শিকাগোর উইলিস টাওয়ারে একদিন

অসহায় মানুষের আহাজারি আমায় একটি সুখের জীবন দাও। অনেক সময় সমুদ্র বক্ষে নিমজ্জিত হয়ে তার রচিত হয় সলিল সমাধি। জীবন সায়াহ্নে সূর্যটা ডুবি ডুবি করে যেন বিশাল দরিয়ায় ডুবে গেল। এক মুসাফিরি জীবনের হলো অবসান। আমরা কম বেশি সবাই মুসাফির। সুখ ভাসে না মেঘের মত। জীবন এক রূঢ় বাস্তব সুখ তার আপেক্ষিক এক ক্লাসিক রাগ। জীবন চলছে নিজ গতিতে। সুখ-দুঃখে জীবন কেটে যায়। জীবনের গতি নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে নেই। আমরা পরিবার তথা সমাজ নিয়ে বাস করি। ইদানিংকার পরিবার, সমাজ দেখে আমার কেন যেন মনে পড়ছে আমার মৃত চিরসবুজ রশীদ মামার কথা। আজীবন এই ব্যাচেলর কি আমাদের চেয়ে ভাল ছিলেন একা ও একাকীত্বের অভিশাপ নিয়ে। কাউকে যেমন পিছু টানে রেখে যান নি তেমনি কাঁদার জন্যও কেউ ছিলনা। ভাবার সময় এসেছে। আমি ভাবছি মামা কি আমাদের চেয়ে ভাল জীবনে ছিলেন? কি জানি হয়তো, হয়তো বা না! ঘুম আসছিল না; নির্ঘুম রাত কাটাতে হচ্ছে। অগত্যা নির্ঘুম রওনা দিলাম অন্ধকার ভেদে ট্রেন স্টেশনের উদ্দেশ্যে। সংরক্ষিত উবারের নম্বরে চাপ দেয়ার দু মিনিটে গাড়ী বাসার সামনে হাজির। প্রযুক্তির এই অগ্রগতি সত্যিই বিস্ময়কর।
আমার ফ্লাইট ভোর সাড়ে ছয়টায়। এক শত বিশ মাইল দূরে আমার জ্যাকসন হাইটস বাসা হ’তে। ছোট বেলার অভ্যাস আর গেল না। নিজের সুখের আশায় অন্যকে কষ্ট দেয়া আমার ধাতে সয় না। বাসা থেকে বের হলাম রাত সাড়ে তিনটায়, সবাই গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। ট্রেনের টিকেট আগেই কাটতে হয়। টিকেট চেকার পাঞ্চ করে সেটার এডমিট করালো যাতে আবার ব্যবহার না করতে পারি। পঁচিশ বছর আমার প্রবাস জীবন। প্রবাস জীবনে পাওয়ার পাল্লাই ভারী। চারদিক অন্ধকারের চাদরে আচ্ছাদিত শহর; মাঝে মাঝে ভারী গাড়ির শব্দ বা ইমারজেন্সী গাড়ির শব্দে তন্দ্রা ভাঙ্গে। লং আইল্যান্ড রেল আইল্যান্ডের রেলে চেপে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হল । ধনীদের আড্ডা আর নিজ বাস স্থান এই লং আইল্যান্ড। আটলান্টিক সাগরে ঘেরা নয়ানাভিরাম এ শহরে পর্যটকের অভাব নেই। জীবন উপভোগে বিশ্বের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যটক আসেন এখানে। আমরা যেমন খাই আর সঞ্চয় করি সন্তানদের জন্য। সাদারা খায় আর জমায় জীবন উপভোগ ও বিদেশ ভ্রমণের জন্য। সেন্ট জন্স বীচ এখানকার বড় আকর্ষণ। মাঝে মাঝে আমরা যাই সাঁতার কাটি, বার বি কিউ বানাই। শীত কালটা নিউ ইয়র্কের জন্য ভাল সময় না; বরফে আচ্ছাদিত হয়ে মাঝে মাঝে জীবন স্থবির করে ফেলে।
