সবার ওপরে পরিবেশ

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন নিয়ে দ্বিমত নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, এ উন্নয়ন কি পরিবেশসম্মত? আরও স্পষ্ট করে বলা চলে যে, উন্নয়নের ধারা কি পরিবেশের দৃষ্টিকোণ থেকে টেকসই? আমাদের উন্নয়ন হতে হবে প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে, পরিবেশের মান অক্ষুণ্ণ রেখে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। শনিবার সমকালের একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল- ‘ইটভাটায় পুড়ছে উর্বর মাটি’। বগুড়া, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ- উত্তরাঞ্চলের তিনটি জেলার সরেজমিন অনুসন্ধানের ভিত্তিতে প্রণীত এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপনে আইন অমান্য করে তিন ফসলি জমি ব্যবহার করা হচ্ছে। পোড়ানো হচ্ছে কাঠ।’ আমরা জানি, বাংলাদেশের মূল সম্পদ হচ্ছে জমি; কিন্তু এর পরিমাণ খুবই সীমিত। অবকাঠামো নির্মাণ, শিল্প কারখানা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল স্থাপন- সবকিছুতেই হাত পড়ে জমিতে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের জরিপ অনুযায়ী দেশে সাড়ে ছয় হাজারের বেশি ইটভাটা রয়েছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয়, এর ৯০ শতাংশই জ্বালানি ব্যবহার, ভাটা স্থাপন ও পরিবেশ সংক্রান্ত বিধান মানছে না। বাংলাদেশ সেন্টার ফর এডভান্স স্টাডিজের হিসাবে বছরে এক হাজার ৭০০ কোটিরও বেশি ইট তৈরি হয় এবং এ জন্য প্রয়োজন পড়ে পাঁচ হাজার আটশ’ কোটি টনেরও বেশি মাটি। আইন অনুযায়ী পুকুর, খাল, জলাভূমি, হ্রদ, নদী প্রভৃতি স্থানের মাটি ইট তৈরির জন্য ব্যবহার করতে হলে প্রশাসনের পূর্বানুমতি প্রয়োজন পড়ে। জ্বালানি হিসেবে কাঠের ব্যবহারও নিষিদ্ধ। সালফারসহ ক্ষতিকর রাসায়নিক বেশি মাত্রায় রয়েছে এমন কয়লাও পোড়ানো যাবে না। অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে পাকা ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামো সুবিধা নির্মাণে ইটের চাহিদা ক্রমবর্ধমান। কিন্তু পরিবেশের স্বার্থও সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেতে হবে। ইতিমধ্যে ‘গ্রিন ব্রিক’ বিধিমালা তৈরি হয়েছে। এ জন্য ইটভাটার আধুনিকায়নের জন্য সরকার শুল্ক্ককর ছাড়েরও ঘোষণা দিয়েছে। উৎপাদকরা মনে করেন, পরিবেশ সংক্রান্ত যাবতীয় নিয়মকানুন মেনে চললে ইটের উৎপাদন ব্যয় বেশি পড়বে। ফলে ভবন, সড়ক ও অন্যান্য স্থাপনার নির্মাণ ব্যয় বেড়ে যাবে। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে যে, পরিবেশের ক্ষতি হলে তা পূরণ করা সহজ নয়। শুধু তাই নয়, পরিবেশ ও প্রকৃতির নির্মম প্রতিশোধের কথাও আমাদের মনে রাখতে হবে। আমাদের অবশ্যই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ বাসভূমি রেখে যেতে হবে। জলবায়ু বিষয়ে এখন বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বাড়ছে। আমরা কোনোভাবেই এ বিষয়টি উপেক্ষা করতে পারি না। ইটভাটা স্থাপন কিংবা অন্য যে কোনোভাবে পরিবেশের ক্ষতিসাধন থেকে অবশ্যই আমাদের বিরত থাকতে হবে। এ জন্য উপযুক্ত আইনও দেশে রয়েছে, প্রয়োজন শুধু তার কঠোর প্রয়োগ।