সমঝোতা প্রস্তাবে খালেদার না , নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে দলের প্রতি নির্দেশ

নিজস্ব প্রতিনিধি : সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় আসার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন বিএনপির শীর্ষ নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার গত ৮ মার্চ জেলখানায় তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, ছোট ভাইয়ের প্রস্তাবে ক্ষুব্ধ হন বেগম খালেদা জিয়া। বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মুক্ত জীবনে আসার স্বার্থে খালেদা জিয়াকে সমঝোতায় আসার অনুরোধ করেন ছোট ভাই। নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিএনপি যদি সংসদে বিরোধী দলেও থাকে, তাহলেও দলের জন্য ক্ষতিকর হবে না। বরং দলকে ও দলের হাজার হাজার কর্মীকে রক্ষা করা যাবে এবং পরবর্তী নির্বাচনে নিশ্চিতভাবেই দেশের মানুষ বিএনপিকে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে ক্ষমতায় আনবে।

জানা যায়, বেগম খালেদা জিয়া ছোট ভাইকে এ প্রস্তাব দেওয়ার জন্য তিরস্কৃত করেন। ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রস্তাব নিয়ে না আসার জন্য বলেন। জেলখানায় তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে ভালো আছেন এবং শিগগিরই তিনি মুক্ত হবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বিএনপির নেতৃস্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বেগম খালেদা জিয়া তার সঙ্গে সাক্ষাৎকারী দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গেও এ নিয়ে আলোচনা করেন। সরকারি কোনো শর্তে সরকারের সঙ্গে কোনো রকম সমঝোতায় না আসার ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত কঠোর মনোভাব প্রকাশ করেন। তিনি তাদের জানান, তার ভাই সরকারি প্ররোচনায় এ ধরনের প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন বলে তিনি মনে করেন না।

তার ভাই কোনো দিনই রাজনীতিতে ছিলেন না। রাজনীতি নিয়ে তার আগ্রহও নেই। ক্ষমতায় থাকাকালে ন্যূনতম কোনো সুযোগ-সুবিধাও নিতে আসেননি। নিতান্তই বয়োবৃদ্ধ, শারীরিকভাবে দুর্বল অবস্থায় থাকা বোনের স্বার্থকেই তিনি বড় করে দেখেছেন বলে তিনি মনে করেন। বেগম খালেদা জিয়া সাক্ষাৎকারী দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের খালেদা জিয়া সব বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেন।

দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তির প্রতিনিধিত্বকারী দল বিএনপিকে নির্বাচনমুখী করার জন্য সরকারের নানামুখী প্রক্রিয়া সরকারদলীয় নেতাদের ভাষ্যমতে সাফল্যজনকভাবে এগিয়ে চলেছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য মওদুদ আহমদ বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন, বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে। অবশ্য দলটির কোনো নেতাই নির্বাচনের বিপক্ষে মন্তব্য করেননি। তারা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথাই বলছেন। তবে তা শর্ত সাপেক্ষে।

বিএনপির একাধিক নেতৃস্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি, সংসদ ভেঙে দিয়ে সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান, সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা সাপেক্ষে বিএনপি নির্বাচনে যাওয়ার কথা বললেও শেষ পর্যন্ত তারা বৃহত্তর স্বার্থে কিছু দাবি থেকে সরে আসতে পারে। ভিন্ন একটা হিসাবে তারা অগ্রসর হচ্ছে। বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সর্বশেষ বৈঠকে অংশগ্রহণকারী একজন সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ম্যাডাম নির্বাচনে অংশ নেওয়ার লক্ষ্যে সাংগঠনিক, রাজনৈতিক প্রস্তুতি চূড়ান্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি যদি জামিন এবং নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ না-ও পান নির্বাচনে বিএনপি অত্যন্ত ভালো ফল করবে, এমনকি সরকারও গঠন করতে পারে মর্মে গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

লন্ডনে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে পরামর্শ করে স্থায়ী কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনিয়র নেতাদের সুষ্ঠুভাবে দল পরিচালনা ও নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। তফসিল ঘোষণার আগে তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবাইদা দেশে এসে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেবেন বলেও জানান।

