সভাপতির স্ত্রীর নামে ৪২ হাজার ডলার ট্রান্সফার : পরে ফেরত

চিটাগাং এসোসিয়েশন অব নর্থ আমেরিকায় হচ্ছেটা কী?

ঠিকানা রিপোর্ট : প্রবাসের অন্যতম আঞ্চলিক সংগঠন চিটাগাং এসোসিয়েশন অব নর্থ আমেরিকা ইনক। বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকা ব্রুকলিনের চার্চ ম্যাকডোনান্ডে এই সংগঠনের নিজস্ব ভবন। ২০১৭ সালের ২ এপ্রিল নির্বাচনের মাধ্যমে আব্দুল হাই জিয়া এবং সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সেলিমের প্যানেল জয়লাভ করে। নির্বাচনে পরাজিত হয় জাহাঙ্গীর-বিল্লা পরিষদ। নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ এনে তারা মামলা দায়ের করেন। সেই মামলায় জিয়া- সেলিমের কমিটি জয়লাভ করে। নির্বাচনের পর ঠিকঠাক মতই চলছিলো সংগঠন। ট্রাস্টি বোর্ড এবং মিলাদুন্নবীকে কেন্দ্র করে ২১ সদস্যের কার্যকরি কমিটির ১১ জন সদস্য পদত্যাগ করেন। সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সেলিমসহ কার্যকরি কমিটির সদস্যরা ২০১৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পদত্যাগ করেন। সংগঠনে অনুষ্ঠানিভাবে গন্ডগোল শুরু হয়। সেই পদত্যাগী ১১ সদস্য শহরভিত্তিক চট্টগ্রাম সিটি এসোসিয়েশন নামে আরেকটি সংগঠন গঠন করেন। দুটি সংগঠনই চলছিলো, কিন্তু চিটাগাং এসোসিয়েশন অব নর্থ আমেরিকায় ভুতুড়ে কান্ড ঘটতে থাকে।
চিটাগাং এসোসিয়েশন অব নর্থ আমেরিকার ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য মোহাম্মদ হানিফ ঠিকানাকে বলেন, আমি আকবরের কমিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান। সেই হিসাবেই আমি দায়িত্ব পালন করছি। মামলায় জয়লাভ করার পর সভাপতি আব্দুল হাই জিয়া এবং তার আংশিক কমিটি আরেকটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করেন। প্রতিপক্ষকে ঠেকাতে আমাকে আবারো ট্রাস্টি বোর্ডে রাখা হয়। যদিও তারা ট্রাস্টি বোর্ডকে শপথ গ্রহণ করাতে পারেননি। যে কারণে আগের ট্রাস্টি বোর্ডই বহাল রয়েছে। সে হিসাবে আমিও দায়িত্ব পালন করছি। ১১ জন পদত্যাগ করার পর ব্যাংক একাউন্টে পদত্যাগকারী সাধারণ সম্পাদকের পরিবর্তে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আশরাফ আলী লিটন এবং ভারপ্রাপ্ত কোষাধ্যক্ষ মতিউর রহমান চৌধুরীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অন্যদিকে পদত্যাগী কর্মকর্তাদের নাম বাদ দেয়া হয়।
