শিক্ষাবার্তা

শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক সাময়িকী শিক্ষাবার্তার এবারের সংখ্যা প্রকাশনার ২৭ বছর পূর্তি। আফরোজান নাহার রাশেদার শুধু সম্পাদকই নন শিক্ষাবার্তার প্রকাশকের ভূমিকায়ও তিনি। প্রচ্ছদ এঁকেছেন আহমাদ কাওসার। দেশের জ্ঞানী-গুণী ও বিজ্ঞ লেখকদের প্রবন্ধ নিয়ে বর্তমান সংখ্যাটি সাজানো হয়েছে। শিক্ষা সম্পর্কিত যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান থেকে শুরু করে হরেক রকম সঙ্কট উত্তরণের নির্দেশনাও সংযুক্ত করা হয়েছে পুরো বইটিতে। ১৩টি সমৃদ্ধ প্রবন্ধের সমন্বয়ে যেভাবে গ্রন্থটির বিষয়বস্তু গোছানো হয়েছে তা যেমন বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার এক স্পষ্ট প্রতিবেদন পাশাপাশি আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিম-লেরও এক বিশুদ্ধ বার্তাবহ। প্রবন্ধসমূহের গভীরতা এবং ব্যাপ্তির যে সীমানা তা পাঠককুলকে যে কোন অবস্থানে নিয়ে যাবে না পড়লে সেটা বোঝা মুশকিল।
নারী জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া থেকে শুরু করে এমিরেটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলামসহ আরও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্যসমৃদ্ধ লেখনী গ্রন্থটির কলেবরে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। সম্পাদক আফরোজান নাহার রাশেদা নিজেই একজন সুলেখক। তাঁর সম্পাদকীয় লেখাটি শুধু সুখপাঠ্যই নয় তার চেয়েও বেশি বর্তমান সময়ের শিক্ষা সমস্যার একেবারে গভীরে গিয়ে তাকে অনুসন্ধান করারও এক সর্বাত্মক প্রচেষ্টা। ফলে মূল সঙ্কটকে উপস্থাপন করতে গিয়ে সঙ্গত কারণেই এসে পড়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো অনৈতিক, অরাজক ব্যবস্থার এক অসংলগ্ন চিত্র। যা মূল শিক্ষা ব্যবস্থাকে কোনভাবেই ধারণ-লালন করতে পারে না। আর এসব বিড়ম্বনার শিকার শিক্ষা, শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সবাই। এই মহাদুর্ভোগ থেকে উত্তরণের পরামর্শও স্পষ্ট হয়েছে তার যৌক্তিক লেখায়।
বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের লেখা ‘অবরোধ বাসিনী’র মূল সারবত্তা অবরোধের অন্তরালে তৎকালীন বঙ্গললনার অসহায় ও ঝুঁকিপূর্ণ জীবনের করুণ আলেখ্য। সময়ের বলিষ্ঠ পথিক বেগম রোকেয়া যেভাবে কঠোর পর্দা প্রথার পর্বত প্রমাণ আবর্তে আটকে পড়া নারীদের যে বিভীষিকাময় দুর্দশার চিত্র তুলে ধরেছেন তা সত্যিই এক দুঃসহ বাস্তব অভিজ্ঞতা। এখনও তাঁর সে সব লেখা সময় আর যুগের চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছে। নতুন করে আবার পাঠকের কাছে তা উপস্থাপনা করে সম্পাদক একটি প্রযোজনীয় দায়ভাগ পালন করেছেন যা প্রশংসার দাবি রাখে। অধ্যাপক আবদুল মান্নান চৌধুরীর ‘শিব গড়তে গিয়ে বানর গড়েছি কিনা? প্রবন্ধটি সময়ের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত জরুরী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ‘সান্ধ্য কোর্সে নিম্নমানের স্নাতক তৈরি হওয়ার ওপর বিশেষ দৃষ্টি নিবদ্ধ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে নৈশকালীন বেসরকারী উচ্চ শিক্ষার ফারাকের ওপর তার সুসংবদ্ধ মতামত অত্যন্ত যুক্তিসম্মত উপায়ে বিধৃত করেছেন, যা বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার একটি অন্যতম সঙ্কট। যেহেতু সাময়িকীটি সাংস্কৃতিক পরিম-লেও তার সীমানাকে বিস্তার করেছে সে জন্য অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন ভিন্নমাত্রার আর এক চমৎকার রচনাশৈল। ‘অক্টোবর বিপ্লবের সাংস্কৃতিক তাৎপর্য প্রবন্ধে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়ার উত্থান, দ্রুতগতিতে বিকাশ এবং সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনে এর অন্তর্নিহিত শক্তি সবই অত্যন্ত সাবলীলভাবে তুলে ধরেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই এমিরেটাস অধ্যাপক। যেখানে শিক্ষা ব্যবস্থাকেও বিশেষ তাৎপর্যের সঙ্গে অনুধাবন করা হয়েছে। সঙ্গত কারণে রবীন্দ্রনাথের ‘রাশিয়ার চিঠি’ও প্রসঙ্গক্রমে আলোচিত হয়েছে যা শিক্ষাবার্তার মূল আঙ্গিকের অনুষঙ্গ বলাই যেতে পারে। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের লেখা ‘ফিরে দেখা বাংলাদেশে ধর্ম, রাজনীতি ও রাষ্ট্র প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে উনিশ শতকের ধর্মসংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকে বহুমাত্রিক লড়াই- সংগ্রামের পর্যায়ক্রমিক অভিঘাতে কিভাবে ’৪৭-এর দেশ বিভাগে সারা বাংলা আক্রান্ত হলো। ধর্ম, রাজনীতি আর রাষ্ট্র এক অবিচ্ছিন্ন বলয়ে একীভূত হয়ে বিংশ শতাব্দীর অর্ধশত বছরকে যেভাবে বিড়ম্বনার শৃঙ্খলিত ধারায় টেনে নিয়েছে তার একটি বিধিসম্মত পর্যালোচনা প্রবন্ধটিকে সমৃদ্ধ করেছে।
সেখান থেকে ’৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধের সংগ্রামী অভিযাত্রা ও পর্যায়ক্রমিকভাবে তৈরি হয়েছে যা লেখকের গভীর অন্তদৃষ্টির এক সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ। এমন বিজ্ঞ গবেষক, আলোচক এবং বিশেষজ্ঞের গভীর তাৎপর্যপূর্ণ বিশ্লেষণ বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতাকে পাঠকের সামনে যেভাবে নিয়ে আসে তা শুধু মুগ্ধতা আর বিস্ময় ছাড়া আর অন্য কিছু নয়। বাকি অভিনন্দনটুকু শুধু সম্পাদকেরই প্রাপ্য। বইটির বহুল প্রচার এবং সফলতা কামনা করছি।