সমকালীন: বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ‘ছাইড়া দে মা কাইন্দা বাঁচি’ অবস্থা!

শিতাংশু গুহ

সংলাপ শব্দটি এখন দেশে বহুল ব্যবহৃত। সংলাপ ভালো। এতে লাভ হোক বা না হোক, ক্ষতি নেই? একাধিক পক্ষ যখন একসাথে বসেন, তখন শত্রুতা কিছুটা হলেও প্রশমিত হয়, মিত্রতা হলে তো কথাই নেই! লক্ষ্যণীয় যে, চলমান সংলাপের পর সকল পক্ষের ভাষা কিছুটা হলেও বেশ সংযত। এজন্যেই বলা হয়, টেবিল হোক সকল সমস্যা সমাধানের ভিত্তি। আলোচনা যখন থমকে যায়, তখন সকল পক্ষই কিছুটা হলেও কনসেশন দেন বটে। যদিও সকল পক্ষ ‘কলাগাছটা তারই থাকুক’ নীতিতে অটল থাকেন, তারপরও, আলোচনা বা সংলাপ আশার আলো দেখায়।
সরকার এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সংলাপে আশা-নিরাশার দোলা ছিলো, খুব বেশি কিছু হবে, কেউ ততটা আস্থাবান ছিলেন না, তারপরও পুরো দেশ একে স্বাগত জানিয়েছে। কারণ মানুষ সংঘাত চায়না, অথচ নির্বাচন আসছে, সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়ছে? আমাদের দেশে নির্বাচন মানেই একটি ভয়ভীতির বিষয়, অথচ এটি একটি নাগরিক দায়িত্বের ব্যাপার। একজন নাগরিক তার দায়িত্ব পালন করবেন, তার প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন, ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে, এতে সন্ত্রাসের জায়গা কোথায়? আমরা আসলে যতই নিজেদের সভ্য বলে দাবি করিনা কেন, একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করার যোগ্যতা বা ইচ্ছে কি সত্যিই আমাদের আছে?
গত ৪৭ বছরে কয়টি নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে? কেন হচ্ছেনা? আবার কথা উঠছে, সংলাপ না আলোচনা? সংলাপ বা আলোচনার মধ্যেকার তাত্বিক পার্থক্যে যাওয়ার দরকার নেই, সেটা যাই হোক, কথা চালাচালি চলুক। গণতন্ত্রে কথাই শেষ-কথা। আবার দেশে গণতন্ত্র আছে কিনা সেটাও প্রশ্ন। সরকার বলছেন, তারাই গণতন্ত্রের ধারক বাহক। অন্যরা বলেছেন, তারা গণতন্ত্র উদ্ধারের আন্দোলনে আছেন। আমাদের দেশে আমরা আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্র, জেনারেল জিয়ার সামরিক গণতন্ত্র বা এরশাদের ইসলামী গণতন্ত্র দেখেছি। আমাদের পাল্লায় পরে গণতন্ত্রের তো ‘ছাইড়া দে মা কাইন্দা বাঁচি’ অবস্থা!
সংলাপ বা আলোচনার যাই হোক, মূল প্রশ্নটি হলো, নির্বাচনটি হচ্ছে কিনা? হলে সেটা সবাইকে নিয়ে হচ্ছে কিনা? এই ‘সবাই’র’ মধ্যেও কিন্তু আছে? সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব হচ্ছে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্বাচনটি করা। এটুকু এখন মোটামুটি স্পষ্ট যে, সামনের। পার্লামেন্টে প্রায় সব নেতার জায়গা হবে না। যারা রাজনীতি করেন, তাদের এমপি হওয়ার একটি লক্ষ্য থাকে, যা স্বাভাবিক। এবার অনেকের ‘মনের আশা’ পূরণ হবে। বাম নেতারা যেমন নৌকা ছাড়া জিততে পারেন না, তেমনি জামানত বাজেয়াপ্ত হবে এমন নেতারাও এবার নৌকার আশীর্ব্বাদে জিতে আসবেন।
সংলাপ এবার অনেকের প্রকৃত চেহারা খুলে দিচ্ছে। এটা ভালো। মানুষ নেতা চিনুক। যেমন বিকল্পধারা! এর দুই প্রধান নেতা আবদুল মান্নান ও মাহী চৌধুরী মোটামুটি সংসদে যাচ্ছেন বলে ধরে নেয়া যায়। মান্নান সাহেব ঋণখেলাপি, আর মাহী চৌধুরীর আইসিটি ব্যবসা সব সরকারি দলের নেতাদের সাথে, অগত্যা কি আর করা, ‘গোল্ডেন হ্যান্ডশেক’! এমনকি অধুনা বিকল্পধারা নেতা/ বিএনপি নেতা শমসের মবিন’র সাথে প্রধানমন্ত্রীর একান্তে কথা বলাটাও অর্থবহ। এ মুহূর্তে বাংলাদেশে দ-মু-ের হর্তাকর্তা শেখ হাসিনা। ক্রিকেটের ভাষা অনুযায়ী, ব্যাটেবলে তিনি চমৎকার খেলছেন। তার দোয়া থাকলে আর কি কিছু লাগে?
