শিশুকে কথা বলা শেখানো

ডাঃ সওকত আরা বীথি

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে শিশুরা স্বাভাবিকভাবে কথা বলা শিখে যায়। এদের আবার কথা বলা শেখানোর প্রয়োজন কিসের ? কথা তো বনের পাখিদের শেখানোর দরকার হয় । একথা ঠিক নয় । শিশুদেরকেও কথা বলা শেখানোর প্রয়োজন আছে ।” কথা” হচ্ছে মানুষের মুখ দিয়ে উচ্চারিত কিছু শব্দ বা বাক্য , যার অর্থ থাকতে হবে । কথাকে মানুষের মাঝে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম বললে অত্যুক্তি হবে না । অবশ্য সুস্পষ্ট ভাষায় কথা না বললেও আকার, ইঙ্গিতে এবং মুখের কতিপয় শব্দ দ্বারাও মানুষের মাঝে যোগাযোগ করা সম্ভব। আদিম যুগে আমাদের পূর্বপুরুষগণ এভাবেই ভাবের লেন-দেন করতেন । সেই আদিম যুগে, যখন মানুষের বাস ছিল বনে- জঙ্গলে এবং বনের পশুদের সাথে লড়াই করে জীবিকা নির্বাহ করতে হ’ত, তখনও মানুষ মুখ দিয়ে নানাপ্রকার শব্দের দ্বারা একে অপরের সাথে এমনকি প্রয়োজনের তাগিদে পশুদের সাথেও যোগাযোগ রক্ষা করত ।
আজ এই সুসভ্য জগতে সেসব দিনের কথা ভাবাই যায়না। এই পৃথিবীতে বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের বাস । বিভিন্ন ভাষায় তারা কথা বলেন । আর এই ‘ কথা বলা’ বিষয়টিও যে বিশেষ ,গুরুত্বপূর্ণ , বিশেষ করে শিশুদের বেলায় , সেকথা আজ ভাবার দিন এসেছে । কারণ একথা সত্যি যে কোন কারণে একটি শিশু যদি জঙ্গলে একাকি বড় হয় , কোন মানুষকে কথা বলতে না শোনে, তাহলে সেই শিশু বনের পশুপাখির চিৎকার ,শব্দ, ইত্যাদি যা শুনবে সেটাই শিখবে । কারণ কথার জন্ম মস্তিষ্কে। যদিও তা উচ্চারিত হয় আমাদের মুখ তথা শব্দ নালী দিয়ে । অবশ্য শব্দের উৎপত্তি শুধু গলা থেকে বললে পুরোটা বলা হয়না । শব্দসৃষ্টির জন্য যেমন গলায় রয়েছে স্বর- যন্ত্র, তেমনি মুখের তালুর পশ্চাদভাগ , জিভ এবং ঠোঁট, স্বরসৃষ্টির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । এই সামগ্রিক প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল । শব্দসৃষ্টির বিভিন্ন পর্ব বা পর্যায়ে শব্দসৃষ্টিকারী শরীরের এ সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যে বায়ু চলাচল, জিভ , ঠোঁটের নড়াচড়া ইত্যাদির মধ্যে একটি গভীর সামঞ্জস্য রয়েছে । কিন্তু এসব বিষয় না বুঝে , না জেনেও একটি শিশু নির্ভাবনায় কথা শিখে যায় ।