তিনি আরো বলেন, আমিই চিটাগাং এসোসিয়েশনের ভবনের ভাড়ার অর্থ আদায় করি। দীর্ঘদিন থেকেই আমি এই অর্থ তুলি এবং কমিটির লোকজনকে দিয়ে দিই। এ ছাড়া ভাড়াটিয়াদের বিভিন্ন সমস্যাও আমি দেখি। আমার পরিচিত একজনকে দিয়েই সুপারের কাজ করাই। আমি যেহেতু দায়িত্ব পালন করি, সেহেতু ভবনের চাবি এবং মেইল বক্সের চাবির একটি কপি আমার কাছে আছে। মেইল বক্স খুলে দেখি সংগঠনের একটি ব্যাংক স্টেটমেন্ট। ২০১৯ সালের সেই স্টেটমেন্টে দেখা যায়, সংগঠনের বর্তমান সেনটেন্ডার ব্যাংক একাউন্ট থেকে সাঈদা হাই’র নামে ৪২ হাজার ৪৭৩.০৮ ডলার ট্রান্সফার করা হয়। বিষয়টি আমার দৃষ্টিগোচর হলে আমি বিষয়টি প্রথমে শামসুল আলম চৌধুরীকে জানাই। ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আশরাফ আলী লিটনকে কল করে বিষয়টি জানতে চাইলে জানান, তিনি বিষয়টি জানেন না। তারপর আমি কমিটির সবাইকে জানাই। ঐ সময় আমি কোন ডকুমেন্ট রাখিনি। যে কারণে কাউকে ডকুমেন্ট দেখাতে পারিনি। বিষয়টি জানাজানি এবং আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে সভাপতি আব্দুল হাই জিয়া তার স্ত্রীর নামে যে অর্থ নিয়েছিলেন তা গত ২৭ জুলাই তার স্ত্রী সাঈদা হাই’র একটি একাউন্ট থেকে ৪২ হাজার ৪৭৩.০৮ ডলার আবার সংগঠনের ব্যাংক একাউন্টে ফেরত দেন। সেই স্টেটমেন্টের কপি আমার কাছে রয়েছে। ঐ সময় প্রথমে আব্দুল হাই জিয়া বিষয়টি অস্বীকার করেছিলেন। কিন্তু অর্থ ফেরত দিয়ে তিনি তা আবার নিজেই তা প্রমাণ করলেন।
তিনি আরো অভিযোগ করেন, আব্দুল হাই জিয়া এবং তার কমিটি ২০১৮ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২০ সালের ১ এপ্রিল পর্যন্ত কোন প্রপার্টি ট্যাক্স এবং পানির বিল দেয়নি। জরিমানাসহ প্রপার্টি ট্যাক্সের পরিমাণ ছিলো ২৩ হাজার ৬৫০.৮১ ডলার (এজ অব ০৫/১৪/২০) এবং পানির বিল জরিমানাসহ ৯ হাজার ১৩০.৩৫ ডলার (এজ অব ০২/২৬/ ২০)। সব মিলিয়ে জরিমানাসহ বকেয়া ছিলো ৩২ হাজার ৭৮১.১৬ ডলার। যে কারণে নিউইয়র্ক ডিপার্টমেন্ট অব ফাইন্যান্স থেকে গত ১৩ মার্চ ২০২০ একটি নোটিশ দেয়া হয়। ১৪ মে ২০২০’র মধ্যে অর্থ না দিলে সম্পত্তি নিলে চলে যাবে। আমি এ সব জানতে পারি এই কারণে যে সম্পত্তিটি আমার নামে রেজিস্ট্রেশন করা। যদিও ভবন চিটাগাং এসোসিয়েশনের নামে।
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি যতদূর জানি প্রপার্টি ট্যাক্স এবং পানির বিল পরিশোধ করা হয়েছে। তিনি বলেন, সংগঠনের ব্যাংক একাউন্টে অর্থ রয়েছে তাহলে চট্টগ্রামবাসীকে কেন জরিমানা (লেট ফি) দিতে হলো? ভাবন কেন লিনের নোটিশ পেল?
করোনাকালে আমি সভাপতিকে বলেছিলাম, যারা মারা যাচ্ছে তাদের অর্থ সাহায্য দেয়ার জন্য। তিনি তার পছন্দের জানাশোনা লোকদের বেশি অর্থ দিয়েছেন, কিন্তু অন্যদের ঠিক মত অর্থ দেননি। বলেছেন, সংগঠনের একাউন্টে অর্থ নেই। আবার খাবার বিতরণ নিয়েও বিভিন্ন পত্রিকায় ভুল তথ্য দিয়েছেন। তার কমিটি ১০০ জনের কাছে ত্রাণ বিতরণ করেছে। এখন বলে বলছেন ৩ শত জনের বেশি মানুষকে সাহায্য দিয়েছেন।
অন্যদিকে পদত্যাগী সদস্যরা ব্যাংকে চিঠি দিয়ে আগের ব্যাংকে রাখা ৪৮ হাজার ডলার আটকে রেখেছিলেন। সেই অর্থও ভুল রেজুলেশন ব্যাংকে দাখিল করে উঠিয়ে নিয়ে গেছে। আমরা জানি না এই অর্থ এখন কোথায়?
তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন, আমি এই সব অনিয়মের কথা বলছি বলেই চতুরতার সাথে কমিটির সবাইকে না বলে একটি মিটিং করে আমাদের ট্রাস্টি বোর্ড এবং উপদেষ্টা পরিষদ বাতিল বলে প্রচার করা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং ট্রাস্টি বোর্ডের (সাবেক) সদস্য হাসান চৌধুরী বলেন, জ্যামাইকায় সবাইকে নিয়ে একটি সমঝোতা বৈঠক করা হয়। সেই বৈঠকে সমস্যা সমাধানের জন্য একটি কমিটি করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। দায়িত্ব দেয়া হয় মেহবুবুর রহমানকে। অভিযোগ রয়েছে, তিনিই শিয়ালের কাছে মুরগি বর্গা দেয়ার মত কাজ করেছেন।
পদত্যাগী সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সেলিম বলেন, আমরা ট্রাস্টি বোর্ড এবং মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে আমরা ২১ সদস্যের কার্যকরি কমিটির ১১ জন পদত্যাগ করি। জিয়ার কমিটির সাথে ছিলেন ১০ জন। এর মধ্যে একজনকে আগেই বহিষ্কার করা হয়। ১ জন বাংলাদেশে চলে যান এবং ২ জন বাফেলোতে। সুতরাং তার সাথে রয়েছে মোট ৬ জন। আমরা পদত্যাগ করার সময় আমাদের ব্যাংক একাউন্ট ছিলো ব্রুকলিনের স্টালিং শাখায়। ঐ একাউন্টে তখন প্রায় ৪৮ হাজার ডলারের মত ছিলো। আমরা ব্যাংক ম্যানেজারকে চিঠি দিয়ে ঐ অর্থ আটকে রাখি। কিছু দিন আগে জ্যামাইকার একটি পার্কে আমাদের মধ্যে সমঝোতা বৈঠক হয়। সেই সমঝোতা বৈঠকে সমস্যা সমাধানে একটি কমিটি করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। দায়িত্ব দেয়া হয় সাবেক সাধারণ সম্পাদক মেহবুবুর রহমান বাদলকে। তিনি ঐ সভায় উপস্থিত সবার স্বাক্ষর নেন এবং আব্দুল হাই জিয়াদের সাথে আঁতাত করে ব্যাংকে একটি রেজুলেশন দিয়ে ৪৮ হাজার ডলার নিয়ে যায়। পরে আমরা জানতে পেরে ব্যাংক ম্যানাজারের কাছ যাই। তিনি বলেন, তারা একটি রেজুলেশন দেখিয়ে ঐ অর্থ নিয়ে যায়।
ঠিকানার এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঐ অর্থ যতদূর জানি সংগঠনের নতুন একাউন্টে রয়েছে। আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি ব্যাংক ম্যানেজারকে চিঠির মাধ্যমে জানাই। তিনি আরো বলেন, এই কমিটির মেয়াদ ২০১৯ সালেই শেষ হয় কিন্তু আব্দুল হাই জিয়ারা নির্বাচন না দিয়ে জোর করে এখন ক্ষমতায় রয়েছেন।
সংগঠনের সহ-সভাপতি মাসুদ হোসেন সিরাজী বলেন, ২৩ আগস্ট চট্টগ্রাম সমিতিতে যে সভা হয়েছিলো ঐ সভা সম্পর্কে (৭জনের) কার্যকরি কমিটির ৪ জনেই জানানো হয়নি। আমরা শুনেছি জনাব জিয়া তার শুভাকাঙ্খিদের নিয়ে ঐ সভা ডেকেছেন। ঐ সভা কোনো কার্যকরী কমিটি, এনলারজ বডি অথবা সাধারণ সভা ছিলো না। সুতরাং এই রকম ‘শুভাকাঙ্খি সভায়’ ট্রাস্টি বোর্ড সম্পর্কিত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এটা মিথ্যা, বানোয়াট, চট্টগ্রামবাসীকে বিভ্রান্ত করছেন সভাপতি জিয়া।
ইতিমধ্যে জনাব জিয়া একক ক্ষমতা বলে সবকিছু করতে পারে বলেও বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন।আমরা বলতে চাই চট্টগ্রাম সমিতিতে একক ক্ষমতা বলে কোনো ক্ষমতা নেই। প্রবাসী চট্টগ্রামবাসীদের প্রতি অনুরোধ, আপনারা বিচ্ছিন্ন না হয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকুন, যাতে আমরা আগামীতে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন করতে পারি। সভাপতি আব্দুল হাই জিয়ার অনিময়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার সিনয়র সহ সভাপতি খোকন কে চৌধুরী, সহ সভাপতি পরিমল কান্তি নাথ, সদস্য শফি শিকদার। এখন সভাপতি জিয়ার সাথে রয়েছেন ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আশরাফ আলী লিটন ও ভারপ্রাপ্ত কোষাধ্যক্ষ মতিউর রহমান চৌধুরী।
মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, সভাপতির স্ত্রীর নামে অর্থ ট্রান্সফার এবং ফেরত দেয়ার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। তবে প্রপার্টি ট্যাক্স ও বকেয়া পানির বিল সম্পর্কে বলেন, আগের কমিটি আমাদের কোন হিসাব দেয়নি। যে কারণে বিলগুলো দিতে আমাদের সময় লেগেছে। তিনি বলেন, আমরা সকল বিল এবং ট্যাক্স দিয়েদিয়েছি।
এ সব অভিযোগ সম্পর্কে আব্দুল হাই জিয়া বলেন, আমার এবং আমার কমিটির বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ করা হয়েছে সেগুলো মিথ্যা এবং বানোয়াট। তিনি বলেন, আমি আমার স্ত্রীর একাউন্টে সংগঠনের কোন টান্সফার করিনি এবং অর্থ ফেরতও আনিনি। যারা অভিযোগ করছেন, তারা সংগঠনের ভাবমূর্তি এবং আমার ভাবমূর্তি নষ্টের জন্য করছেন।
তিনি বলেন, আমি চ্যালেঞ্জ করে এ সব বলতে পারি। তিনি বলেন, আমি যাচ্ছিলাম একটি সুন্দর নির্বাচন করতে কিন্তু ট্রাস্টি বোর্ড এবং উপদেষ্টা পরিষদে এ ব্যাপাওে নাক গলাচ্ছে। মূলত তাদের কারণেই নির্বাচন দেয়া যাচ্ছে না। যে কারণে সভা করে ট্রাস্টি বোর্ড এবং উপদেষ্টা পরিষদ বাতিল করেছি। এখন আমিই সব ক্ষমতার অধিকারি। আমি সংগঠনের তালা পরিবর্তন করেছি, মেইলিং বক্সের তালা পরিবর্তন করেছি। আমি নির্বাচন দেয়ার জন্য নির্বাচন কমিশন গঠন করতে যাচ্ছি।
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার ব্যবসা বাণিজ্য রয়েছে, আমার অনেকগুলো বাড়ি রয়েছে। যেগুলো থেকে মাসে আমার আয় প্রায় ৫০ হাজার ডলারের উপরে। আমার এত অর্থ থাকতে আমি কেন আমার স্ত্রীর নামে সংগঠনের অর্থ নেব? বাতিলকৃত ট্রাস্টি বোর্ডের মোহাম্মদ হানিফই এসব অভিযোগ করছেন। আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করে লাভ নেই। যারা অভিযোগগুলো করছেন তাদের অতীত ইতিহাস সবাই জানেন।
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রপার্টি ট্যাক্স এবং সব বিল পরিশোধ করা হয়েছে। কোন বিল এখন বকেয়া নেই। আমাদের একাউন্টে এখনো হানড্রেড থাইজেন্টের উপরে আছে। করোনার সময় আমরা ৮/৯ জনকে অর্থ দিয়েছি। কবর নিয়েছেন অনেকে। কিন্তু তারা অর্থ নেননি। ঐ সময় আমরা মিটিং করেছিলাম। সেই মিটিং এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রেগুলার মেম্বারকে এক হাজার এবং লাইফ মেম্বারকে ৪ হাজার ডলার দেয়ার। সেই অনুযায়ীই অর্থ দিয়েছি। তা ছাড়া চট্টগ্রামবাসীকে পেন্ডামিকের সময় খাদ্যও দিয়েছি।