“সম্পর্করা কেন রং বদলায়”

এইচ. এম. মুশফিক

মানুষের বয়সের সাথে সাথে বোধ হয় সম্পর্করা রঙ বদলায়। কিছু কিছু সম্পর্ক বির্বণ হয় আর কিছু হয় কালারফুল ভিন্ন রঙ্গে ভিন্ন আঙ্গিকে ভিন্ন স্তরে সম্পর্করা দানা বাঁেধ। এ যেন একদিকের হাত ছেড়ে অন্যদিকের হাতটা আঁকড়ে ধরা। একদিকের শেকড় উপড়ে ফেলে অন্য দিকের শেকড় গাঁড়া। একদিক থেকে চোখের দৃষ্টি ফিরিয়ে অপর দিকে নজর দেয়া, এটা যেনো সার্বজনীন একটা দিক পরিবর্তন। শৈশবের স¤পর্ক কৈশোরে এসে রঙ বদলায়, কৈশোরেরটা বদলায় যৌবনে। যৌবনের স¤পর্কটা রঙ বদলায় দা¤পত্য জীবনে। মানুষের দা¤পত্য জীবনে সকল স¤পর্কেও কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় যেনো তার সন্তান-সন্ততি। যেন সবার উপরে সন্তান-সন্ততি তার উপরে নাই! কারণ পৃথিবীতে বাবা মা-র যতো অপরাধ তার অর্ধেকের বেশি হয় তাদের সন্তান-সন্ততির জন্য।
এমন কি মানুষ তার সবচে প্রিয়জন যার পায়ের নিচে বেহেস্ত, সেই মা-কে পর্যন্ত ভুলে যায় সন্তানের দোহাই দিয়ে! বাবা হওয়ার পূর্বে যে সন্তান তার নিজের বাবা মায়ের জন্য জীবন উৎসর্গ করতেও দ্বিধা করে না, সেই একই সন্তান বাবা হওয়ার পর তার স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে আপন মা বাবাকে একপাশে ঠেলে রেখে দূরে কোথাও চলে যায়। আর খোঁজ খবরও রাখে না। খোঁজ খবর রাখতে গেলে দায় চাপতে পারে খরচের। অনেক মেরুদ-হীন কাপুরুষ আছে যারা এটা করে থাকে স্ত্রীর গোলাম হিসেবে। স্ত্রীর যুক্তি – তোমার এ অল্প বেতনের টাকায় বাবা মা-সহ এক সঙ্গে সবার দায়ভার নিতে গেলে আমাদের ছেলে মেয়েদের ভালো স্কুল কলেজ পড়াতে পারবোনা। ওদের ভালো খাবার ভালো থাকার নিশ্চয়তা দিতে পারবোনা = একটা অযৌক্তিক ঠুনকো অজুহাত দাঁড় করিয়ে শাশ্বত স¤পর্ক নাড়ীর বন্ধনেকে অস্বীকার করে যারা তারাও কিন্তু আরেক প্রজন্মের আরেক বাবা মা!! সন্তানের ভবিষ্যত গড়ার অজুহাতে যেসব দ¤পতি বাবা মা-কে দূরে ঠেলে নিজের সন্তানকে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক ব্যারিস্টার বানিয়েছেন বা বানাচ্ছেন তাদের আস্তানা-ই একটা বয়সে হয় বৃদ্ধাশ্রম। বাংলাদেশের বৃদ্ধাশ্রমগুলো ঘুরে দেখুন ; প্রশ্ন করে অতীত ইতিহাস বের করে আনুন যারা ওখানে থাকে তাদের দেখবেন ওরা বলবে; ছেলে উচ্চ শিক্ষিত, ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার বা বড় ব্যবসায়ী। এসব ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বা বড় ব্যবসায়ী ছেলে মেয়েগুলো তাদের জীবন চলার পথে দাদা দাদীর কোন ¯পর্শ ছিলোনা। আদর ভালবাসা মায়া মমতা সংশ্রব কোন কিছুই ছিলোনা। শুধু তাই না, খোঁজ খবর নিলে জানবেন এসব ছেলে মেয়েদের বাবা মা-রা এতোটাই স্বার্থপর জীবন যাপন করতো যে ওদের দাদা দাদীর সাথে তো স¤পর্ক দূরে থাক নিকট আত্মী পাড়া প্রতিবেশী কারও সাথেই এদের কোন ভালো স¤পর্ক বা যোগাযোগ ছিল না। এঁরা এদের সন্তানদের জীবনে কখনও ধর্মীয় শিক্ষাতো দূরে থাক নৈতিক শিক্ষাটুকুন দেয় না। এরা সন্তানদের এমনভাবে গড়ে তোলে, সন্তানেরা শিক্ষাকে টাকা কামানোর হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করে।
এ ধরনের বাবা মা-রা যারা বাংলাদেশে আছেন তাদের আশ্রয় হয় বৃদ্ধাশ্রম কিন্তু যারা আমেরিকায় তাদের ভাগ্য একটু ভালো, বৃদ্ধাশ্রমে যেতে হয় না। তবে বৃদ্ধাশ্রমে তো অন্য আরো অনেকে থাকে। সুখ দুখ শেয়ার করা যায়। কিন্তু আমেরিকায় একাকীত্বের জীবন!! সরকারি খরচে একটা বাসা পাবেন। খাবারের একটা কার্ড আর নগদ টাকার আরো একটা বেনিফিট কার্ড। নিজের কষ্টের ঘাম ঝরা টাকায় যেসব ছেলে মেয়েদের টাকা কামানোর হাতিয়ারে পরিণত করেছেন ঐসব ছেলে মেয়েরা বছরে একবার বা দুবার সশরীরে এসে বা কার্ড পাঠিয়ে হ্যাপী ফাদার বা হ্যাপী মাদার-স ডে পালন করবে!!
