সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ভোট দিন

খোন্দকার মোজাম্মেল হক

৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশ আজ দু’ভাগে বিভক্ত। এক ভাগের লড়াই হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে সাথী করে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে। অন্য ভাগে আছে মিশ্র শক্তি। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে সন্ত্রাস লালনের, জঙ্গিবাদকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার এবং স্বাধীনতাবিরোধীদের জোটসঙ্গী করার। মূলত স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও লড়তে হচ্ছে একাত্তরের পরাজিত শক্তির বিরুদ্ধে। লড়তে হচ্ছে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে। লড়তে হচ্ছে ৭৫ সালে জাতির জনককে সপরিবারে হত্যাকারী অপশক্তি ও তাদের বেনিফিসিয়ারিদের বিরুদ্ধে।
দেশবাসী ভালো করেই জানের জামায়াত-বিএনপির যৌথ শাসনের কথা, তারেক রহমানের হাওয়া ভবনের কথা। জানেন শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইয়ের কথা। জাতি এখনও ভুলে যায়নি পার্কেম সৈকতে, সিনেমা হলে, মাঠে-ময়দান, উকিল বারে, আলতে বোমা হামলার কথা। ভুলে যায়নি ৬৪ জেলায় এক সাথে সিরিজ বোমা হামলার কথা। ভুলেনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ, মন্ত্রী ও এমপি কিবরিয়াকে গ্রেনেড হামলায় হত্যা করার কথা। ভুলোনি গাজীপুরে প্রকাশ্য, দিবালো ব্রাশফায়ার করে এমপি আহসান উল্যাহ মাস্টারকে হত্যার কথা। আন্তর্জাতিক বিশ্বও ভুলে যায়নি সিলেট শাহজালালের মাজার মসজিদে জুমার নামাজ সেরে বের হওয়ার সময় ব্রিটিশ হাইকশিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলার কথা। ভুলে যায়নি যখন ‘ইকনোমিস্ট’সহ বিশ্বমিডিয়ায় কভার স্টোরি হয়েছে ‘জঙ্গিবাদের কবলে বাংলাদেশ’ বা ‘ব্যর্থ অকার্যকর রাষ্ট্র বাংলাদেশ’ অথবা অ্যা কান্ট্রি অব টেররস’। তখনকার অর্থমন্ত্রী বিদেশ থেকে শূন্য হাতে ফিরে বলেছিলেন, ‘বিদেশিরা এক টাকাও সাহায্য দেয়নি। কারণ দেশে গুড, গভর্নেস বা সুশাসন নেই।’ পল্টন ময়দানে ভাষণ দিতে গিয়ে ক্ষমতাসীন দলের একজন মৌলবাদী এমপি বলেছিলেন, ‘আমরা হবো তালেবান/বাংলা হবে আফগান।’
যদি এই দলও তাদের জোট আবার ক্ষমতায় আসত তাহলে দেশটি আসলেই আফগান হয়ে যেত। ইসলামী স্টেট বা আইএস-এর নানামুখী কর্মকা-ই তখন ধারণ করেছিল শায়খ রহমান ও বাংলা ভাইয়েরা। রাজশাহী অঞ্চলে বাংলা ভাই আলাদা প্রশাসন চালু করেছিল, তাকে এসপি মাসুদ মিয়া প্রটোকল দিত। এমপি-মন্ত্রীরা তখন মুখে তালা দিয়ে রেখেছেন। কারণ প্রতিদিন মন্টু ডাক্তারের টয়লেটে দু-একজন আওয়ামী লীগ কর্মী বা নেতাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হতো। কুরআন পাঠ অবস্থায় মসজিদে ঢুকে এরা হত্যা করেছে একজন মুক্তিযুদ্ধের সমর্থককে। এই সময় জাতীয় সংসদে একজন মন্ত্রী (পরে যুদ্ধাপরাধের দায়ে যার ফাঁসি কার্যকর হয়েছে) বলেছিলেন, বাংলা ভাই নামে কেউ নেই। বাংলা ভাই মিডিয়ার সৃষ্টি।’
এমনি অরাজকতা, নৈরাজ্য আর জঙ্গিবাদের প্রতি একটি সরকারের নীরব সমর্থনই মূলত ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেন ডেকে এনেছিল। আর্শি সমর্থিত একটি অস্থায়ী সরকার না এলে সেদিন ক্ষমতাসীনদের রোখা যেত না। তারা বেপরোয়া হয়ে পড়েছিল।
