সবার চোখে জাদুর কাঠি

হাসান ইমাম : এক বেলা না খেয়ে থাকার চেয়ে গোটা দিন উপোস থাকা কি বেশি কষ্টের? অনাহারী মানুষের অনুভূতি যেমনই হোক, যা-ই বলুক বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, অনাহার পরিমাপের বন্দোবস্ত এই সমাজব্যবস্থায় আছে। দারিদ্র্যরেখার এপার-ওপার বিবেচনায় একজনের গরিবির মাত্রা নির্ধারণ আসলে তার ক্ষুণ্নিবৃত্তির সক্ষমতার খতিয়ান। সেই খতিয়ান বলছে, এই করোনাকালে ৪৭ শতাংশ পরিবারের আয় দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে।
এসব পরিবারের সদস্যদের দৈনিক এক ডলার ৯০ সেন্টও আর আয়-রোজগার হয় না। এই পরিমাণ অর্থ কামাতে না পারলে পুঁজিবাদী বিশ্বের সংজ্ঞায় আপনি ‘গরিব’। এর বাইরে প্রতিটি দেশেরও একটি জাতীয় দারিদ্র্যরেখা বহাল। যেমন বাংলাদেশে দারিদ্র্য পরিস্থিতির পরিমাপ হয় মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যয়ের ভিত্তিতে। দৈনিক দুই হাজার ১২২ ক্যালরির খাবার কেনার সামর্থ্য না থাকলে আপনি সটান দারিদ্র্যরেখার নিচে নেমে যাবেন। আর যদি দৈনিক এক হাজার ৮০৫ ক্যালরির খাবারও কিনতে অসমর্থ হন, আপনি হতদরিদ্র। করোনাকাল এই হতদরিদ্রের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি ৯৬ শতাংশ পরিবারের আয়েও কোপ বসিয়েছে। প্রশ্ন হলোÑ এই কোপ ঠেকাতে সরকার কতটা ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে? ব্যবস্থায় কতটা ভরসা হয়েছে তাদের?
শতাধিক জনপ্রতিনিধির কোমরে দড়ি, গ্রেফতার বা বরখাস্তই বলে দেয় রীতিমতো মচ্ছবে রূপ নিয়েছে ত্রাণচুরি। এর-ওর খাটের নিচে, শোবার ঘরে, গুদামে মজুদ হয়েছে অনাহারী মানুষের খাদ্য; ঐকিক নিয়মে বেড়েছে অনাহারের মেয়াদ। লোভাতুরের পাতানো ফাঁদে ক্ষুধাতুরের মরণই যেন নিয়তি।
করোনার হানার সঙ্গে দেশীয় হানাদারদের এই যুগলবন্দীর অকালেও বার্ষিক মাথাপিছু গড় আয় ২ দশমিক ৮৮ শতাংশ বৃদ্ধির খবর কেমন ধন্দে ফেলে দেয় তাই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় এখন দুই হাজার ৬৪ ডলার। এর আগের অর্থবছরে বার্ষিক মাথাপিছু গড় আয় ছিল এক হাজার ৯০৯ ডলার।
একজন পি কে হালদার আড়াই হাজার কোটি টাকা লোপাট করেন কী অনায়াসে; নির্বিঘ্নে পেরিয়ে যান দেশের সীমানা। সাত বছরে আড়াই হাজার বিঘা জমির মালিক হন ফরিদপুরের দুই ভাই সাজ্জাদ হোসেন ওরফে বরকত ও ইমতিয়াজ হাসান ওরফে রুবেল। আরেক সহোদর জুটি এনামুল হক এনু ও রুপন ভূঁইয়ার কব্জায় ১০ বছরে আসে ১২০টি বাড়ি-ফ্ল্যাট। টাকা-পয়সা, সোনাদানা রাখেন তারা বস্তায় ভরে; কেজির মাপে। ক্যাসিনো সম্রাটের সাম্রাজ্যে অর্থকড়ি যেন হাতের ময়লা। দুই-তিন মাসে কয়েক কোটি টাকা হোটেল বিল গোনা পাপিয়ার কাছে কোনো ব্যাপারই না। স্বাস্থ্য খাতকে একাই রীতিমতো ফোঁপরা করে ছাড়েন মোতাজজেরুল ওরফে মিঠু। রিজেন্ট হাসপাতালের কর্ণধার সাহেদ কত কামিয়েছেন, তা ক্রমে প্রকাশ্য। জাদুর কাঠি হাতে আর কত শত এমন ‘জাদুকর’ আছেন এ দেশে? শূন্য হাত রাতারাতি ভরে ওঠে সোনাদানা-জহরতে।
তিন বেলা তিন মুঠো খেতে না পারা মানুষ, রুটি-রুজির অনিশ্চয়তায় দিশেহারা মানুষও সারাটা জীবন অপেক্ষায় থাকেন এক জাদুকরের। উপার্জন হারিয়ে, চাকরি খুইয়ে বহুদিনের ঠাঁই ছেড়ে গ্রামে ফিরে যাওয়া হাজার হাজার মানুষের মন ঘিরে থাকে এক জাদুকর। জাদুকর ঠিকই আসবেন, এই বিশ্বাস প্রবাস থেকে খালি হাতে ফেরা কয়েক লাখ শ্রমিকের। দেশের সেরা রপ্তানি আয়ের খাত থেকে ঝরে পড়া সোয়া ুতন লাখ পোশাকশ্রমিকও জাদুকরের স্বপ্ন দেখেন। বছরের পর বছর ন্যায্য দাম না পেয়ে ফতুর হতে বসা কৃষকের চোখেও বাসা বেঁধে থাকে জাদুকরের স্বপ্ন।
যে জাদুকরের আগমনে প্রতিটি উনুন জ্বলবে প্রতিদিন, পেটে আগুন নিয়ে ঘুমাতে যাবেন না একজনও আর, ঠাঁইহীন মানুষের মাথার ওপর তৈরি হবে আচ্ছাদন, শ্রমের ন্যায্যমূল্য পাবেন শ্রমিক, কৃষকের মুখে হাসি ফুটবে, ভোজবাজির মতো হারিয়ে যাওয়া আপনজনকে ফিরে পাবে স্বজন, বঞ্চনার অবসান হবে, বিচার পাবেন ভুক্তভোগী গণমানুষের সম্মিলিত চাওয়া কি সেই ‘জাদুদণ্ডে’ রূপান্তরিত হবে না কোনো দিন, যার ছোঁয়ায় দেশের কাঁধে জেঁকে বসা এই জাদুকরি রাজনৈতিক সংস্কৃতি অপসারিত হবে। যে রাজনীতি পাপুল-পাপিয়াদের মতো ‘জাদুকর’ তৈরির কারখানা তা দূর হবে। এত এত মানুষের আকাক্সক্ষার জিয়নকাঠি হাতে সেই জাদুকর কবে আসবেন, যার কাঠির নড়াচড়ায় বদলে যাবে রাজনীতির খোলনলচে। কে না জানে, রাজনীতি বদলে গেলে নতুন করে আঁকা হবে দেশের ভাগ্যরেখা। এই ভাগ্যরেখার অপর নাম জনগণের জীবনরেখা।
লেখক : সাংবাদিক