লং আইল্যান্ডের ম্যাক আর্থার এয়ার পোর্ট ছোট হলেও ছিমছাম ও গোছানো। যথাসময়ে ফ্লাইট ছাড়লো গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। দুই ঘন্টা দশ মিনিট পর উড়ো জাহাজ অবতরণ করলো ওহারে এয়ার পোর্টে। ওহারে এর আগেও আমি কয়েক বার এসেছি। অনেক বড় এয়ার পোর্ট জে এফ কের মত অথবা আটলান্টার হার্টস ফিল্ড এয়ার পোর্টের মত ব্যস্ত। প্রতিবারের মত এবার আর তারকা খচিত হোটেলে বুকিং দেয়নি। অভিজ্ঞতা নিতে চাচ্ছি এয়ার বি এন্ড বির। আমার সুপার হোস্ট আগেই রুম রেডি করে রেখেছিল। মাঝে খোঁজ খবর নিতেন কোন অসুবিধা হচ্ছে কিনা ? কাস্টমারদের কমেন্ট বড়ই জরুরী ব্যবসার প্রসার ও স্থায়িত্বের জন্য। ইমেলডা সব বুঝিয়ে দিলেন কোথায় ও কিভাবে যাব। অন্যান্য হেলপফুল টিপসও দিলেন। ব্রেকফাস্ট ফ্রি থাকায় পেট পুড়ে খেয়ে নিতাম যাতে আর লাঞ্চ খেতে না হয়। আমি ডাইটে অভ্যস্ত বিধায় আমার অসুবিধে হয়নি।
তিন দিন দুই রাতের অবস্থান আমার। প্রথম দিনে মিলেনিয়াম পার্ক ও সিয়ারস টাওয়ার ঘুরে দেখা হলো। বিক্রির পর সিয়ারস টাওয়ারের নতুন মালিক নামকরণ করেছেন উইলিস টাওয়ার। এক সময় পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচা ভবন ছিল এটি। এখনও স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে। মিলেনিয়াম পার্ক আর্ট ও কালচারের শৈল্পিক সংযোজনে ভরপুর। লাইভ কনসার্টের আয়োজন হয় মাঝে মাঝে খোলা ময়দানে। দ্বিতীয় দিন অবিরত বর্ষণের দরুন আমার পরিকল্পনায় কিছু রদবদল করতে হয়েছে। লিংকন পার্ক ও রিগলি মাঠ দেখা হলো চক্ষু মেলে। সন্ধ্যায় সাউদ সাইটে ঘুরলাম। বাড়ি ঘর ভাঙ্গা। নীল পলিথীন দিয়ে ঢাকা ছাদ। পয়সা নেই ছাঁদ রিপেয়ার করার। তাই এ বিকল্প আয়োজন। গাড়িগুলোর বেশির ভাগেরই প্লেট নেই। আলাপ হলো জীনার সাথে। দুই সন্তান আগেই ছেড়ে চলে গেছে মাকে। স্বামী নিরুদ্দেশ। কিসের আশায় বেঁচে থাকবে জিজ্ঞেস করলো, কি উত্তর দিব উত্তর জানা নেই! মেঘে মেঘে অনেক বেলা হয়েছে। পড়ন্ত বিকেলের এই আলোহীন আকাশের পানে তাকিয়ে আনমনা হয়ে বসে রইলো জীনা! ওর চোখের বিষণœতার ছায়া ও বিদায়ের করুণ বেদনা আমাকে ব্যথিত করেছে।
বুধবারে সারাদিন নেভী পিয়ারে ঘোরাঘুরি হলো। এখানে বাচ্চাদের নিয়ে গেলে স্মরণকালের এক ভ্রমণ হতে পারে। সব ধরনের খাবার স্টল, খেলার উপকরণ এবং জা মিশিগান লেকে জাহাজ সত্যিই মনোমুগ্ধকর। ঢেউয়ের উতাল পাতাল টালবাহানায় মর্তের নব্য সুখ মন সুখ উপচে পড়লো যেন। সুখ আর সুখ। ৭৫ মিনিটের জার্নি মাত্র ৩৯ ডলার খুবই কম। খাবার সেরে ৯ টার প্লেন ধরার জন্য আমি রওনা হলাম। সাবওয়ে বা পাতাল রেল বৃত্তের মত ঘিরে রেখেছে শিকাগো। যে কোন জায়গায় ২/৫০ ডলার দিয়ে যাওয়া যায়। কানেকশন না থাকলে ফ্রি বাস সার্ভিসের সুযোগ আছে। লাইনগুলো নীল, লাল, পিঙ্ক, সবুজ লাইনে ছড়ানো। নিউ ইয়র্কে দেখি এলফাবেটিক লাইনে বিন্যস্ত। আড়াই ডলারে এয়ার পোর্টে হাজির। ইন্টারনাশনাল টার্মিনাল পাঁচ গেইটে বোর্ডিং হওয়ায় ডিউটি ফ্রি শপে কিছু সওদা করলাম। আমার সীট সব সময় জানালার পাশে চাই ও রাখি। তাই আকাশ ও জমিন দেখা যায় অনায়াসে। আজ ভরা পূর্ণিমা। আলো আমার জানলায় খেলছে সেই দুষ্ট মেয়টির মত। জীনার করুণ চেহারাটা বার বার সামনে ভেসে উঠলো। ভাবতে লাগলাম নিজের কথা ও বন্ধু-বান্ধবদের কথা। প্লেন মাটি ছুঁইলো। আবার আমার নিউ ইয়র্কের কর্মব্যস্ত জীবন শুরুর তাড়না অনুভব করছি মনে মনে।
শিকাগো।