সবাই যেটা জানের যে, রাষ্ট্রীয় ও সরকারের সরাসরি অংশগ্রহণে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভেনিউর প্রকাশ্য জনসবায় তৎকালীন জাতীয় সংসদের বিরোধী দলনেত্রীর জীবননাশের জন্য গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। জাতীয় পতাকাবাহী তার গাড়িতেও গুলিভর্ষণ করা হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭১ সালের পর এর এমন নারকীয় সন্ত্রাসী ঘটানোর জন্য সম্প্রীতি সাজা হয়েছে রাষ্ট্রের বিভিন্ন পদে কার্যরতরাসহ মন্ত্রী, সাংসদ এবং হাওয়া ভবনের কা-ারীর।
দেশটি তখন কি ছিল? আসমাকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য যেই উলফা গেরিলা গোপনে সন্ত্রাসী তৎপরতা চালাচ্ছে, তাদের প্রধান আবাসস্থল ছিল বাংলাদেশ। তৎকালীন সরকার তাদের আশ্রয় দেয়। সিলেট সীমান্তে মাটির নিচে তারা বিশাল অস্ত্রাগার গড়ে তোলে। এরপর পাকিস্তানি গোয়েন্দারা চীন থেকে জাহাজে ভয়াবহ মারণাস্ত্র আমদানি করে চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠায়। শিল্পমন্ত্রীর নির্দেশে মন্ত্রণালয়ের জেটিতে অস্ত্র খালাস হয়ে ১০ ট্রাকে ভর্তি হয়। বাংলাদেশের পুরো প্রশাসন ও গোয়েন্দারা এটা অবহিত ছিল। সাহসী পুলিশ কর্মকর্তাদের কারণে এই অস্ত্র ধরা পড়ে। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী ডন দাউদ ইব্রাহিম বাংলাদেশে অফিস খোলে। আবুদর রউফ নামক একজন সন্ত্রাসী ছিল এক সমন্বয়ক।
এই যখন দেশের অবস্থা তখন রাজশাহীর ‘এবনে গোলাম সামাদ’ নামক একজন লেখক লিখলেন, জাতীয় সঙ্গীত বদল করতে হবে। সরকারের আইন উপদেষ্টা ও এমপি (যার যুদ্ধাপরাধের কারণে ফাঁসি কার্যকর হয়েছে) বললেন, ‘হিন্দুর লেখা জাতীয় সঙ্গীত রাখা হবে না।’
চোখ বন্ধ করে বলা যায়, এই শক্তি যদি ২০০৬ সালের পর আরেকবার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতো, তাহলে বাংলাদেশ হয়ে যেত আফগানিস্তান। প্রতিদিন বোমায় প্রাণ ঝরত, যেমনি করছে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, ফিরিস্তিনে। দেশ হয়ে যেতো যুদ্ধের দেশ। তার বিপরীতে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজী হয়ে যে সরকার এলো, তাদের এক দশকের শাসনে বাংলাদেশ বেরিয়ে এসেছে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ থেকে। বাংলাদেশ উন্নয়ন-অগ্রগতি এবং সমৃদ্ধির মহাসোপানে অবস্থান করছে। খুব কম সময়ে এভাবে দেশটি উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। আজ বাংলাদেশ এশিয়ার অন্যতম সমৃদ্ধ দেশ। দেশের জিডিপি পতিবেশিদের আজ ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৩৫শ’ মেগাওয়াট থেকে সরকার ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। রামপাল, মহেষখালী, বাঁশখালীসহ বহু বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। রামপাল, মহেশখালী, বাঁশখালীসহ বহু উৎপাদন কেনেন্দ্রর কাজ সমাপ্তির দিকে। রূপপুর আনবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজও চলছে দ্রুতগতিতে।
১৯৭৪ সালে যখন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হ্যানরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে বলেছিলেন, ‘বটমলের বাঙ্কেট বা তলাহীন কুড়ি’ তখন বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদন ছিল ৯০ লাখ টন। সেই বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকারের সময় এখন খাদ্য উৎপাদন ৩ কেজি ৭০ লাখ মেট্রিক টন। ভাবতে অবাক লাগে বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল পদ্মা সেতু আজ নির্মাণ করছে আমাদরে সরকার। অথচ জিয়া-এরশাদ-খালেদার সময় বুড়িগঙ্গা-সুরমা-কুশিয়ারার সেতু বানানোর জন্য বিশ্বব্যাংক আর জাপান-চীনের পেছনে ঘুরতে হয়েছে দিনের পর দিন। সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারী ক্লিনটন ঢাকা সফর করে শেখ হাসিনার দেওয়া সভায় বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশকে থামানো যাবে না। আমি বাজি ধরে বলতে পারি, বাংলাদেশ এগিয়ে যাবেই।’ তার কথা আজ সত্যে পরিণত হয়েছে।
