শ্রীলংকায় ক্ষমতার লড়াই

সিরিসেনার বিরুদ্ধে আদালতে যাচ্ছেন বিক্রমাসিংহে

বিশ্বচরাচর ডেস্ক : নির্ধারিত সময়ের আগেই শ্রীলঙ্কার পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে ৫ জানুয়ারি দেশজুড়ে ফের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট মৈত্রীপালা সিরিসেনার নেয়া সিদ্ধান্তকে ‘বেআইনি’, ‘সংবিধানবিরোধী’ এবং ‘স্বৈরাচারী’ বলে দাবি করেছেন সদ্য-গদিচ্যুত প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে। প্রেসিডেন্টের আদেশ চ্যালেঞ্জ করতে গত ১২ নভেম্বর উচ্চ আদালতে যাচ্ছেন শ্রীলংকার বিরোধীদলীয় এমপিরা। তারা বলছেন, এভাবে পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়া অসাংবিধানিক।

এ দিকে, প্রেসিডেন্ট মৈত্রিপালা সিরিসেনা নতুন গেজেট জারি করে পুলিশ বিভাগ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। এই বিভাগ আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে ছিল। বিশেষ গেজেট নোটিফিকেশনে বলা হয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকা শ্রীলংকার পুলিশ বিভাগ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।

উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট সিরিসেনার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং তিনিই সশস্ত্র বাহিনী প্রধান। গেজেট নোটিফিকেশন অনুযায়ী, ৪২টি বিভাগ, সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় সংস্থা অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। আগের সরকারের আমলে এসব প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ছিলো।

বিক্রমাসিংহের দল ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি (ইউএনপি) বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, আইনের শাসন জারি রাখতে ও দেশের সংবিধানকে রক্ষা করতে আদালতের হস্তক্ষেপ চায় তারা। তাই সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। অন্য দিকে, ‘ডেমক্র্যাটিক মুভমেন্ট ইন শ্রীলংকার আইনজীবীরা নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রতি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে প্রেসিডেন্টের অসাংবিধানিক সিদ্ধান্ত সাহসের সঙ্গে উপেক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, ১৪ নভেম্বর অষ্টম পার্লামেন্ট আহ্বানের ব্যাপারে স্পিকারের সামনে কোনো আইনগত বাধা নেই। আগের এক গেজেট নোটিফিকেশনে এই দিন অধিবেশন আহ্বান করেছিলেন প্রেসিডেন্ট। আইনজীবীরা আরো বলছেন যে, প্রেসিডেন্টের পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দেয়া স্বেচ্ছাচারি, অসাংবিধানিক ও অগণতান্ত্রিক। সংবিধানের ৭০ ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, মেয়াদের প্রথম সাড়ে চার বছরের মধ্যে পার্লামেন্টের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য না চাইলে প্রেসিডেন্ট পার্লামেন্ট ভেঙে দিতে পারবেন না। তারা অভিযোগ করে বলেন, পার্লমেন্টে কার প্রতি সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন রয়েছে তা যাচাইয়ের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ ১১৬ জন সদ্যস্যের লিখিত অনুরোধ ও বারবার আহ্বান জানানোর পরও প্রেসিডেন্ট সক্রিয়ভাবে পার্লামেন্ট অধিবেশন আয়োজনে সক্রিয়ভাবে বাধা দিয়েছেন।

শ্রীলঙ্কার আইনানুযায়ী, পার্লামেন্ট গঠনের সাড়ে চার বছরের মধ্যে তা ভাঙা যায় না। বর্তমান পার্লামেন্টের সময়সীমা ছিল ২০২০ সাল পর্যন্ত। তার আগে তা ভাঙতে চাইলে পার্লামেন্টের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতি প্রয়োজন। অথবা গণভোটই শেষ পথ। কিসের ভিত্তিতে সিরিসেনা গত ৯ নভেম্বর পার্লামেন্ট ভাঙলেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়। যদিও তার আইনি বিশেষজ্ঞদের দাবি, নিয়ম মেনেই এই পদক্ষেপ।

সিরিসেনা ও বিক্রমাসিংহে দু’পক্ষের রেষারেষিতে শ্রীলঙ্কার রাজনীতি বেশ কিছু দিন ধরেই টালমাটাল। বিক্রমাসিংহের ‘অতি-উদার’ বিদেশনীতি দেশবাসীর ভাবাবেগকে আঘাত করেছে বলে অতীতে বারবার ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সিরিসেনা। শেষমেশ গত ২৬ অক্টোবর নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বিক্রমাসিংহেকে বরখাস্ত করে নিজের পছন্দের মাহিন্দা রাজাপক্ষেকে সেই পদে বসান তিনি। কিন্তু পার্লামেন্টে রাজাপক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে পারবেন না এমন আশংকায় গত ৯ নভেম্বর পার্লামেন্ট বিলুপ্ত করে নতুন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন তিনি। নতুন ঘোষণায় আগামী ৫ জানুয়ারি নির্বাচন ও ১৭ জানুয়ারি পার্লামেন্ট অধিবেশন আহ্বান করা হয়।

তবে প্রেসিডেন্টের নেয়া এই পদক্ষেপে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে শ্রীলঙ্কার ভাবমূর্তিই ক্ষুণœ হবে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। সেখানে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে গত ১০ নভেম্বর নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আমেরিকা, ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া।