সাধারণতঃ ছয় – সাত মাস বয়সের পর থেকেই একটি শিশুর মুখে আধো আধো বুলি ফুটে যায় এবং এক বছর বয়স থেকে কথা বলা শিখতে শুরু করে । এভাবে দু’তিন বছরের মধ্যেই শিশু স্বচ্ছন্দে কথা বলতে শিখে যায় । তবে অনেক ক্ষেত্রে শিশু দেরীতে কথা শুরু করতে পারে এবং ভালভাবে কথা বলতে আরও কিছু বেশি সময় লাগতে পারে । এ নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করার কোন কারণ নেই । কারণ কথা শেখার জন্য যেমন আমাদের শরীরের স্বর- সৃষ্টিকারী প্রত্যঙ্গগুলোর ভূমিকা রয়েছে , তেমনি সমান গুরুত্ব রয়েছে মস্তিষ্কের স্নায়ুপুঞ্জের। সামাজিক শিক্ষাপ্রক্রিয়ার অবদানও অতীব গুরুত্বপূর্ণ । অর্থাৎ কথা শেখার পেছনে স্নায়ুবিক ,মানসিক ও সামাজিক কলাকৌশলের মধ্যকার সমন্বয় একান্তই অপরিহার্য । কিন্তু ব্যাপারটা এতই স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটে যে কেউ এসব খেয়ালও করেন না । বিষয়টি কোন ধরনের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ছাড়া জলে কিছুদিন হাত পা ছুড়ে সাঁতার শেখার মত।
কোন শিশু মস্তিষ্কের অপূর্ণতা অথবা কম পরিপূর্ণতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করলে সে শিশু দেরীতে কথা বলে । তবে এক্ষেত্রে চুপ করে বসে থাকা ঠিক নয় । অবশ্য এ ব্যাপারে ধৈর্য সহকারে অপেক্ষা করতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে । চিকিৎসক , পিতামাতাকে উপযুক্ত পরামর্শ দান করে শিশুকে কথা বলতে সাহায্য করবেন ।
স্বর-সৃষ্টির প্রত্যঙ্গগুলো হচ্ছে: স্বরযন্ত্র , মুখের তালুর পশ্চাদভাগ , জিভ , ঠোঁট ইত্যাদি । যদি এসবের ক্ষেত্রে কোন অসুবিধা থাকলে কথা বলা শিখতে অসুবিধা হতে পারে এবং এক্ষেত্রেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে । কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষা এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় শিশুকে কথা বলতে উদ্বুদ্ধ করা বা কথা বলতে শেখানো। এ বিষয়টি যে বেশ গুরুত্বপূর্ণ সেটাই আমাদের অনেকের জানা নেই । যেমন যে বয়সে শিশুর বাকস্ফুরণ সূচিত হয় এবং পরবর্তীতে ভাঙা ভাঙা কথায় পরিণত হতে আরম্ভ করে সেই সময় হাত মুখ নেড়ে শিশুদের সাথে কথা বলতে হয় । শিশুদের মুখে সাধারণতঃ বাব্ বাব্ ,দাদ্ দাদ্ অথবা বাবা ,দাদা ইত্যাদি বুলি প্রথমে উচ্চারিত হয় । মা’ কথাটি সাধারণতঃ একটু পরেই আসে শিশুদের মুখে । অবশ্য সকল শিশুর বেলায় সবকিছু একরকম হয়না । বাড়িতে বুড়ো দাদা দাদী ,নানা নানী থাকলে তারাই সোৎসাহে শিশুকে কথা শেখানোর কাজটি করে থাকেন । আবার বাড়ির ও পরিবারের ছোট ছেলেমেয়েরাও খেলার ছলে ছোট শিশুর সাথে কথা বলতে খুব উৎসাহ পায়। এভাবে একসময় শিশু কথা বলতে শিখে যায়। তাই বলে মা – বাবার ভূমিকাও বাদ দেয়ার নয় । মা বাবাকেও সময় করে শিশুর সাথে দিনের কিছু সময় কথা বলা উচিত । তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে যে, পরিবারের সকলকেই নিজেদের মাতৃ ভাষায় কথা বলতে হবে । আমেরিকায় বসবাসকারী এক মহিলার শিশুর বেলায় এমনটি ঘটেছিল । তিনি তার শিশুটির মুখে কথা ফোটার সময় একটি অফিসে চাকরি নেন এবং সে সময় শিশুকে ইংরেজি