সম্পর্কের টানাপোড়নে…

নাজমুল হক নাহিদ
দুজন মানুষ একসঙ্গে জীবন নামক এই দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে চাইলে, কখনও কখনও থমকে গিয়ে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি বা পাওয়া-না পাওয়ার হিসাব নিয়ে কিঞ্চিৎ দিশেহারা বোধ করতেই পারেন। এটি স্বাভাবিক একটি ব্যাপার। প্রায় প্রতিটা মানুষই জীবনের কোন না কোন সময়ে প্রিয় মানুষটির সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যায়। আবার এই অবস্থা থেকে বের হয়েও আসেন অনেকে। এই সমস্যা মূলত হয় তখন, যখন আপনি সম্পর্কের মাঝে নিজেকে অরক্ষিত অনুভব করতে থাকেন। এই অনুভূতিটি স্বাভাবিক হলেও, ওই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসা সবার জন্য সহজ হয়ে ওঠে না।
কেন এ ধরনের অনুভূতি হয়?
সম্পর্কে অরক্ষিত অনুভূতি থেকে বের হয়ে আসার উপায় নিয়ে বিস্তারিত জানার আগে প্রয়োজন হচ্ছে জানা, কেন এ ধরনের অনুভূতি আপনার মধ্যে কাজ করে।
-একা থাকার ভয়। অন্যদের থেকে আশ্বাস পাওয়ার তীব্র ইচ্ছা।
-নিজের প্রতি আস্থাহীনতা। ধরেই নেয়া যে, আপনি তার জন্য উপযুক্ত নন।
-অন্যদের সব সময় নিজের চেয়ে ভাল ভাবা।
-নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কথা সব সময় চেপে রাখা। কারণ, আপনি সব সময় সবাইকে একসঙ্গে খুশি রাখতে চান।
-আবেগ-অনুভূতির সঠিক প্রয়োগ সম্পর্কে অজ্ঞতা। আপনি জানেনই না কী করে নিজের অনুভূতি সুন্দর রে প্রকাশ করতে হয়।
-আত্ম-বিমুখতা। আপনি বিশ্বাস করে নিয়েছেন যে, প্রিয় মানুষটির ভালবাসা পাওয়ার যোগ্যতা আপনার নেই।
-অতীত আঁকড়ে বেঁচে থাকা। আপনি অতীতকে প্রাধান্য দিয়েও বর্তমানকে নিয়ে কীভাবে ভাল থাকা যায়, সেটা জানেন না।
যেভাবে বের হয়ে আসবেন সম্পর্কে অরক্ষিত অনুভূতি থেকে
আপনার সঙ্গীর কোন ব্যবহার বা কাজে আপনি সম্পর্কে অরক্ষিত অনুভব করছেন, এই ধরনের চিন্তা মনে দানা বাঁধার আগে আপনার জানা প্রয়োজন, এই অনুভূতিটি আসছে আপনার নিজের ভেতর থেকে, আপনার সঙ্গীর জন্য নয়। এই অরক্ষিত অনুভূতিই সম্পর্ক নষ্ট করে দিতে যথেষ্ট। তাই প্রিয় মানুষটির সঙ্গে সম্পর্ক চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়ার আগে আপনাকে নিজেই বের হয়ে আসতে হবে এই অনুভূতি থেকে। আসুন জানা যাক, কী করে সম্পর্কে অরক্ষিত অনুভূতি থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব।
মন পড়া স্বভাব বন্ধ করুন
‘ঝরষবহপব রং নবধঁঃরভঁষ, ফড়হঃ নব ংপধৎবফ ড়ভ রঃ’, কিছু কিছু সময় নীরবতা অনেক সমস্যার সমাধান নিয়ে আসে। আপনার সঙ্গী হুট করেই চুপচাপ হয়ে আছে বলেই যে সে আপনার উপর বিরক্ত বা সে নিশ্চয়ই অন্য কাউকে নিয়ে ভাবছে, অথবা আপনার সঙ্গে সে সম্পর্কে সুখী নয়- এই ধরনের চিন্তা-ভাবনাগুলো মাথায় আনবেন না। হতেই পারে, সে সারাদিনের শত ব্যস্ততার পরে একটু স্বস্তি পেয়েছে হাফ ছেড়ে নীরবে কিছুটা সময় বসার; আবার এমনটাও হতে পারে, পারিবারিক কোন ঝামেলা নিয়ে সে চিন্তিত। তাই সঙ্গীর নীরবতাকে নিজের মনমতো কিছু একটা ভেবে নিয়ে নিজেকে অবহেলিত বা এই সম্পর্ক আপনার জন্য অরক্ষিত- এই ধরনের আকাশকুসুম ভাবনা বাদ দিন। বরং এক কাপ চা নিয়ে মানুষটির পাশে বসুন, তার সারাদিন কেমন গেল বা তার কিছু চাই কিনা ইত্যাদি নিয়ে কথা বলুন। দেখবেন হয়ত মানুষটি নিজ থেকেই তার নীরবতার কারণ নিয়ে আপনাকে বলে বসবে।
নিখুঁত সম্পর্ক খোঁজার অভ্যাস ত্যাগ করুন
