সময়

জান্নাতুল ফেরদৌসী মেহমুদ :

একটা সময় ছিল যখন আমি আমেরিকায় নতুন এসেছিলাম। আমার গ্রিনকার্ড তখনো প্রসেসিংয়ে ছিল। ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল না। ইংলিশে তেমন ফ্লুয়েন্ট ছিলাম না। হ্যাঁ, তার পরও আমেরিকা নামের স্বপ্নের রাজ্যে সাহস করে হাঁটি হাঁটি পা পা করে আমার পথচলা শুরু হয়। বিয়ের পর নিজের পরিবারকে ছেড়ে এসে এক নতুন সংসার, নতুন দেশ, নতুন কালচারÑসবকিছু একটু হিবিজিবি মনে হয়েছিল। তার পরও নিজের মধ্যে একটা এক্সাইটমেন্ট কাজ করত, মে ফ্লাওয়ারের দেশে এসেছি, ল্যান্ড অব অপরচুনিটি বলে কথা! শুধু নিজের পরিবারকে অনেক মিস করতাম। আর সবচেয়ে বেশি সমস্যা যেটা ছিল, এখনকার মতো এত রিসোর্স ছিল না। এখন যেমন তথ্যপ্রযুক্তির বদৌলতে সারা বিশ্ব আমাদের হাতের মুঠোয়, অগণিত যোগাযোগমাধ্যম ফ্রিতে পাওয়া যায়, তখন কিন্তু এসব সুযোগ-সুবিধা ছিল না।

তখনকার সময়ের আমেরিকার ল্যান্ডলাইন থেকে বাংলাদেশের ফোন লাইনে কল করতে প্রতি মিনিটে ডলার হিসাব করতে হতো। প্রতি মাসে কয়েক শ ডলার শুধু টেলিফোনের বিল আসত। আমাদের বাসায় কেবল টিভি ছিল। প্রায় ২০টি ইংলিশ চ্যানেল ছিল। সব চ্যানেল ইংলিশ থাকাতে যে সুবিধাটা হয়েছিল, ইংরেজি চ্যানেলগুলোতে দেখে দেখে ইংলিশটা খুব দ্রুত আয়ত্ত করতে পেরেছি এবং এ দেশের কালচার সম্পর্কে আমার বেশ ভালো একটা ধারণা তৈরি হয়েছে।
আমি যে শহরে ছিলাম, সেটা বেশ ছিমছাম, নিরিবিলি ছিল। পাবলিক ট্রান্সপোর্টেশনের তেমন সুব্যবস্থা ছিল না। কোথাও যেতে হলে বরের ছুটির জন্য উইকএন্ড পর্যন্ত অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে হতো। বাসার আশপাশে পরিচিত বাংলাদেশি কেউ ছিল না, আসলে কথা বলার জন্য কাকপক্ষীও ছিল না।

আমার বরের পরিচিত বন্ধুদের বাসা আমাদের বাসা থেকে আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টার ড্রাইভিং ডিসটেন্স ছিল। কোনো দাওয়াত ছাড়া তাদের বাসায় তেমন যাওয়া-আসা হতো না। কাছে এমন কোনো বাসা ছিল না যে বর জবে যাওয়ার আগে ড্রপ করে দিয়ে আসার সময় পিক করবে, এমন কোনো সুযোগ আমার তখন হয়নি।

পরে ধীরে ধীরে লাইসেন্সের জন্য ড্রাইভিং শিখতে থাকি। ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস নিতে থাকি। তখন সময় কিছুটা পার হতে থাকে। প্রেগন্যান্সির সময়টা ছিল বেশ লম্বা আর স্মরণীয়। প্রথম বাচ্চার জন্মের পর তেমন কিছুই জানতাম না। বাচ্চার একটু শরীর খারাপ হলে ডাক্তারের কাছে ফোন করতাম। বাচ্চার জন্য কোন ফর্মুলা ব্যবহার করলে ভালো হবে, সেসব জানতাম না। মোটকথা, কোনো অভিজ্ঞতাই আমার ছিল না। শুধু ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী সবকিছু অনুসরণ করার চেষ্টা করতাম। এভাবে কয়েক বছর কেটে যায়। বাচ্চার তিন বছর বয়স হওয়ার পর তাকে প্রি-স্কুলে ভর্তি করাই। তত দিনে ড্রাইভিংটা আয়ত্ত করে নিয়েছিলাম। বাচ্চাকে স্কুলে ড্রপ করে পার্ট টাইম জবে যেতাম। আর সাথে পার্ট টাইম পড়াশোনা কন্টিনিউ করেছি। তখন সময় মোটামুটি কাটতে থাকে।

