সংসদ নির্বাচনের আইন আজও বাংলায় হলো না

রাজনৈতিক ডেস্ক : সংসদ নির্বাচনের নিয়মাবলি সম্পর্কিত আইন ‘দ্য রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য পিপল অর্ডার (আরপিও)-১৯৭২’ বাংলায় রূপান্তরের জন্য এর ৯৪-এ অনুচ্ছেদে বলা হয়, ‘সরকার সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপন দ্বারা এই অধ্যাদেশের প্রমাণিকৃত বাংলা পাঠ প্রণয়ন করতে পারবে।’ ২০০৮ সালে ড. এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশনের প্রস্তাব অনুসারে সে সময় রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে আরপিওর অন্যান্য সংশোধনীর সঙ্গে এ অনুচ্ছেদটিও যুক্ত হয়। কিন্তু গত ১০ বছরেও কাজটি সম্পন্ন করা হয়নি; যে কারণে সাধারণ জনগণের এই আইন পরিপূর্ণভাবে জানা বা বোঝার উপায় নেই।

কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে তাদের কর্মপরিকল্পনা বা রোডম্যাপে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-১৯৭২ (আরপিও) এবং সীমানা পুনর্নির্ধারণ অধ্যাদেশ বাংলায় প্রণয়নে আগ্রহের কথা জানিয়েছিল। এ বিষয়ে প্রস্তুতিমূলক কাজও সম্পন্ন করা হয়। ইংরেজি ভাষার এসব আইন বাংলায় অনুবাদ করে একটি খসড়া প্রস্তাবও তৈরি করা হয়। কিন্তু গত ৩০ আগস্ট নির্বাচন কমিশনের সভায় প্রস্তাবটি অনুমোদন পায়নি। এ অবস্থায় আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এসব আইন বাংলায় পাঠ, প্রচার বা প্রয়োগের আইনগত সুযোগ সৃষ্টি হলো না।

নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদ এ বিষয়ে সম্প্রতি বলেন, আরপিও ত্রুটিমুক্তভাবে বাংলায় রূপান্তরের জন্য যে সময় প্রয়োজন, তা এখন নেই। এ কারণে নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে এখন কোনো প্রস্তাব পাঠাচ্ছে না। সংসদ নির্বাচনের পর এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয় সূত্র জানায়, এর আগে ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কিত আইন ও বিধিমালাগুলো বাংলায় রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ জন্য আরপিও, দি ডিলিমিটেশন অব কনস্টিটিউয়েন্সিস অর্ডিন্যান্স বা নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ অধ্যাদেশ বাংলায় অনুবাদও করা হয়। কিন্তু সে সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়টি রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে অধ্যাদেশ আকারে জারি করার উদ্যোগ নিতে রাজি হয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষ থেকে তখন নির্বাচন কমিশনকে বলা হয়, এই কাজ রাজনৈতিক সরকারের মাধ্যমেই সম্পন্ন হওয়া দরকার। কিন্তু অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার এ বিষয়ে আগ্রহ দেখায়নি। কমিশন সচিবালয়ের ২০০১ সালে অনুবাদ করা ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালা’ পুস্তক আকারে এখনো সংরক্ষিত রয়েছে। কিন্তু বিষয়টি অনুমোদিত না হওয়ায় এটি ব্যবহারের আইনগত ভিত্তি নেই। এ ছাড়া ২০০৮ সালে আরপিওর ব্যাপক সংশোধনীর ফলে এটি নতুন করে অনুবাদের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। সে সময় ড. শামসুল হুদা কমিশন ওই কাজটিও সম্পন্ন করে এবং আরপিওতে এর পক্ষে বিধানও যুক্ত হয়। কিন্তু সরকারি গেজেটে আজও এটা প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

জানা যায়, একাদশ সংসদ নির্বাচনের কর্মপরিকল্পনার খসড়ায় নির্বাচনসংশ্লিষ্ট বিধি-বিধানগুলো সংস্কার প্রস্তাবে বলা ছিল, “নির্বাচনী ব্যবস্থার জন্য বিদ্যমান আইনি কাঠামোর কিছু অংশ ইংরেজি ও কিছু অংশ বাংলায় রয়েছে। পুরো আইনটি বাংলায় প্রণীত হলে ব্যবহারকারীদের কাছে তা সহজেই বোধগম্য হবে। একই সঙ্গে সর্বজনীন বাংলা ভাষা ব্যবহারে একটি নতুন মাইলফলক স্থাপিত হবে। বিদেশি শব্দ নির্বাচনপ্রক্রিয়ার ঘাড়ে চেপে বসে আছে। যেমন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ওয়ার্ড কাউন্সিলর, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের মেয়র ইত্যাদি। এগুলোকে অনাদিকাল পর্যন্ত বহন করার কোনো যুক্তি নেই বলে নির্বাচন কমিশন মনে করে। এসব শব্দ সরিয়ে যুৎসই শব্দ সংযোজন অপিরহার্য বলে বিবেচনা করা দরকার। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শব্দটি পল্লী পরিষদ প্রধান/অধিকর্তা/আধিকারিক শব্দগুলো দিয়ে প্রতিস্থাপিত হতে পারে। ওয়ার্ড কাউন্সিলর শব্দ দুটি ‘মহল্লাপ্রধান’-এ প্রতিস্থাপিত হতে পারে। মেয়র শব্দটি পাল্টে নগর অধিকারী করা যেতে পারে। ‘রিটার্নিং অফিসার’ প্রতিস্থাপিত হতে পারে ‘নির্বাচন পরিচালক’ নামে। একইভাবে প্রিজাইডিং অফিসারকে ‘কেন্দ্র পরিচালক’, পোলিং অফিসারকে ‘গোপন কক্ষ সংরক্ষক’, বুথকে ‘গোপন কক্ষ’, পোলিং এজেন্টকে ‘নির্বাচন সহায়ক’, ব্যালট বাক্সকে ‘ভোটবাক্স’, ব্যালট পেপারকে ‘ভোটপত্র’এসব নামে প্রতিস্থাপিত করা যেতে পারে।” তবে চূড়ান্ত কর্মপরিকল্পনায় এসব উদাহরণ বাদ দেওয়া হয়।