সংলাপে গিয়ে ড: কামালের কী লাভ হলো? সরকারের লাভ অনেক। ঐক্যফ্রন্ট বা ড: কামালের লাভও কম নয়। তাদের সরকারের সাথে বসার প্রয়োজন ছিলো। তারা জানতেন সরকার কিচ্ছু দেবেনা, তবু বসতে হবে? বিকল্পধারা কী করবে তা স্পষ্ট হয়ে গেছে, কিন্তু ঐক্যফ্রন্ট কী করবে তা স্পষ্ট নয় বা হয়নি। এই সংলাপে মোটামুটি বিএনপি আউট, সরকারের মূল প্রতিদ্ধন্দ্বী এখন ড: কামাল। আবার সরকার ও ড: কামাল আদর্শগতভাবে তাদের চেহারা একই। যারা দেশে সরকার ও মূল বিরোধী দলকে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে দেখতে চান, এটি তাদের জন্যে একটি সুখবর। তবে কথায় বলে, ‘শেষ ভালো যার, সব ভালো তার’।
সরকারের সকল আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু এখন ঐক্যফ্রন্ট বা ড: কামাল। কিন্তু বিপদ দেখলে তিনি লন্ডন চলে যান ছাড়া তার ‘চরিত্র হরণের’ তেমন কোন ইস্যু নেই। তিনি ভদ্রলোক, বাংলাদেশের রাজনীতি অনেকদিন আগেই ভদ্রলোকের হাতছাড়া হয়ে গেছে, এতে তার দোষ কোথায়? তিনি নির্বাচনে জেতেন না, সেটা জাতির দুর্ভাগ্য। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ ঘরানার অনেক নেতা যারা সরকারের কিছু কর্মকান্ড পছন্দ করছেন না, তারা ‘কামাল শিবিরে’ ভীড় জমাচ্ছেন। বিষয়টি একেবারে মন্দ নয়?
সদ্য কাদের সিদ্দিকী ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড: কামালের পায়ে ধরে ছালাম করে তিনিও যোগ দিয়েছেন ঐক্যফ্রন্টে। আরো কেউ কেউ হয়তো যোগ দেবেন। তবে সংলাপ কিছুটা হলেও রাজনীতিতে ‘ভদ্রতা’ এনেছে। যেমন সংলাপের ঠিক আগেই ডঃ কামাল বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর কন্যার অসম্মান করা যাবেনা। আবার প্রধানমন্ত্রী ‘চাচা কি খাবেন’ তা ঠিকই খোঁজ রেখেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই শিষ্টাচার আবার চালু হচ্ছে এটাই বা কম কি। সংলাপে প্রধানমন্ত্রীর কথাবার্তা বেশ সংযত। ডঃ কামাল ছিলেন বিনয়ী। এগুলো ভালো।
প্রশ্ন হলো, বিএনপি’র কী হবে? যারা বিএনপি শেষ বলে ‘রসগোল্লা’ খাচ্ছেন, বিষয়টি তা নাও হতে পারে। বিএনপি ২০১৪-তে নির্বাচনে অংশ না নেয়ার খেসারত এখনো দিচ্ছে। এর দুই প্রধান নেতা ধরাশায়ী। তারপরও বিএনপি নেতারা বলছেন, অবাধ নির্বাচন হলে তারা জিতবেন। বিএনপি যে ঐক্যফ্রন্টে থাকবে গ্যারান্টি আছে? খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রশ্নে তারা বেরিয়ে যাবেন। থিওরী আছে যে, তাঁরা বেরিয়ে যাবেন, এবং এককভাবে নির্বাচন করবেন। তারা যদি ৪০টি সীটও ‘ছিনিয়ে’ নিতে পারেন, তবে অস্তিত্বহীন হবেন না। বিএনপি নির্বাচনে যাবে, এখন প্রশ্ন হলো ঐক্যফ্রন্টে না এককভাবে?
মহাজোটের হিসাব হচ্ছে, সবাই নির্বাচনে আসুক, তালগাছটা তাদের থাকলেই হয়। দেশের মানুষ বিশ্বাস করেন, তালগাছ মহাজোটেরই থাকবে। সমস্যা কোথায়? সামনের পার্লামেন্টটি হোক না মুখরিত। বহির্বিশ্বে যারা বাংলাদেশ নিয়ে মাথা ঘামান, তারাও একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চান। মহাজোটের সুবিধাটা হচ্ছে, এরশাদ তো তাদের আছেনই; তদুপরি ডাঃ বদরুদ্দোজা চৌধুরী এসে ভিড়েছেন, এতো ‘সোনায় সোহাগা’। এর ওপর আছে হেফাজতী ভোট। ইসলামী মৌলবাদী শক্তি বঙ্গবন্ধুকে ভোট দেয়নি, কিন্তু শেখ হাসিনা এবার এদের ভোটে ভাগ বসিয়েছেন।
কেউ কেউ ভাবছেন, মহাজোট এবং ঐক্যজোটের ভোট ভাগাভাগী হবে! শেষকথা বলার সময় হয়নি, তবে বিএনপি বেরিয়ে গেলে ঐক্যজোট অনেকটা শক্তিহীন হয়ে পড়বে। এবার হিন্দুভোট ভাগাভাগি হবে। তবে বড় ভাগটি যাবে মহাজোটের ভাগে। বিষয়টি হচ্ছে, এবার নির্বাচন নিয়ে রাজনীতি হচ্ছে। রাজনীতি হউক। সৌভাগ্যের বরমাল্য কার গলায় শোভা পাবে সেটি ভিন্ন প্রশ্ন, দেশে সুস্থ রাজনীতি আবার চালু হোক। রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ হোক। দেশে আওয়ামী লীগ, বিএনপি’র বাইরে রাজনীতিতে একটি তৃতীয় ধারা সৃষ্টিতে সংলাপ যদি কোন আশার সঞ্চার করে থাকে আপাতত: সেটাই বা কম কি?
শিতাংশু গুহ, কলাম লেখক।
৪ নভেম্বর ২০১৮। নিউইয়র্ক।