মনে রাখবেন পৃথিবীতে ‘আদর্শ সম্পর্ক’ বলে আদৌ কিছু নেই। দূর থেকে যা দেখা যায়, তা সব সময় সত্যি হয় না। বাইরে থেকে আপনি হয়ত কাউকে দেখে ধরেই নিলেন, তারা মহা সুখে জীবনযাপন করছেন, কিন্তু যদি কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান, দেখবেন তাদের ভেতরও কিছু না কিছু নিয়ে ঘাটতি রয়ে গেছে। আপনি অন্যকে দেখে নিজেকে বিচার করতে গেলে ভুল করবেন, কেউই নিখুঁত হয় না। সব সম্পর্কে টানাপোড়েন থাকে, কেবল অন্যরা উপর থেকে সেটা সব সময় দেখতে পায় না। তাই নিখুঁত সম্পর্কের খোঁজে শুধু শুধু জীবনের দারুণ মুহূর্তগুলো নষ্ট করবেন না, নিজের উপর ভরসা রেখে এই সময়টাতে নিজেদের সম্পর্ককে কী করে আরেকটু বর্ণিল করে তোলা যায়, সেই কাজে লাগান।
আত্মবিশ্বাস তৈরি করুন
আপনার আত্মবিশ্বাসহীনতা সম্পর্কে অরক্ষিত অনুভূতির অন্যতম কারণ। যে যা-ই বলুক, আপনি সব সময় আত্মবিশ্বাস ধরে রাখবেন। যদি কোন কিছু মনে হয় ঠিক নেই, আপনি অন্যের কথায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও সায় না দিয়ে বরং নিজের মনের কথা শুনুন। সম্পর্কের বেলায় যদি মনে হয়, আপনি আত্মসম্মান বজায় রেখে সম্পর্ক ধরে রাখতে পারছেন না, তাহলে নিজের উপর ভরসা রাখুন। আপনি ভুল সম্পর্ক থেকে বের হয়ে আবার নতুন করে সবটা শুরু করতে পারেন, এই বিশ্বাসটা অটুট রাখুন। দেখবেন, আর নিজেকে অরক্ষিত লাগছে না। মনে রাখা দরকার, আমরা কেউই নিখুঁত নই, সবার মধ্যেই কিছু না কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। সুস্থ, সুন্দর ও নিরাপদ সম্পর্কের জন্য যে আপনাকে নিখুঁত হতে হবে, এমনটা ভাবার দরকার নেই।
অতীতের সম্পর্কের সঙ্গে বর্তমান সম্পর্ক গুলিয়ে ফেলবেন না
জীবনে চলার পথে কত মানুষ আমাদের জীবনে আসে, আবার চলেও যায়। অনেকে একের অধিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন, হয়ত বা তাদের সেই সম্পর্কের অভিজ্ঞতা ভাল ছিল না। একটা কথা সব সময় মাথায় রাখবেন, অতীতের কোন সম্পর্কের সঙ্গে বর্তমান সম্পর্ক গুলিয়ে ফেলবেন না। প্রতিটা সম্পর্কই একটা আরেকটা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তাই সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে সব সময় দুয়ে দুয়ে চার মিলে যাবে, এমনটা একদম নয়। মাঝখান দিয়ে দেখা যাবে, অন্যসব কিছু ঠিক থাকলেও আপনি আর ঠিক নেই।
অতি অভিমানী মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসুন
ছোট ছোট অভিমান সম্পর্ককে মধুর করে তোলে, তবে সেটা একটা নির্ধারিত সীমা পর্যন্ত। কথায় আছে, ‘অতিরিক্ত কোন কিছুই ভাল নয়’; ঠিক একইভাবে অতিরিক্ত মান-অভিমান সম্পর্ককে মধুর না করে উল্টো তেতো করে ফেলতে বাধ্য। আপনার অতি অভিমানী মানসিকতার কারণে হয়ত একটা সময় দেখবেন, অভিমানটা হয়ত যার জন্য করেছেন, তাকে স্পর্শই করছে না। এক্ষেত্রে যা হবে, আপনি ভাববেন আপনার সঙ্গী আপনাকে আর ভালবাসেন না। প্রিয় মানুষটি আপনাকে আর ভালবাসে না, এই চিন্তাই কি যথেষ্ট নয় নিজেকে অরক্ষিত ভাবার জন্য?
আত্মনির্ভরশীল হতে শিখুন
আপনি নিজে কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে জানেন না। আপনি কী খাবেন, কোথায় যাবেন, কী পরবেন, এমনকি কার সঙ্গে কথা বলবেন- এসব কিছু নিয়েও আপনি আপনার সঙ্গীর উপর নির্ভরশীল। হ্যাঁ, হয়ত সাময়িকভাবে আপনার এই বাচ্চা বাচ্চা স্বভাব সম্পর্কের ক্ষেত্রে খানিকটা অতিরিক্ত ভালবাসার জন্ম দেবে, কিন্তু ধীরে ধীরে আপনার পরনির্ভরশীল স্বভাব নিজেকে নগণ্য আর সম্পর্কে নিজেকে নিতান্তই ক্ষুধা ভাবতে বাধ্য করবে। আর শেষমেশ আপনি সম্পর্কে নিজেকে ভীষণ অরক্ষিত অনুভব করতে শুরু করবেন।