সমকালীন: আকায়েদ উল্ল্যাহর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

শিতাংশু গুহ

বাংলাদেশী ২৮ বছর বয়স্ক যুবক আকায়েদ উল্ল্যাহ সন্ত্রাসের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের একটি আদালত মঙ্গলবার ৬ নভেম্বর ২০১৮ এই রায় দেয়। তার যাবজ্জীবন কারাদন্ড হতে পারে। ২০১৭ সালের ১১ ডিসেম্বর নিউইয়র্কের ব্যস্ততাম টাইম স্কয়ার সাবওয়ে স্টেশন থেকে ম্যানহাটনের পোর্ট অথরিটি বাস টার্মিনালে যাওয়ার ভূগর্ভস্থ সড়কে নিজের শরীরে বাঁধা ‘পাইপ বোমা’ বিস্ফোরণ ঘটান আকায়েদুল্ল্যাহ। বোমা ঠিকমতো বিস্ফোরিত হয়নি, তাই কেউ মরেনি। আকায়েদ নিজে এবং তিনজন পুলিশ আহত হন। এনবিসি নিউজ বলেছে, আকায়েদ উল্ল্যাহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মুসলিম হত্যার প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলো।
বুধবার (৭ই নভেম্বর) সকালে অফিসে যাওয়ার সময় রেডিও-তে (জনপ্রিয় ১০১০ রেডিও) শুনি ‘বাংলাদেশী’ যুবক নিউইয়র্কে সন্ত্রাসের দায়ে দ-িত। বলা হয়, তাকে ৩০ বছর বা আরো দীর্ঘ সময় জেলে থাকতে হতে পারে। রেডিও-তে যখন শুনছিলাম, তখন একজন বাংলাদেশী হিসাবে লজ্জা পাচ্ছিলাম। ভাগ্য ভালো, গাড়িতে একাই ছিলাম? আকায়েদ যখন জেল থেকে বেরুবে তখন তার বয়স হবে ৫৮ বা তারও বেশি, অর্থাৎ জীবন শেষ। অথচ ঢাকায় তার স্ত্রী ও ছোট্ট কন্যা সন্তান আছে। অন্যকে মারতে যাবার সময় তার স্ত্রীকন্যার কথা মনে হয়নি? আকায়েদ কেন এ কাজ করতে গেলো? নিরপরাধ মানুষ মেরে কি অর্জন হবে? আইসিস, আল-কায়দা, বোকা হারাম এদের কি অর্জন আছে?
আকায়েদই কি শেষ বাংলাদেশী যিনি এই জঘণ্য কাজ করতে চেয়েছেন? শেষ কিনা জানিনা, তবে আকায়েদ প্রথম নয়; হয়তো শেষও নয়? অধুনা বেশ কিছু বাংলাদেশী বহির্বিশ্বে সন্ত্রাসী কার্যকলাপে জড়িত থেকে বিভিন্ন দেশে ধরা পড়েছেন, বা শাস্তি ভোগ করছেন। গত বছর (১১ই ডিসেম্বর ২০১৭) ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত বৃটবার্ট ম্যাগাজিনে জন বাইন্ডার লিখেছেনঃ এক দশকের কিছুটা বেশি সময়ের মধ্যে আকায়েদ উল্ল্যাহ হচ্ছেন চতুর্থ বাংলাদেশী যারা ইমিগ্র্যান্ট হিসাবে এসে আমেরিকার ক্ষতি করতে চেয়েছেন। পত্রিকাটি বলেছে, আকায়েদ উল্ল্যাহ ২০১১ সালে পিতামাতা ও ৩/৪ ভাইবোন নিয়ে গ্রীনকার্ডসহ আমেরিকা আসেন।
২০১৫ সালে ২৪ বছর বয়স্ক বাংলাদেশী রাহাতুল আশিকিম খান সন্ত্রাসী সংগঠন আল-সাবাহ-কে সহযোগিতার দায়ে ১০ বছরের কারাদন্ডে দন্ডিত হন। ২০১১-১২ সালে রাহাতুল আল-সাবাহকে সাহায্যের জন্যে এফবিআই’র পাতা ফাঁদে ধরা দেন। এছাড়া তিনি টেক্সাসে তালিবান নেতা মোল্লা ওমরের প্রতি সহানুভূতিশীল একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দেন। ২০১৩-তে ২১ বছর বয়স্ক বাংলাদেশী কাজী মোহাম্মদ রেজাউনুল আহসান নাফিস নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক উড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনার দায়ে দন্ডিত হন। এফ-১ ভিসায় আমেরিকা এসে নাফিস ২০১২-তে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন। নাফিস নিউইয়র্কে একটি সন্ত্রাসী সেল গঠন করে ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড ঘটাতে চেয়েছিলো, কিন্তু ধরা পরে যান।
২০০৬ সালে ৪৯ বছর বয়স্ক বাংলাদেশী মোহাম্মদ এম হোসেইন সন্ত্রাসীদের কাছে অস্ত্র বিক্রির ষড়যন্ত্র করে ধরা পড়েন, তার ১৫ বছরের কারাদন্ড হয়। হোসেইন আলবানিতে একটি মসজিদের ইমাম ছিলেন। ২০ বছর বয়সী বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত নাঈমুর জাকারিয়া রহমান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মিসেস তেরেসা মে-কে বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন (এএফপি ৭ই ডিসেম্বর ২০১৭)। ২৮শে নভেম্বর তিনি গ্রেফতার হন, সাথে ২১ বছর বয়স্ক পাকিস্তানী মোহাম্মদ আকিব ইমরানও। নাঈমুরকে দু’টি অকেজো বোমাসহ গ্রেফতার করা হয়। তিনি এখন ব্রিটেনে বিচারাধীন।
নিউইয়র্কের ওজন পার্কেও ২২ বছর বয়স্ক পারভেজ আহমদ গ্রেফতার হয়েছেন। তিনি আইসিস-এ যোগ দেয়ার জন্যে সৌদি আরবে যান এবং সেখান থেকে জর্ডান। সিরিয়া যাওয়ার আগেই তিনি জর্ডানে ধরা পড়েন। তাকে আমেরিকায় নিয়ে আসা হয় (এনবিসিনিউইয়র্কডটকম ১৩ই ডিসেম্বর ২০১৭)। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত কানাডীয় নাগরিক ২৫ বছর বয়স্ক তাবিরুল হাসিব হঠাৎ ২০১৫-তে উধাও হয়ে যান। ২০১৭-তে ইন্টারপোল ১৭৩ জন সম্ভাব্য আত্মঘাতী বোম্বারের একটি তালিকা তৈরি করে, তাবিরুলের নাম সেখানে ঠাঁই পায়। ধারণা করা হয়, তাবিরুল আইসিস প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত (সিবিএস নিউজ ২০ আগষ্ট ২০১৭)। ম্যারিল্যান্ডের ২৪ বছর বয়স্ক নালেস মোহাম্মদ দাস আইসিসের পক্ষে মার্কিন সৈন্যদের ওপর আক্রমণের পরিকল্পনা করেছিলো। তিনি আইসিস সমর্থক। বর্তমানে জেলে আছেন (দি বাল্টিমোর সান, ৩রা অক্টবর ২০১৩)।
কলকাতায় দু’জন বাংলাদেশী সন্ত্রাসী আটক করা হয়েছে। তারা আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের সদস্য, সিলেটের শামসাদ মিয়া, ২৫ এবং খুলনার রিয়াজুল ইসলাম। তারা অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায় জড়িত (এনডিটিভি ২১ শে নভেম্বর ২০১৭)। গুলশানে হলি আর্টিজান হত্যাকান্ডের পর আইসিস ভিডিওতে যিনি প্রথমে আরো হত্যাকান্ডের হুমকি দিয়েছেন, তিনিও বাংলাদেশী বলে অনুমিত হচ্ছে, নাম তাহমিদ রহমান সাফি (বিডিনিউজ২৪ডটকম, ৭ই জুলাই ২০১৬)। সিঙ্গাপুরে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে অর্থ যোগানের অপরাধে ৪ বাংলাদেশী রহমান মিজানুর, মিয়া রুবেল, মোহাম্মদ জাবাথ কায়সার হাজী নুরুল ইসলাম সওদাগর, এবং সোহেল হাওলাদার ইসমাইল হাওলাদার-এর কারাদন্ডের খবর তো পুরানো হয়ে গেছে (চ্যানেলনিউজএশিয়া ১২জুলাই ২০১৬)।
প্রশ্ন হচ্ছে, এসো কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা? বাংলাদেশিরা জঙ্গী হচ্ছে কেন? এদের মগজ ধোলাই কি দেশে হয়েছে না বিদেশ? লক্ষ্যণীয় যে, ঘটনাগুলো ৯/১১ টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর। বিশ্বের মিডিয়া তখন বলেছিলো, বিন লাদেনের অধীনে একটি ‘বাংলা ব্রিগেড’ ছিলো। এরা কারা এবং কোথায়? স্মর্তব্য যে, আফগানিস্তানে কিছু বাংলাদেশী তালেবানদের সাথে যুদ্ধ করেছিলো। বাংলাদেশ তখন এদের স্বাগত জানিয়েছিল। কাশ্মীরে সন্ত্রাসীদের সাথে কিছু বাংলাদেশী এবং অধুনা রোহিঙ্গারা যুদ্ধ করছে বলে বিভিন্ন সময়ে মিডিয়ায় এসেছে। সিরিয়ায় কিছু বাংলাদেশী যুদ্ধ করছে।
আমরা সহজেই অন্যের ঘাঁড়ে দোষ দিয়ে হাত মুছে ফেলতে পারি, কিন্তু এ সবের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে ধর্মীয় গোঁড়ামি বাড়ছে তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই ? সাম্প্রতিক সময়ে ব্লগার, বুদ্ধিজীবী, পুরোহিত, বিদেশী, মুক্তচিন্তার মানুষ হত্যা এর প্রমাণ। সন্ত্রাসীরা সমাজে ঠাঁই পাচ্ছে? মনে আছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী বিন লাদেনকে বিয়ে করতে চেয়েছিলো? আমরা তখন কৌতুকবোধে হেসেছিলাম! এটি পরোক্ষভাবে সন্ত্রাসবাদকে প্রশ্রয় দেয়া। আপনার মনে যদি বিন লাদেন বা সন্ত্রাসীদের জন্যে সামান্যতম সহানুভূতি থাকে, তাহলে আপনি ইচ্ছা-অনিচ্ছা অথবা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সন্ত্রাসকে সমর্থন করছেন? সন্ত্রাসকে ঘৃণা করুন, সমাজ থেকে উপড়ে ফেলুন। সন্তান, পরিবার, সমাজ এবং দেশ বাঁচান।
কলাম লেখক, নিউইয়র্ক।