাল পার্কের মেথডিস্ট চার্চে হরনবার্গারের সাথে তার দ্বিতীয় স্বামী বিপতত্নীক ক্লিফোর্ড এইচ হরনবার্গারের পরিচয় হয় এবং পারস্পরিক সম্মতিতে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের সংসারে ৩ সন্তানের জন্ম হয়। ১৯৮৬ সালে ক্লিফোর্ড হরনবার্গারও মৃত্যুমুখে পতিত হন। তাদের ৩ সন্তান-সন্ততির সংসারে বর্তমানে ১১ জন নাতি-নাতনি রয়েছে।
১৯৪২ সালে গ্র্যাজুয়েশনের পর মিলার এবং রথও স্কুলশিক্ষিকা হিসেবে কর্মজীবনে পা দেন। রথ ও মিলার প্রত্যেকের ছেলেমেয়ে এবং নাতি-নাতনিসহ ১৫ জন সদস্য রয়েছে। পারিবারিক সূত্রে আরও জানানো হয় যে ৩ যমজ বোন তাদের ৭০তম, ৮০তম ও ৯০তম জন্মদিবস সম্মিলিতভাবে পরিবারের সদস্যদের সাথে মহা ধূমধামে উদযান করেছিলেন।