আগে গ্রামে-গঞ্জে হাঁক শোনা যেত, ‘মাগো দু’টো পান্তা ভাত দেন’। আজ সেই গ্রামে অনাহারী নেই, দরিদ্র মানুষ নেই। বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে প্রতিটি ঘরে। সেই হাঁক ডাক আজ শোনা যায় না। উত্তরবঙ্গের মঙ্গা বা দুর্ভিক্ষে প্রতি বছর শত শত মানুষ মারা যেত। আজ সেই মঙ্গা শব্দটিও নির্বাসিত হয়েছে।
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে জমি-নিয়ে স্থায়ী সমাধান হয়নি। ছিটমহল ছিল দুই দেশেই। এই সরকার যৌথ জরিপের মাধ্যমে সীমান্তের জমি বিরোধ এবং ছিটমহল সমস্যার স্থাী সমাধান করতে পেরেছে। ভারত আর মিয়ানমারের দখলে ছিল বাংলাদেশের সমুদ্রাঞ্চল। আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা লড়ে বাংলাদেশ দুই দেশ থেকে সমুদ্র অঞ্চল মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে।
অন্ধকার দিনের কথা বলি। ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে জামায়াত যখন সহিংস আন্দোলনে, তখন তাতে যুক্ত হলো বিএনপি। সে বছর শেষে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচন। সারা দেশে ভয়াবহ নৈরাজ্য, নাশকতা ও সহিংসতায় নির্বাচন করতে হয়েছে। আন্দোলনকারীরা নির্বাচন বর্জন করে। তাদের নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রিত্ব দেওয়ার প্রস্তাবও তারা প্রত্যাখ্যান করে। ফলে নির্বাচনটি সরকারি দলের একক নির্বাচনে পরিণত হয়।
এর এক বছর পর সেই ৫ জানুয়ারি বিএনপি-জামায়াত আবার নামে আন্দোলনে। শুরু হয় আগুন, পেট্রোল বোমায় মানুষ মারা, যানবাহন পোড়ানো। ৯২ দিনের একটানা এই নাশকতার ফলাফল হয় জিরো। জনগণ হতরাল-অবরোধ ভেঙে নেমে যায় রাজপথে ঘরে ঢুকে যায় বিএনপি-জামায়াত।
এই দুটি আন্দোলনের ঘানি এখনও টানছে তারা। এই সহিংস আন্দোলনের কারণে দেশের অর্থনীতি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জিডিপি ধাক্কা খায়।
এবারের নির্বাচনে বিএনপি আছে, আওয়ামী লীগ আছে। দুই দলই জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করছে? ভোটব্যাংক দুই ভাগেই বিভক্ত। কিন্তু নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের নিয়ামক শক্তি হচ্ছে ২০ ভাগ নিরপেক্ষ ভোটার। তারা যাদের ভোট দেয়, তারাই দেশ শাসন করে। এই শ্রেণীর সামনে এখন একটাই প্রশ্ন-নির্বাচনে তারা কি জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির পক্ষে থাকবে? না দেশ থেকে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িকতাকে চিরদিনের জন্য বিদায় করার পক্ষে থাকবে? যেহেতু এই শ্রেণী হচ্ছে নিরপেক্ষ এবং মুক্তমনা মানুষ। স্বভাবতই তারা অন্ধকারের গর্তে আবার দেশকে ঠেলে দেবে না, এটাই রাজনৈতিক প-িতদের ধারণা। দেখা যাক ৩০ ডিসেম্বর কি হয়?
পাদটীকা
ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী দশম জাতীয় সাহিত্য সম্মেলনে বললেন, ‘একজন নেতা স্বাধীনবাংলার পতাকা তুলেছেন। তিনি বললেন, আমিও সাবেক মুক্তিযোদ্ধা। তার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বলতে চাই মুক্তিযোদ্ধা কখনও সাবেক হয় না। রাজকারও সাবেক হয় না। যারা বলেন, সাবেক মুক্তিযোদ্ধা তারা এখন নব্য রাজাকার।’