সব জোটেই জটিলতা

ফারুক হোসাইন : পুরো দেশ এখন নির্বাচনী জ্বরে আক্রান্ত। নির্বাচনের প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী- আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ছায়াতলে গঠিত হয়েছে মহাজোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। রাজনীতির দুই জায়ান্ট নিজ দলের প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করেছে। মনোনয়নপত্র দাখিলও করছে। দলীয় প্রার্থী ঘোষণার পর শরিক দলগুলোর মধ্যে শুরু করেছে ‘আসন বিতরণ’। এখনো শরিক দলগুলোর সঙ্গে আসন ভাগাভাগি চূড়াšন্ত হয়নি। দুই রাজনৈতিক শক্তিই শরিক দলগুলোকে ৭০টি করে আসন দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু মহাজোট-ঐক্যফ্রন্টের শরিক জোট-ফ্রন্ট, উপজোট-সহজোট, সহযোগী জোট-পাতি জোট মিলে বিপুল সংখ্যক প্রার্থীর তালিকা দিয়েছে। দল এবং জোটের প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা যাচাই, প্রার্থী বাছাই-চূড়ান্তকরণে সৃষ্টি হয়েছে মহাজট। জোট-ফ্রন্টের প্রার্থীজট খুলতে কতদিন লাগে কে জানে?
মহাজোট : একাদশ জাতীয় নির্বাচনের মনোনয়নপত্র দাখিলের পরও এখন পর্যন্ত আসন ভাগাভাগি নিয়ে ১৪ দলীয় জোট ও মহজোটের শরিক দলগুলোর সঙ্গে জট ভাঙেনি আওয়ামী লীগের। জোটের মনোনয়ন নিয়ে জাতীয় পার্টি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, তরিকত ফেডারেশন ও জাকের পার্টির সঙ্গে কিছু আসনের সমাধান হলেও জটিলতা রয়ে গেছে অনেক আসনে। এসব আসনের সমাধান করতে মহাজোটে দর কষাকষি চলবে মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন, ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
জানা যায়, জোটের আসন ভাগাভাগি নিয়ে জটিলতা সমাধানের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করে আসছে আওয়ামী লীগের শরিক দলগুলো। কিন্তু নির্বাচনের আগে মহাজোটে দলের সংখ্যা বৃদ্ধি, জাতীয় পার্টি শরিক হিসেবে, না বিরোধী দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেবে- সেই সমীকরণের কারণে ১৪ দলের শরিকদের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি নিয়ে কোনো আলোচনা করেনি আওয়ামী লীগ।
তবে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, শরিকদের জন্য ৬৫ থেকে ৭০টি আসনের বেশি ছাড়া হবে না। তবে শেষ সময়ে চাহিদা মতো আসন না পাওয়ায় বেঁকে বসেছে জাতীয় পার্টি, আর অসন্তোষ বিরাজ করছে ১৪ দলের শরিকদের মধ্যে। এ ছাড়া মহাজোটের হয়ে নির্বাচন করতে চায় এমন দলগুলোও ঝামেলায় রয়েছে।
এ বিষয়ে ১৪ দলের শরিকদের দায়িত্বশীল পর্যায়ের নেতারা জানান, আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষদিন পর্যন্ত আসন ভাগাভাগি নিয়ে কথা হবে। প্রয়োজনে দলের অনেক প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেবে।’ সে জন্য তাদের প্রার্থীরা মনোনয়ন জমা দিয়ে রাখছেন। এ ছাড়া শরিক নেতারা আরো জানান, তাদের পক্ষ থেকে প্রয়োজনে কিছু আসন উন্মুক্ত করে দেয়ার জন্য বলবেন তারা।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট : মনোনয়ন জমা দেয়া হলেও ৩০০ আসনে এখনো একক প্রার্থী ঘোষণা করেনি রাজপথের প্রধান বিরোধী দল ও নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও তার জোট সঙ্গীরা। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বাইরেই কেবল ২০ দলীয় জোটেরই ৮০০ প্রার্থীকে প্রত্যয়ন করা হয়েছে বিএনপির পক্ষ থেকে। প্রতিটি আসনেই একাধিক প্রার্থীর হাতে দলীয় প্রত্যয়নপত্র তুলে দেয়া হয়েছে। স্পষ্ট করা হয়নি জোট সঙ্গীদের আসন সংখ্যাও। ফলে প্রার্থিতা নিয়ে বিএনপি ও জোটের শরিকদের মধ্যে এখনো একটি ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। সৃষ্টি হয়েছে প্রার্থিতা নিয়ে জটলা। শীর্ষ কয়েকজন নেতার আসনে এককভাবে প্রার্থী দেয়া হলেও বেশির ভাগ আসনেই দুই থেকে তিন-চারজন পর্যন্ত প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। প্রত্যয়নপত্র হাতে পেলেও এখনো কেউ বলতে পারছেন না ধানের শীষের প্রার্থী হবেন কারা।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একাধিক প্রার্থী দেয়ার বিষয়টিকে কৌশল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে আমরা প্রত্যেকটি আসনে দুইজন করে প্রার্থীকে প্রাথমিক মনোনয়ন দিচ্ছি। কোনো কারণে একজনের না হলে পরের জন যাতে সুযোগ পান।