ভাষাভাষী ডেকেয়ারে ন্যানীর তত্ত্বাবধানে রেখে যেতেন । শিশুটিকে বাড়ি আনার পর সে মায়ের বাংলা ভাষা শুনতে পেত । ফলে শিশুটি মিশ্র ভাষার সংমিশ্রণের শিকার হয় এবং তার মস্তিষ্কের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। ফলশ্রুতিতে শিশুটি মুখে কিছু শব্দ ছাড়া আর কিছুই বলতে পারছে না । মা বাবা এ নিয়ে খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন এবং ডাক্তারের পরামর্শ নিলেন । শেষ পর্যন্ত দু বছর বয়সে শিশুটি কথা বলা আয়ত্ব করেছিল।
আমেরিকায় বসবাসকারী আর একজন মহিলা তার শিশুকে নিয়ে বাংলাদেশে তার মায়ের কাছে বেড়াতে গিয়েছিলেন কয়েক মাসের জন্য । শিশুটি তখন সবেমাত্র কথা বলতে শিখছে । কিন্তু এই নতুন পরিবেশে এসে দেখা গেল শিশুটি একেবারেই কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে । মুখ দিয়ে কিছু শব্দ ছাড়া আর কিছুই বলত না । এমন ঘটনার সংখ্যা হয়ত খুবই কম । কিন্তু সমস্যাগুলো আমাদের জানা থাকা উচিত । এছাড়া সামাজিক পরিবেশ ভিন্নতর হওয়ার কারণেও শিশুর কথা শেখা ও বলা ব্যাহত হতে পারে । যেমন শহর এবং গ্রামের পরিবেশ এক নয় । গ্রামের পরিবেশ শহরের থেকে বেশ খোলামেলা হয়ে থাকে এবং শিশুরা এ ধরনের খুব পছন্দ করে । সেখানে একটি পরিবারের সাথে আরেকটি পরিবারের ভাবের আদানপ্রদান খুব সহজেই হয়ে যায় । এর ফলে শিশুদের খেলাধুলা , কথাবলা ও শোনার সুযোগ সৃষ্টি হয়। ফলে তাদের বাকস্ফূরণ ও বিকাশ সহজ স্বাভাবিক হয়। শহরে সাধারণতঃ এ ধরনের উন্মুক্ত পরিবেশ পাওয়া যায়না । শহরে সকলেই বেশ আত্মকেন্দ্রিক । সেখানে পাশের বাড়ির একটি শিশুর সাথে অন্য বাড়ির শিশুর দেখা-সাক্ষাৎ ও খেলাধুলার তেমন সুযোগ থাকেনা। এমতাবস্থায় শিশুর কথা শেখার বয়সে সমবয়সী অপর শিশুর সাথে তার মেলামেশার ও ভাব বিনিময়ের সুযোগ করে দিতে হবে। ফলে উভয় শিশু কথা বলার কৌশল আয়ত্ব করতে পারবে ।
বর্তমানে অনেক প্রসূতিই চাকরিজীবী । সুতরাং দিনের অনেকটা সময়ই তারা শিশুর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেন। তাই কর্মক্ষেত্র থেকে তাদের উচিত হবে সর্বাগ্রে নিজ নিজ সন্তানকে বুকে জড়িয়ে নেয়া এবং পরে সংসারের অন্য কাজে জড়িত হওয়া।
সর্বোপরি বলা যায় – , একটি শিশু ঘরে থাকলে তাকে কথা শেখানোর ব্যাপারে পরিবারের সকলকেই সজাগ থাকতে হবে। তবে সার্বিক দায়িত্ব মাকেই নিতে হবে । তাহলে শিশুর কথা শেখার ব্যাপারে কোন প্রতিবন্ধকতা থাকবেনা । আর এর পরও যদি শিশুর বয়স অনুপাতে স্বাভাবিক কথা বলার স্বতঃস্ফূর্ততা না আসে তবে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে । আর এভাবে সময়োচিত পদক্ষেপ নেওয়া হলে শিশুর কথা শেখার সমস্যা সহজেই কাটিয়ে ওঠা সম্ভবপর হয় ।
মিনেসোটা ,ইউ ,এস,এ ।