সংসদে রাষ্ট্রপতি : সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশকে সমৃদ্ধির পথে নিতে হবে

ঢাকা : রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, দেশে আইনের শাসন সুসংহত ও সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। দেশ থেকে জঙ্গিবাদ ও অপশাসন নির্মূল করতে সরকার কাজ করে চলেছে। তিনি বিরোধী দলসহ সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশকে সম্মৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে আহ্বান জানান। গতকাল জাতীয় সংসদে দশম জাতীয় সংসদের ১৯তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে ১৫৭ পৃষ্ঠার এ ভাষণ সংসদে পঠিত বলে গৃহীত হয়। বক্তব্যের সারসংক্ষেপ হিসেবে ৬৩ পৃষ্ঠা তিনি সংসদে পাঠ করেন। মাগরিবের বিরতির পর সন্ধ্যা ৬টা ৩ মিনিটে অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করেন রাষ্ট্রপতি। সঙ্গে সঙ্গে তখন জাতীয় সংগীত বেজে ওঠে। এ সময় সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মন্ত্রী, এমপিরা দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রপতিকে সম্মান প্রদর্শন করেন। ভাষণে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকা- তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে সরকার দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। এ সময়ে মাথাপিছু জাতীয় আয় পূর্ববর্তী অর্থ-বছর হতে ১৪৫ মার্কিন ডলার বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ৬১০ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। একই সময় রপ্তানি আয় ৩৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরে খাদ্যভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর জন্য প্রায় ৫ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য স্বল্পমূল্যে খোলাবাজারে চাল বিক্রির উদ্দেশে ৬১২ কোটি টাকা এবং ১০ টাকা মূল্যে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির জন্য ৭২৩ কোটি টাকার খাদ্যশস্য বরাদ্দ করা হয়েছে। আবদুল হামিদ বলেন, শান্তি, গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও সম্মৃদ্ধি অর্জনে যে পথ আমরা পরিক্রমণ করছি তা আমাদের বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে। বিশ্ব সভায় ইতিমধ্যে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সামাজিক অগ্রগতি ও সম্মৃদ্ধি অর্জনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একটি সম্মানজনক অবস্থানে সমাসীন হবে। মহাজোট সরকারের ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দিনবদলের সনদ-‘রূপকল্প-২০২১’ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত একটি প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে সরকারের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে নিম্নমধ্য-আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। আমি আশা করি, সুশাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়ণ এবং সমাজের সব স্তরে প্রত্যক্ষ জনসম্পৃক্তির মধ্য দিয়ে আমরা নির্ধারিত লক্ষ্যসমূহ অর্জনসহ একটি আদর্শ সমাজভিত্তিক কল্যাণমূলক রাষ্ট্রগঠনে সক্ষম হব। তিনি বলেন, জনগণের দোরগোড়ায় সব ধরনের তথ্য ও সেবা পৌঁছে দেওয়ার একটি সমন্বিত উদ্যোগ হিসেবে ৪ হাজার ৫৫৪টি ইউনিয়ন পরিষদে, ৩২১টি পৌরসভায় এবং ৪০৭টি সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ডে ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে।
মহাকাশে বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’-এর নির্মাণকাজ শতভাগ সমাপ্ত হয়েছে এবং উৎক্ষেপণের অপেক্ষায় রয়েছে। রাষ্ট্রপতি বলেন, সরকার দেশের সব অঞ্চলের মধ্যে সুষ্ঠু এবং সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ সড়ক অবকাঠামো ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন কাজ এগিয়ে চলছে এবং ২০১৮ সালের শেষ নাগাদ এ সেতু যানবাহন পারাপারের জন্য খুলে দেওয়া সম্ভব হবে আশা করা যায়। কর্ণফুলী নদীর তলদেশে ৩ দশমিক ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ টানেল নির্মাণকাজ ২০২০ সাল নাগাদ সম্পন্ন হবে আশা করা যায়। রাষ্ট্রপতি বলেন, একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা ও হত্যা মামলাটি বিচারিক আদালতে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির পর্যায়ে আছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১৯৭১ সালে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচার সম্পন্ন করছে এবং বিচারের রায় কার্যকর হচ্ছে। জঙ্গিবাদ ও উগ্র সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি বৃদ্ধির লক্ষ্যে জুলাই ২০১৬ হতে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের বিভাগ ও জেলাপর্যায়ে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন। ফলে, জনমনে স্বস্তি ফিরে এসেছে এবং জনগণ জঙ্গিবাদবিরোধী চেতনায় উজ্জীবিত হয়েছে। রাষ্ট্রপতি বলেন, একাত্তরের শহীদদের নিকট আমাদের অপরিশোধ্য ঋণ রয়েছে। আসুন ধর্ম-বর্ণ- গোত্র নির্বিশেষে মত-পথের পার্থক্য ভুলে জাতির গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা ও দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার মধ্য দিয়ে আমরা লাখো শহীদের রক্তের ঋণ পরিশোধ করি।