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধুদের খুঁজে পাওয়া যায় কর্ম জীবনে, আপনার আমার কর্ম জীবনের ডানে বা বায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউকে না কাউকে পাবেনই। শিক্ষা, পদ পদবি সমান হলেও অনেক সময় অবৈধ উপার্জনে অর্থ বিত্তের অসমতার কারণে লাইফ স্ট্যাটাস প্রশ্নে অসৎ আর সততার দন্ধে স¤পর্ক রঙ বদলায়। এ ক্ষেত্রে রক্ত চোষা কোন অফিসের অর্থ বিত্ত গড়ে তোলা কোন পিয়নের সাথে আরেক অবৈধ বিত্তের মালিক ম্যাজিস্টেটের স¤পর্ক গড়ে উঠতে পারে। কঠিন বিপদে যে সব স¤পর্ক পাশে দাঁড়ায় তা হলো শৈশব আর কৈশোরর স¤পর্ক। কিন্তু জীবনের একটা পর্যায় এসে এ স¤পর্কটা সঙ্কুচিত হয়ে যায়। কেউ নিজেকে গুটিয়ে নেয় ছোট ভেবে, কেঊ নিজেকে বড় করে সরে দাঁড়ায় বা নিজেকে আড়াল করে। ছোট ভেবে যে নিজেকে গুটিয়ে নেয় তার দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিলেই স¤পর্কটা গোলাপের ন্যায় রক্তিমাভায় পূর্ণ হয়। অবশ্য যে নিজেকে বড় মনে করে স্বেচ্ছায় আড়াল করে, তার দিকে হাত বাড়ালে অপমানিত হবার সম্ভাবনা থাকে। কারণ যে নিজেকে আড়াল করে সে সাধারণত দুটো কারণে করে। এক- হতে পারে পাপবোধ, তার বড় হবার পেছনে এমন কোন পাপ আছে যা ছোট মনে করা লোকটা জানে। দুই- হতে পারে তথাকথিত সামাজিক মর্যাদা। সে ভাবতে পারে ঐ লোকের সাথে স¤পর্ক তাকে সামাজিক ভাবে মূল্যহীন করতে পারে।
কিছু কিছু স¤পর্ক আছে যা কখনও রঙ বদলায়না। রঙ বদলাতে পারে না। আমরা ইচ্ছে করে সেইসব স¤পর্কের রঙ উপড়ে ফেলি। যেমন ভাই বোন বাবা মা, পৃথিবীতে সবকিছুরই নবায়ন করতে হয়, স¤পর্কের ও নবায়ন হয়। চিন্তা করুন তো, আপনার কোন কোন স¤পর্কের নবায়ন আছে? একটি ফোন কল- একটি মায়া ভরা ডাক, একটি ¯পর্শ , বিপদের সময় একটু পাশে দাঁড়ানো, একটি চোখের ইশারা— পরামর্শ, অসহায়ত্বের সময় কঠিনভাবে ভরসা দিয়ে হাতটি চেপে ধরা। মমতায় চোখে মুছে দেয়া। করেছেন এসব? কতদিন হলো-করেছেন? কার কার সাথে করেছেন? বছরে অন্তত বারো বার। বেশি করলে স¤পর্কটা হয়ে ওঠবে আরো পোক্ত, আরো গাড়ো, আপনি আমি হয়ে ওঠবো একজন মানুষ। শুধু একজন মানুষ হতে চাইলে চলুন স¤পর্কের রশিগুলো বুকে বাঁধি। নবায়ন করি প্রতিদিন!!
নিউ ইয়র্ক।