শিশু আমালের মৃত্যু : নিশ্চিহ্ন হতে যাচ্ছে অর্ধেক ইয়েমেনি

বিশ্বচরাচর ডেস্ক : সাত বছরের মেয়ে আমাল হুসাইন। ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের একটি শরণার্থী শিবিরে বাস করত সে। সৌদি অবরোধের কারণে সৃষ্ট ইয়েমেনের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষকে চিত্রায়িত করতে গত সপ্তাহে নিউ ইয়র্ক টাইমস তার ছবি প্রকাশ করেছিল। আজ সেই আমাল হুসাইন আর বেঁচে নেই। ১ নভেম্বর শরণার্থী শিবিরেই অনাহারে তার মৃত্যু হয়েছে। আরব শাসকদের খামখেয়ালির শিকার হয়ে পৃথিবীর প্রতি একগাদা অভিমান নিয়ে বিদায় নিল সে। আমাল হুসাইনের মা বলছিলেন, তার মৃত্যুর কথা। সন্তান হারিয়ে শোকে কাতর এই মা নিউইয়র্ক টাইমসকে ভগ্ন হƒদয়ে জানিয়েছেন, মৃত্যুর সময় আমার আমাল হাসছিল।
তিনি এখন তার অন্য সন্তানদের বাঁচাতে পারবেন কি না, সেটা নিয়ে চিন্তিত। আমালের মৃত্যুর সময় তাকে চিকিৎসা দিচ্ছিলেন ইয়েমেনি ডাক্তার মেক্কিয়া মাহদি। তিনি জানান, প্রতিদিনই এরকম মৃত্যু দেখেন তিনি। আমাল হুসাইনের যে ছবিটি পৃথিবীজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল সেটি তুলেছেন পুলিতজার জয়ী ফটোগ্রাফার টেইলর হিকস। এতে দেখা যায় আমাল ইয়েমেনে অবস্থিত ইউনিসেফের একটি ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায় রয়েছে। এ ছবি প্রকাশের পর ইয়েমেনের দুর্ভিক্ষের প্রতি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। জাতিসংঘসহ বিশ্বের নানা দেশ ও সংস্থা এরঅবসানের আহ্বান জানায়। সৌদি আরবসহ সুন্নিজোট ব্যাপক সমালোচিত হয়। আমালের মৃত্যু দেখিয়ে দিয়েছে ইয়েমেনের অবস্থা এখন কতটা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। মধ্যপ্রাচ্য তথা আরববিশ্বের সব থেকে দরিদ্র রাষ্ট্র ইয়েমেন। দেশটিতে ২০১৪ সাল থেকে ভয়াবহ যুদ্ধ চলেছে। জনপ্রিয় হুতি যোদ্ধারা তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আব্দুল রাব্বু মনসুর হাদিকে উৎখাত করে রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। হুতি যোদ্ধাদের উত্থানে চিন্তিত হয়ে পড়ে প্রতিবেশী সুন্নি আরব রাষ্ট্রগুলো। প্রথম থেকেই দেশগুলো অভিযোগ করে আসছে, হুতিদের উত্থানের পেছনে ইরানের হাত রয়েছে। তাই হুতি দমনের নামে ২০১৫ সালে ইয়েমেনে হামলা চালায় সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব জোট। বাছবিচারহীনভাবে দেশটিতে বিমান হামলা চালাতে থাকে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী ২০১৭ সাল পর্যন্ত নারী ও শিশুসহ দশ হাজারেরও অধিক ইয়েমেনি নিহত হয় এতে। গত এক বছর ধরে এ সংখ্যা গণনা করা হয়নি। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ যুদ্ধ পর্যবেক্ষণ সংস্থা এসিএলইডির সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী যুদ্ধের কারণে ইয়েমেন ৫৬,০০০-এরও অধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। কিন্তু এ গণহত্যার দায় কে নেবে? জাতিসংঘ ক্রমাগত সৌদি জোটের তীব্র সমালোচনা করে আসছে। গত বছর সংস্থাটি সৌদি জোটের হামলাকে শিশু অধিকার লঙ্ঘনে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান মার্ক লোকক নিরাপত্তা পরিষদকে জানিয়েছেন, ইয়েমেন এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। সেখানে কমপক্ষে ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ মৃত্যু ঝুঁকিতে রয়েছে। অর্থাৎ, দেশটির জনসংখ্যার অর্ধেকই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। শেষ ১২ মাসে ইয়েমেনে খাদ্যের দাম ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এক ডলার কিনতে এখন ১০০০ ইয়েমেনি রিয়াল লাগছে। গত ১ নভেম্বর জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল জানিয়েছে, খাদ্যের অভাব, উচ্ছেদ, অপুষ্টি ও রোগাক্রান্ত হয়ে ভুগছে আরো ১১ লাখ ইয়েমেনি। সৌদির অবরোধ চলতে থাকলে দেশটির ২০ লক্ষাধিক মা মৃত্যু ঝুঁকিতে পতিত হবেন। বিশ্ববাসীর তাই সময় এসেছে ইয়েমেনের দিকে তাকানোর। সেখানকার মানবিক বিপর্যয় নজিরবিহীন। সৌদি জোটের আগ্রাসনে লক্ষাধিক জীবন হারানোর আগেই ইয়েমেনে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া দরকার।