শেষ পর্যন্ত তো আমরা পশুই

সোহেল রানা
ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের বিরুদ্ধে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের একাধিক প্রতিবেদন আছে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে মাত্রাতিরিক্ত ফোর্স ব্যবহার, অযাচিত সীমান্ত হত্যাকাল্ড ইত্যাদি নানা অপকর্মের কারণে বিএসএফের বিরুদ্ধে সময়ে সময়ে একাধিক প্রতিবেদন দেয় হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
এসব প্রতিবেদনের একটিতে (২০১২ সাল) হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ভারতীয় সরকারের করনীয় নিয়ে নিম্নোক্ত সুপারিশসমূহ পেশ করে :
১. বিএসএফকে অস্ত্র ও ফোর্স ব্যবহারের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে।
২. বিএসএফের যেকোনো হত্যাকাÐ বা ফোর্স ব্যবহারের তদন্ত অভ্যন্তরীণভাবে না করে ভারতীয় সিভিল কর্তৃপক্ষ যেমন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে করাতে হবে।
৩. ভারতীয় সরকারকে একটি নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে বিএসএফের অপরাধ তদন্ত ও বিচারের জন্য। সেই কমিশনে বাংলাদেশ ও ভারতীয় পক্ষ প্রমাণাদিসহ অভিযোগ দাখিল করতে পারবে।
৪. বিএসএফের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে আদালতে প্রসিকিউট করার জন্য নির্বাহী বিভাগের অনুমতি সংক্রান্ত সকল আইন যেমন : ভারতীয় সিআরপিসি (১৯৭ ধারা) বাতিল করতে হবে।
৫. যেসব বিএসএফ সদস্য অপরাধের সাথে জড়িত হবে তাদের জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে নিয়োগ প্রদান করা যাবে না।
জাতিসংঘ গবেষণা করে চমৎকার সমাধান বের করার জন্য উপযুক্ত জায়গা। তবে, এসব সমস্যা মাঠে বাস্তবায়ন করতে লাগে রাষ্ট্রগুলোর সদিচ্ছা। এখানেই জাতিসংঘ নীরব।
বর্তমানে ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের সাথে এক ধরণের ঠান্ডা যুদ্ধে আমেরিকার অংশীদার। ফলে এই অঞ্চলে এ সময়ে ভারতের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অকুণ্ঠ সমর্থন থাকবে; সেটা কোনো হত্যাকাÐ হালাল করে হলেও। এই সমর্থন প্রতিফলিত হবে জাতিসংঘের ব্যবস্থা ও সিদ্ধান্তগুলোতেও। কারণ জাতিসংঘ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সংরক্ষণের ম্যান্ডেট নিয়েই জন্ম নিয়েছে।
জাতিসংঘ সম্পর্কিত কোনো এক ক্লাসে আমি এক প্রফেসর ও মার্কিন সরকারের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তাহলে জাতিসংঘের এক বড় ধান্দা হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ক্ষমতা কাঠামো (যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও তাদের মিত্রদের আধিপত্য) বজায় রাখা, রাইট?’
প্রফেসর বলেছিলেন, ‘ওয়েল, ইয়েস, ইউ আর কাইন্ড্যা রাইট।’
ফলে, যত চমৎকার সমাধানের প্রস্তাবই আসুক না কেন রাজনৈতিক সমীকরণে তা আটকা পড়বে জাতিসংঘে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জাতিসংঘের নেটওয়ার্কের এক এনজিও হিসেবে ফেলানীদের পক্ষে অবস্থান নিতে পারে, জাতিসংঘের মতো কর্তৃপক্ষের দরজায় আঘাত হানতে পারে; বাস্তবায়ন তো আর করতে পারে না। বাস্তবায়ন জাতিসংঘে রাষ্ট্রগুলোর জটিল রাজনীতির কাছে হেরে যায়। সেখানে ভারতকে ভারত হতে হয়, যুক্তরাষ্ট্রকে যুক্তরাষ্ট্র। কেউই মানুষ হওয়ার প্রেশার বোধ করে না।
আমি সরকারি চাকরি থেকে বের হয়ে একটা মামলা করতে চাই ভবিষ্যতে। ফেলানী বনাম জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও সোহেল রানা। নিজের বিরুদ্ধে নিজের মামলা। এই মামলা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলে আমিসহ বাকি সবাই হেরেই যাব। আমি প্রচÐভাবে হারতে চাই। কিছুটা হলেও দায়মুক্তি পাওয়া যাবে তাতে।
মানুষের জীবনকে এতো কম মূল্য দিয়ে নিজেদের আসলেই কি মানুষ বলা যায়? যায় সম্ভবত! শেষ পর্যন্ত তো আমরা পশুই!
-মিনেসোটা।