বেগম খালেদা জিয়া সুবিচার বঞ্চিত হয়েছেন, তিনি সরকারের প্রতিহিংসার অবিচারের শিকার বলে দেশব্যাপী ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে তার প্রতি সহানুভূতি ও বিএনপির প্রতি সমর্থন বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে দলটি। তারা মহানগর, বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে সভা-সমাবেশ শুরু করেছেন। উপজেলা পর্যায়েও অনুরূপ কর্মসূচি পালন করা হবে। সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাধা, হামলা, মামলার ঘটনাপ্রবাহ বিএনপির পক্ষেই আসছে। নেতারা মনে করেন, এতে খালেদা জিয়া ও বিএনপির প্রতি মানুষের সহানুভূতি আরো বাড়ছে। বিএনপির নেতারা এবং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলও মনে করেন, লাগাতার দুই মেয়াদে সরকারের শাসনে, প্রশাসন ও দলীয় নেতা-কর্মীদের দুরাচারে মানুষ এতটাই অতিষ্ঠ যে সুযোগ পেলেই তারা পরিবর্তনের পক্ষে রায় দেবে। এই সুযোগটাই নেওয়ার অপেক্ষায় আছে বিএনপি।

সরকার যত কৌশল, যত প্রক্রিয়াই করুক শান্তিপূর্ণ পথই বিএনপির বিজয় নিশ্চিত করবে। ছলচাতুরী, নানা কৌশলে বিএনপিকে নির্বাচনে এনে এবং নির্দিষ্টসংখ্যক আসনে বিএনপিসহ বিরোধীদের বিজয় দেখিয়ে গোপন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে সরকার গঠনের মতো জয় নিশ্চিত করতে চায় সরকার। বিএনপির নেত্রীর সঙ্গে নেতাদের এ নিয়েও কথা হয়েছে। সরকার ৭০-৮০ আসন বিএনপিকে দেবে ধরে নিয়েও বিএনপির নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে বলা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে দেশের মানুষ সরকারবিরোধী আন্দোলনে জোরালোভাবে মাঠে নেমে আসবে। হিংসাত্মক, নৈরাজ্যকর কোনো পথে না গিয়েও সর্বাত্মক আন্দোলনে যাওয়ার পূর্বপরিকল্পনাও নিয়ে রাখা হয়েছে।

গণতান্ত্রিক বিশ্বও তখন অনেক বেশি সোচ্চার ও সক্রিয় হবে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর অবরোধের সময় জামায়াতের সহিংস ভূমিকার কারণে বিএনপির ওপর দায় চাপানোর যে সুযোগ সরকার পায়, আগামী দিনে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিএনপি গত কয়েক মাস যাবৎই জামায়াতের সঙ্গে দূরত্ব রক্ষা করে চলছে। সরকারের সঙ্গে আঁতাত করে জামায়াতের নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে তথ্য রয়েছে বিএনপির হাতে। যে কারণে জামায়াতের ব্যাপারে তারা তেমন একটা উৎসাহী নয়। যদিও প্রকাশ্যে তা বলা হচ্ছে না জোটের ঐক্যের স্বার্থে।

উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসনে জালিয়াতি, কারচুপি করে সরকারি দল বিজয় ছিনিয়ে নিলে দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হবে এবং সে ক্ষেত্রে বিএনপি নির্বাচন-পরবর্তী আন্দোলন এমন তীব্র করার পরিকল্পনা নিয়েছে, যাতে সরকার স্থিতি প্রতিষ্ঠার সুযোগ না পায়। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর কার্যকর কর্মসূচি না থাকার সুযোগেই সরকার স্থিতিশীল অবস্থান করে নেয়। এভাবে সুযোগ না দেওয়ার ব্যাপারে বিএনপির অবস্থান কঠোর কোনো হিংসাত্মক পথে না গিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় লাগাতার হরতাল, রেলপথ-নৌপথ-রাজপথসহ গোটা দেশ অচল করে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে রাখা হয়েছে।

ভয়াবহ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হবে লাগাতার, যাতে সরকার অচল হয়ে পড়ে এবং গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থায় নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। অজানা ভবিষ্যৎকে সামনে রেখেই পথরেখা স্থির করছে বিএনপি হাইকমান্ড। বিএনপির পরিকল্পনা সম্পর্কে সরকারি মহল অবগত বলেই জানা যায়। কতিপয় শীর্ষস্থানীয় নেতার সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্কের সুবাদে তারা অনেক তথ্যই পেয়ে যাচ্ছেন। এটাই বড় দুশ্চিন্তার কারণ বিএনপি হাইকমান্ডের জন্য। বিএনপির এই নেতারাও জাতীয়তাবাদী শক্তির ক্ষতি বা বিকাশ কামনা করেন না। খালেদা জিয়ার সম্মতিতে বা তাকে বুঝিয়ে সম্মত করানোর মাধ্যমে নির্বাচনে আনা ও সম্মানজনক আসন নিয়ে হলেও সংসদীয় প্রতিনিধিত্বের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন তারা।