সম্প্রদায়গত বৈষম্য দূর করতে হবে

বাংলাদেশে অর্ধশতাধিক পারিবারিক বা ব্যক্তিগত আইন প্রচলিত রয়েছে। যার অধিকাংশ আইন ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলে প্রণীত। ১৯৮৫ সালের ১৬ জুন পাঁচটি পারিবারিক বিষয় নিষ্পত্তির জন্য প্রণীত হয় পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ। একে যুগোপযোগী করে তোলার জন্য আইন কমিশন অষ্টম দ্বিবার্ষিক কর্মপরিকল্পনা ২০১৬-১৭ এর আওতায় বিদ্যমান পারিবারিক আইনগুলো যুগোপযোগীকরণ কার্যক্রম শুরু করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় কমিশন মুসলিম আইনে পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০সহ বিদ্যমান প্রায় ৩৫টি আইন পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নের কাজ হাতে নিয়েছে। সংশোধিত পারিবারিক বা ব্যক্তিগত আইন থেকে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর নারীরা কতটুকু উপকৃত হবেন। এ প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে লিখেছেন রীতা ভৌমিক

দরকার সবার জন্য একটি অভিন্ন আইন তৈরি করা : বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক
চেয়ারম্যান, জাতীয় আইন কমিশন
আমাদের দেশে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর মানুষ বাস করেন। হিন্দু আইন ১৯০০ ও মুসলিম আইন ১৯১৭ সালে প্রণীত হয়। মুসলমানদের অনেকগুলো পারিবারিক আইন রয়েছে। তার ফলে বিচারক, আইনজীবী, বিচার প্রার্থীদের দ্বিধায় পড়তে হয় কোনো আইনে বিচার পাওয়া যাবে। আইন কমিশনের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আইনের অসম্পূর্ণতার কারণে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এ জন্য দরকার সবার জন্য একটি আইন তৈরি করা। যে আইনটি আপামর জনগণ ব্যবহার করতে পারে। মানুষের জীবনধারার পরিবর্তন হয়েছে। প্রত্যেক ধর্মের মানুষ কে কি সমস্যার মুখোমুখি হন। তারা কিভাবে আইনটি দেখতে চান। এর ওপর কেস স্টাডি করতে হবে। এ ছাড়া ভারত হিন্দু আইন ১৯৫৬ সালে করেছে। মুসলিম আইন ১৯৩৭ সালে শুরু হয়েছে। এই আইনগুলো বিশ্লেষণ করে যেগুলো রাখা যায় সেই আইনগুলো রাখতে হবে। মুসলিম আইনে ৩৬টি আইন রয়েছে নারী সংক্রান্ত। একটা আইন না হলেও অল্পসংখ্যক আইনের মধ্যে আমরা আনতে পারি। খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের লোকেরা কি ভাবছেন সেদিকেও আমরা দৃষ্টি দিবো। কয়েকটা আইনের মাধ্যমে আমরা পারিবারিক আইন করার চেষ্টা করছি। পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রামের তৃণমূল পর্যায়ে যাব। তারা কি চান সেটাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রাত্যহিক ব্যবহারের আইনগুলো অভিন্ন আইনে আনা সম্ভব : সম্পদ বড়ুয়া
সচিব, রাষ্ট্রপতি কার্যালয়
একেক ধর্মের পারিবারিক আইন একেক রকম। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পারিবারিক আইন নেই। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা হিন্দু আইন ব্যবহার করে। বৌদ্ধ পারিবারিক আইন করার জন্য ১৯৮৩ সাল থেকে সেমিনারÑ আলাপ-আলোচনা হ”েছ। আলোচনায় বৌদ্ধ পারিবারিক আইনে নারীর উত্তরাধিকার, উইল, দত্তকের কথা উঠে এসেছে। আমরা বৌদ্ধ পারিবারিক আইনের ড্রাফটে বিয়ে রেজিস্ট্রেশন আইন, বিবাহ বি”েছদ, নারীর উত্তরাধিকারের অংশটা এনেছি। বিবাহ রেজিস্ট্রেশন, বিবাহ বি”েছদ অভিন্ন আইন করা যাবে। অর্থাৎ প্রাত্যহিক ব্যবহারের আইনগুলো অভিন্ন আইনে আনা সম্ভব। বৌদ্ধ পারিবারিক আইনে উইল অভিন্ন আইনে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। বৌদ্ধ ধর্মে উল্লেখ রয়েছে পরিবারের যিনি সম্পত্তির মালিক তিনি মারা যাওয়ার আগে তার সম্পত্তির উইল করতে পারবেন না। কারণ এটা আমাদের ধর্মগ্রন্থ’ ত্রিপিটকের সঙ্গে সংঘর্ষপূর্ণ।

খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা ফ্যামিলি কোডে যেতে পারবেন না : অধ্যাপক ড. শাহনাজ হুদা
আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশ সংবিধানের ২৮ (২) ধারায় বলা হয়েছে, নারী-পুরুষের মধ্যে সমঅধিকার থাকবে শুধু রাষ্ট্রীয় ও জনজীবনের ক্ষেত্রে। সংবিধানে পারিবারিক সম্পর্কে নারী-পুরুষের সমঅধিকারের কথা উল্লেখ নেই। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সামাজিকভাবে অভিন্ন পারিবারিক আইন করা সম্ভব নয়। ফ্যামিলি কোডের ৩ ধারায় অধ্যাদেশে উল্লেখ রয়েছে, কোনো খ্রিষ্টান ব্যক্তি যদি বিবাহ বি”েছদ, ভরণ-পোষণের মামলা করতে যায়, তাহলে তারা ফ্যামিলি কোডে যেতে পারবে না। তাদের হাইকোর্ট ডিভিশনে যেতে হবে। ১৮৬৯ সালের আইনেও উল্লেখ রয়েছে, তাকে জেলা কোর্টে নয়, হাইকোর্ট ডিভিশনে যেতে হবে। কোথাও ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পর্কে আইনের কথা বলা হয়নি। খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা ফ্যামিলি কোডে যেতে পারবেন না। আইন কমিশন ২০০৫ সালে উল্লেখ করেছে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ধর্মে অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়ন সম্ভব নয়। হিন্দু পারিবারিক আইন সম্পর্কে ল কমিশন ড্রাফট করেছে। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, জৈন, শিখ ধর্মের মধ্যে যদি বিয়ে হয় তাহলে ধর্ম পরিবর্তন না করেও বিয়ে করতে পারে। ১৮৭২ সালের বিশেষ বিবাহ আইনে দুই ধর্মের মধ্যে বিয়ে হলে তাদের ধর্ম ত্যাগের উল্লেখ নেই। বিশেষ আইনে উত্তরাধিকারীর সম্পত্তির ক্ষেত্রে একটা বিশেষ আইন ব্যবহার করতে পারবে। বাংলাদেশে বিশেষ আইন পরিবর্তনে কাজ করতে হবে। মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে সম্পত্তির মালিক তার এক চতুর্থাংশ সম্পত্তি উইল করতে পারবেন। বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ধর্মে তা করা যাবে না।

ধর্মভেদে নারীরা বিশেষভাবে বৈষম্যের শিকার হন : ফারজানা হোসেন
যুগ্ম বিচারক, জাতীয় আইন কমিশন
বাংলাদেশে প্রচলিত পারিবারিক বা ব্যক্তিগত আইনের অধিকাংশই অর্ধশতাব্দী বা তারও অনেককাল আগে প্রণীত। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, হিন্দু আইনে সবচেয়ে পুরনো আইন ১৮৫৬ সালের হিন্দু বিধ্বা আইন। অষ্টম দ্বি-বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা ২০১৬-১৭ এতে পারিবারিক আইন ও নীতিগুলো পর্যালোচনা করাÑ দেওয়ানি, ফৌজদারি বৈষম্যের ¯’ান চিহ্নিত করা, নারী ও পুরুষের অধিকার বৈষম্য, প্রচলিত আইনের সীমাবদ্ধতা, ধর্মভেদে নারীর অধিকারের বৈষম্য ইত্যাদি। বাংলাদেশে মুসলিম নারীদের বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার থাকলেও হিন্দু নারীদের নেই। ধর্মভেদে নারীরা বিশেষভাবে বৈষম্যের শিকার হন যা সংবিধানের ১৯(৩), ২৭ এবং ২৮ অনুচ্ছেদ এর লংঘন। এই লক্ষ্যে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে প্রাথমিক পর্যায়ে পারিবারিক আমব্রেলা ল তৈরি করা দরকার। যেখানে ধর্ম নির্বিশেষে বাংলাদেশের সব নাগরিকের পারিবারিক তথ্য বিবাহ বিচ্ছেদ, খোরপোষ, শিশুদের অভিভাবকত্ব ইত্যাদি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করা যাবে। পাশাপাশি সার্বজনীন পারিবারিক দেওয়ানি আইনের অধীনে পারিবারিক বিরোধগুলোর প্রতিকার ও নিষ্পত্তি লাভের সুযোগ হবে।

অতি স্পর্শকাতর বিষয়ের ন্যায্য বিচার পাওয়া যায় না : ফারাহ কবীর
কান্ট্রি ডিরেক্টর, একশন এইড বাংলাদেশ
নারীর অধিকার আদায়, সহিংসতার প্রতিকার এবং সুরক্ষা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আইন এবং নীতির সঙ্গে প্রত্যাশিত বাস্তবায়নের অনেক ব্যবধান রয়েছে। শুধু তাই নয়, যৌন হয়রানির মতো অতি স্পর্শকাতর বিষয়ের ন্যায্য বিচার পাওয়া যায় না শুধু উপযুক্ত আইনের অভাবে। আইনের প্রতিফলন এবং বাস্তবায়ন সংক্রান্ত ব্যবধানগুলো দূর করে সংশোধন আনয়নের ক্ষেত্রে বিশিষ্টজনদের সুপারিশ যুগোপযোগী আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখবে।