সমকালীন: দু’দকের ‘জজমিয়া নাটক!

শিতাংশু গুহ

নুতন নাটক, ‘দু’দকের জজমিয়া’। জাহালম ওরফে জানে আলম হচ্ছেন সেই দুঃখী জজমিয়া। অপরাধ করেন নি, তবে জেল খেটেছেন তিন বছর। সোনালী ব্যাঙ্কের সাড়ে আঠারো কোটি টাকা জালিয়াতির ছাব্বিশটি মামলায় অভিযুক্ত তিনি। আসল আসামী তিনি নন, আসামী জনৈক আবু সালেক। জাহালামের বাড়িতে চিঠি যায়, তিনি হাজিরা দেন দু’দকে। বোঝাতে চেষ্টা করেন, তিনি আবু সালেক নন, জানে আলম। কে শোনে কার কথা, তিনি গ্রেফতার হন। সেটা ৬ই ফেব্রুয়ারি ২০১৬। মুক্তি পেলেন ৩ রা জানুয়ারি ২০১৯। তাও আদালতের হস্তক্ষেপে।
জাহালমের মা দুধ দিয়ে ছেলে স্নান করিয়ে ঘরে তুলেছেন, যাতে দু’দকের অপবিত্রতা তার ছেলেকে আর স্পর্শ করতে না পারে? জাহালম এখন চিৎকার করে বলতে পারেন, ‘ফিরিয়ে দাও আমার তিনটি বছর’? কে দেবে ফিরিয়ে? এর দায় কার? একজন মানুষ বিনা-অপরাধে তিন বছর জেল খাটলেন, এটি গাফিলতি, নাকি অপরাধীকে বাঁচাতে নিরপরাধ জাহালমকে ফাঁসিয়ে দেয়া? নয়জন কর্মকর্তা একই ভুল করলেন? খবরে প্রকাশ, ওই কর্মকর্তারা সবাই প্রমোশন পেয়েছেন, একজন বিদেশে। এজন্যেই হয়তো গ্রাম বাংলায় বলে, ‘কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ’!
দু’দক তদন্ত কমিটি করেছে। ব্যাপারটা ‘চোরের সাক্ষী বাটপার’ হয়ে যাচ্ছেনা? এ ঘটনার একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া দরকার। দরকার এজন্যে যে, বিনা অপরাধে যেন আর কেউ শাস্তি না পায়; এ ধরনের ঘটনার আর যেন পুনরাবৃত্তি না হয়? এটাও দেখা দরকার সর্ষের মধ্যে ভূত আছে কিনা? দু’দকের তদন্ত কমিটি দিয়ে তো আর এতকিছু হবেনা? সরকারের এখানে একটি দায়িত্ব আছে। বিচার বিভাগ চমৎকার দায়িত্ব পালন করেছে। এ ধরনের ঘটনা অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়, যার উত্তর পাওয়াটা জনগণের জন্যে জরুরি। এতে সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়।
সরকার দুর্নীতি দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেছেন। এই দু’দক দিয়ে কি তা বাস্তবায়ন হবে? দুর্নীতি হচ্ছে ওপরের তলায়, দু’দক যাচ্ছে প্রাইমারী স্কুলে! বাস্তবতা হচ্ছে, যে কোন দফতরে বড়কর্তা ঘুষ না খেলে অন্যদের জন্যে ঘুষ খাওয়া কঠিন। দু’দক নিজেই বলেছে, দুর্নীতির এই মহাসমুদ্রে কাকে ধরবো? ঘুষ বা দুর্নীতি বিস্তৃতি লাভ করেছে, কারণ সবাই মিলে ঘুষ খাচ্ছেন। এজন্যে এটি এখন আর ঘুষ নাই, এটি হয়েছে ‘সার্ভিস চার্জ’। এক জরিপে বলা হয়েছে, দুর্নীতিতে বাংলাদেশ কয়েক ধাপ এগিয়েছে? আগে ছিলো ১৭, এখন নাকি ১৩? অর্থাৎ এখানেও উন্নতির ছোঁয়া লেগেছে।

দুর্নীতি দমন করতে হলে যে বুকের পাটা দরকার, দু’দকের কি তা আছে? দু’দকের ভেতরে কি দুর্নীতি আছে? দেশে বেশ ক’টি বড় বড় অর্থ লোপাটের ঘটনা ঘটেছে, দু’দক সেদিকে নজর দিচ্ছেন না কেন? পেটের জ্বালায় যাঁরা চুরি করে তাঁরা চোর বটে; কিন্তু যাঁরা ব্যাঙ্ক লুট করে বা রাষ্ট্রের কোষাগার লুন্ঠন করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলে তারা ডাকাত; ‘পাকা চোর অতিশয়’! এদের ধরাই তো আসল কাজ। সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা বাস্তবায়নের দায়িত্ব অনেকাংশই দু’দকের। অথচ দু’দক নেমে পরে চমক দেখতে?
দুর্নীতি দমন কঠিন কাজ। কেবলমাত্র পদ্ধতিগত উপায়ে সেটি সম্ভব। ডিজিটাল বাংলাদেশে দুর্নীতি বন্ধে উন্নত বিশ্বের মত একটি ‘সিষ্টেম’ গড়ে তোলা প্রয়োজন। বাংলাদেশে প্রায়শ: রাষ্ট্রযন্ত্র মানুষকে দুর্নীতি করতে শেখায়। তদুপরি শাস্তি হয়না, বা বিচার নেই, তাই দুর্নীতিতে দেশ ছেয়ে যাচ্ছে। তৃতীয় বিশ্বের দেশে দুর্নীতি একটি বিরাট সমস্যা। শুধু মুখের কথায় দুর্নীতি দূর হবেনা। মানুষকে ভালো হবার সুযোগ দিতে হবে? সাধারণ মানুষ যদি মোটামুটিভাবে পরিবার-পরিজন নিয়ে বেঁচে থাকার সুযোগ পায়, তাঁরা দুর্নীতি করবেন না?

রাষ্ট্রকে মানুষের মৌলিক চাহিদা, অর্থাৎ অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, বাসস্থান, চিকিৎসা সহজলভ্য করতে হবে। এতে দুর্নীতি আপনা থেকেই কমে যাবে। এখন যেমন সম্পদ গড়ার অনৈতিক প্রতিযোগিতা চলছে, রাঘব বোয়াল দু’চারটা জেলে গেলে তা কমবে? সুতরাং চমক নয়, বাস্তবতার নিরিখে উন্নত দেশের দৃষ্টান্ত মাথায় রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। সমস্যা দেখলে সরকার দু’দক ঢেলে সাজাতেই পারেন? মোদ্দাকথা হচ্ছে, দুর্নীতি দমনে সরকারি ঘোষণার বাস্তবায়নে দু’দক রেডি তো?