আমার ছোট মেয়ে জন্মের পর দুই বছর বাসায় ছিলাম, তখন জব করিনি, কিন্তু পড়াশোনা চালিয়ে নিয়েছি। ওর দুই বছর পার হওয়ার পর ওকে ডে-কেয়ারে দিয়ে শুরু হয় আমার জীবনের আসল ব্যস্ততা। আমি তখন একটা ব্যাংকে জব শুরু করি। আর পার্ট টাইম পড়াশোনা করতাম। সকালবেলা এক বাচ্চাকে ডে-কেয়ারে, আরেকজনকে স্কুলে ড্রপ দিয়ে আমি ব্যাংকে চলে যেতাম, কাজ শেষে আবার দুজনকে দুই জায়গা থেকে পিকআপ করতাম। বাসায় এসে চলত আমার রান্না, বাচ্চাদের হোমওয়ার্ক, তাদের খাওয়ানো, তাদের গোসল, তাদের টেককেয়ার। রাত নয়টায় আমি তাদেরকে ঘুম পাড়িয়ে দুই ঘণ্টা আমার নিজের হোমওয়ার্ক করতাম।

আমার অতীত ব্যাকগ্রাউন্ডের ইতিহাস একটু কেন বললাম? সেই কারণগুলো এখন বলছি…
আমার গ্রিনকার্ড হাতে আসার আগে ভাবতাম, ইশ্্, গ্রিনকার্ড কবে হাতে পাব? পেলে একটা জব করব, বাসায় বসে থাকতে হবে না। ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার আগে ভাবতাম, লাইসেন্স কবে পাব? তাহলে স্বাধীনভাবে যাতায়াত করতে পারব, কারো ওপর ডিপেন্ড করতে হবে না। ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার পর ড্রাইভিং করতে করতে কয়েক বছরের ব্যবধানে ড্রাইভিংয়ের প্রতি এতই বিরক্তি এসে গেছে যে আমার এখন আর পাঁচ মিনিটের ড্রাইভিং ডিসটেন্সে কোথাও যেতে মন চায় না। এখন বাসায় কেবল টিভিসহ একটি বক্স আছে, যেটাতে বিশ্বের ২০০টি চ্যানেলের উপরে আছে, সেখানে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের সব টিভি চ্যানেলসহ বিশ্বের অন্যান্য ভাষার সব ধরনের চ্যানেলের অভাব নেই। সেটা ছাড়াও ইউটিউব, নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম তো আছেই। কিন্তু ব্যস্ততার কারণে আমার টিভি দেখারই সময় হয় না। এসবই হয়েছে শুধু কয়েক বছরের ব্যবধানে। সে জন্য অস্থির না হয়ে ধৈর্য ধরে সবকিছুকে সময় দিতে হয়। বাংলাদেশি পরিচিত আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের বাসায় যাওয়ার জন্য একসময় মরিয়া হয়ে ছিলাম, পরিবহনের অভাবে যেতে পারতাম না। এখন নিজের বাচ্চা, ঘর-সংসার, চাকরিÑসবকিছু নিয়ে এত বেশি ব্যস্ত থাকি যে বেড়াতে যাওয়া তো দূরের কথা, ফোন করে যে কারো সাথে একটু কথা বলব, সে সময়টা পর্যন্ত পাই না। শুধু সময়ের ব্যবধান, কালের বিবর্তনে সময় অনেক কিছু শিখিয়ে দেয়।