এবারের নির্বাচনে ২০ দল ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এই দু’টি জোটকে সাথে নিয়ে অংশ নিচ্ছে বিএনপি। নির্বাচনে ইতোমধ্যেই ৩০০ আসনে ৮০০ প্রার্থীকে দলীয় মনোনয়ন দিয়েছে দলটি। বাছাই-প্রক্রিয়ার পরই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিকদের সঙ্গে আসন বণ্টনের ফায়সালা করা হবে।
দলটি সূত্রে জানা যায়, ২০ দল ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে ৬০টির মতো আসন দিয়ে সন্তুষ্ট রাখতে চায় তারা। তবে এরপরও কেউ অসন্তুষ্ট হলে আরো পাঁচটির মতো আসন বাড়িয়ে দেয়া হবে। যদিও প্রতিটি দলই আলাদা করে তাদের আসন চেয়ে বিএনপিকে চিঠি দিয়েছিল। কিন্তু এখনো পর্যন্ত ২০ দলের বাইরে ফ্রন্টের বিষয়টি চূড়ান্ত করতে পারেনি। ঐক্যফ্রন্ট সূত্রে জানা যায়, নির্বাচনে নাগরিক ঐক্য ৪০টি, গণফোরাম ৩০টি, জেএসডি ৩০টি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ পাঁচটি আসন চায়।
বিএনপি সূত্রে জানা যায়, ৩০০ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেতে দুই হাজার ৫৮৬ জন প্রার্থী সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। অল্পসংখ্যক আসনে এত বিপুল সংখ্যক প্রার্থী থাকায় সকলকেই ঐক্যবদ্ধ থেকে দল মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সকলকেই বলা হয়েছে মাঠে শেষ পর্যন্ত অবস্থান করতে হবে, ভোটকেন্দ্র পাহারা দিতে হবে, ধানের শীষের পক্ষে অবস্থান নিতে হবে, বিদ্রোহী হলে কঠোর ব্যবস্থা এবং নির্দেশনা মেনে মনোনয়ন প্রত্যাহারের জন্য কঠোর বার্তা দেয়া হয়েছে। একই সাথে দলীয় নেতাকর্মীদের মতামত ও বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের জরিপের ভিত্তিতে দলের চেয়ারপারসনের পাশাপাশি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সম্ভাব্য প্রার্থীদের কয়েকটি তালিকা করেন। জরিপগুলো করা হয়েছিল সম্ভাব্য প্রার্থীর সাংগঠনিক সক্রিয়তা, তৃণমূল নেতাকর্মী ও সমর্থকদের সঙ্গে সম্পর্ক, সাধারণ ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার ওপর ভিত্তি করে। সেটির ওপরই ভিত্তি করে প্রার্থীদের প্রত্যয়নপত্র দেয়া হয়েছে বলে বিএনপির একাধিক নেতা জানান।
এ ছাড়া দলীয় সরকারের অধীনে প্রথমবারের মতো নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়ায় সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে বিশ্বাস করতে পারছে না বিএনপি। সব আসনে একক প্রার্থী ঘোষণা করলে সরকার নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করে যে কোনো অজুহাতে প্রার্থিতা বাতিল করতে পারে বলেও মনে করছেন দলটির সিনিয়র নেতারা। এ জন্য প্রাথমিকভাবে প্রতিটি আসনে একাধিক প্রার্থীকে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। এতে কোনো কারণে একজনকে বাদ দিলেও আরেকজন সুযোগ পাবে। এ ছাড়া নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, প্রাথমিক মনোনয়নের ক্ষেত্রে এক আসনে একাধিক প্রার্থীকে প্রত্যয়ন দেয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রতীক বরাদ্দের আগে দলের পক্ষ থেকে মনোনয়নের চূড়ান্ত তালিকা নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে হয়। সেখানে যাদের নাম থাকবে, কেবল তারাই শেষ পর্যন্ত ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হবেন, বাকিদের মনোনয়নপত্র বাদ যাবে। তফসিল অনুযায়ী, আগামী ৯ ডিসেম্বর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। ওই দিনের মধ্যেই একক প্রার্থী চূড়ান্ত করার সময় পাচ্ছে দলটি।