যে স্মৃতিটা সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছে, সেটা হচ্ছে আমি যখন ব্যাংকে জব করতাম, তখন আমার দুটো বাচ্চা ছোট ছিল। আমেরিকার স্কুলে বাচ্চারা একটু অসুস্থ হলে সাথে সাথে প্যারেন্টকে কল করে বাচ্চাদের পিকআপ করে বাসায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। ব্যাংকে কর্মরত অবস্থায় এসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সব সময় সহজ ছিল না। পুরোনো দিনের সেই স্মৃতিগুলো আমাকে মাঝেমধ্যে হাসায়, মাঝেমধ্যে কাঁদায় আবার মাঝেমধ্যে ভাবায়। কারণ তখন সে সময়টাতে যদি প্রতিকূল পরিবেশের সাথে মোকাবিলা করে ঘুরে দাঁড়াতে না পারতাম, আজকে হয়তো এতটুকু পৌঁছাতে পারতাম না। আমি এখন আইটি সেক্টরে জব করছি, চাইলে অফিসের কাজ বাসা থেকে করতে পারি, চাইলে অফিস থেকে। ওদেরকে শুধু সকালে উঠে একটা ইমেইল করে বলে দিলেই হয় যে আজ বাসা থেকে কাজ করব। কারণ হিসেবে তেমন বিশেষ না দেখালেও চলে। যেমন আজকে শরীরটা তেমন ভালো লাগছে না, অথবা আজকে আমার বাচ্চার শরীরটা তেমন ভালো না, আজকে বাসায় একটা সমস্যা হয়েছে, মিস্ত্রি আসবে কিছু ঠিক করতে। এ ধরনের ঠুনকো অজুহাত দিয়েও বাসা থেকে কাজ করা যায়। সেটা ছাড়াও অনেক কোম্পানিতে সপ্তাহে বেশ কয়েক দিন বাসা থেকে কাজ করার ফ্যাসিলিটি থাকে, অনেকে আবার ফুলটাইম বাসা থেকে কাজ করেন।

‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ আগে যতখানি পরিচিত বা প্রচলন ছিল না, করোনাভাইরাস প্যান্ডামিকের পর সেটা বহুল প্রচলিত এবং বিরাট আকার ধারণ করেছে। সারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ জুম কলের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় মিটিংয়ের মাধ্যমে বিজনেস ডিল করছে। স্টিম-ইয়ার্ডের সহায়তায় ফেসবুক, ইউটিউবসহ মাল্টিপল ডেস্টিনেশনে একই সময়ে লাইভ হোস্ট করা সম্ভব হচ্ছে। অনলাইনের বদৌলতে বাংলাদেশের অনেক নারীরা উদ্যোক্তা হতে সক্ষম হয়েছেন। ভাবা যায়, বাচ্চাদের রেখে বাসা থেকে বাইরে গিয়ে যাদের পক্ষে কাজ করা সম্ভব ছিল না, তারা নিজেদের উদ্যোক্তা বানাতে সক্ষম হয়েছেন শুধু এই অনলাইনের কারণে।

সবশেষে বলব, সময় থাকতে সময়ের কদর করা উচিত। যথাসময়ে প্রয়োজনীয় কাজগুলো করা উচিত। শেষ না করতে পারলেও শুরু করার চেষ্টা করা উচিত। আমরা সাকসেসফুল হই বা না হই, কিন্তু মনকে সান্ত্বনা দিতে পারব যে আমরা চেষ্টা করে দেখেছিলাম। কারণ, প্রতিটি সাকসেস গল্পের মূল চাবিকাঠি হচ্ছে, তারা কোথাও না কোথাও শুরু করেছিল। সময় তার আপন গতিতে চলতে থাকে। কারো জন্য অপেক্ষা করে না। সময়টা ভালো হোক বা মন্দ। বুদ্ধিমত্তা দিয়ে জয় করতে হয়, যাতে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সময় আমাদের পক্ষে থাকে। কেউ চেষ্টা করেছিল বিধায় আমেরিকা আবিষ্কার করেছে, কেউ চেষ্টা করেছিল বিধায় চাঁদে যেতে পেরেছে। শুধু কাজটা করার জন্য ইচ্ছাশক্তি থাকতে হবে আর সময়মতো করতে হবে।