সম্প্রদায় ও সাম্প্রদায়িকতা

মাহমুদ রেজা চৌধুরী : সম্প্রদায় বলতে নির্দিষ্ট একটি জনগোষ্ঠীকে বুঝি। ধর্ম, সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি। এই সবকিছু সব সম্প্রদায়ের সামাজিক চিন্তার অন্তর্গত। আর ‘সাম্প্রদায়িক’ বলতে যেকোনো সম্প্রদায়ের নেতিবাচক কোনো চিন্তা, কোনো বৈষম্য এবং অবিচারকে বেশি বোঝায়।‌ ইংরেজিতে এর একটিকে বলে ‘কমিউনিটি’, অপরটি ‘কমিউনাল’। দুটি শব্দ শুনতে প্রায় একই রকম মনে হলেও এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য বিশাল।
সম্প্রদায় থেকে সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি হতেই পারে। তবে তার দায়ভার যতটা না কোনো সম্প্রদায়ের, তার চেয়ে বেশি রাজনীতির। সাম্প্রদায়িকতার বিষয়টা রাজনীতি থেকে বা রাজনীতির শ্রেণির স্বার্থেই ব্যবহৃত হয়। ইতিহাসে এর বহু দৃষ্টান্ত আছে।
১৯৫২ সালের আটই ফাল্গুন (২১ ফেব্রুয়ারি) দিনটা বাঙালি সম্প্রদায় ও সংস্কৃতি পাঠে নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য এবং ঐতিহাসিক দিন বা দিবস বলা যায়‌ একে। এই দিনের আন্দোলনের মূল বিষয় ছিল বাঙালি সম্প্রদায়ের একটি রাজনৈতিক মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে সঞ্চারিত। এই রাজনীতির সাথে বাঙালির জন্ম-জন্মান্তরের একটি ইতিবাচক সংস্কৃতির যোগসূত্রতা অবশ্যই আছে। সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির যৌক্তিকতা ছিল, তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের জনগোষ্ঠীর একটি ন্যায্য দাবিকে কেন্দ্র করেও। দাবিটা ছিল পাকিস্তানের জনগোষ্ঠীর অধিকাংশের মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দেওয়ার প্রশ্ন নিয়ে। এই দাবিটা ছিল সেই সময়ে আমাদের রাজনৈতিক ও সংস্কৃতির ন্যায্য অধিকারের একটি দাবি।
পরবর্তী সময়ে মেঘনা, যমুনা ও সিন্ধু নদীর নানান গতিপথের সংকীর্ণতায় এই সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক ন্যায্য দাবিটাকে প্রকারান্তরে একধরনের সাম্প্রদায়িক চিন্তা বা মতবাদ বলেও তৎকালীন ক্ষমতাসীন শাসকশ্রেণি মনে করে। তারা ‘সম্প্রদায়ের’ চিন্তাকে ‘সাম্প্রদায়িক’ করে সমাজের অভ্যন্তরে একে অন্যের প্রতি আস্থাহীনতার কৃষ্টি হিসেবে গড়ে তুলতে চেষ্টা করে। কেন করে, সেটা আরেক প্রসঙ্গ। অন্য কোনো সময় সেই আলোচনা হবে।
একটা কথা আমরা প্রায় ভুলে যাই, সম্প্রদায় নয়, সাম্প্রদায়িকতা সম্প্রদায়ের ভেতরে একধরনের ক্যানসার কিংবা কোনো কঠিন রোগের মতোই সংক্রমিত হয় খুব দ্রুত। এটাও একটা সামাজিক দূরারোগ।
আমাদের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন এবং তার বিজয় ছিল সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রভুত্বকে না মানার। প্রভু না মানার সংস্কৃতি। ২০২১ সালে এসেও দেখছি। আজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগে আমরা যে সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রভু সংস্কৃতিকে ধিক্কার দিয়েছিলাম, দুঃখজনক হলেও এটা এখন সত্য, সেই ‘প্রভু সংস্কৃতি’ এখনো সমাজ ও রাষ্ট্রে বিরাজমান। যেখানেই এই প্রভু সংস্কৃতি ও রাজনীতি বিরাজ করবে, সেখানে ‘সাম্প্রদায়িকতা’ পাখা মেলে উড়বেই।
১৯৫২ সালে আমাদের যে বিজয় ছিল সম্প্রদায়ের ইতিবাচক কল্যাণের অর্থে, কালক্রমে সেই বিজয় আজ নানা জায়গায় নানাভাবে নানান সাম্প্রদায়িকতার মোড়কে বন্দী হয়ে যাচ্ছে, বলা যায়। এটা আমাদের বায়ান্নর বিজয়ের পরাজয়।
পুরোনো দিনের মতোই এখনো আমরা অনেকে প্রশ্ন তুলি
ভাষা ও ধর্মকে আলাদা করে। দুটোকে আলাদা করতে চেষ্টা করি। তাই কেউ কেউ প্রশ্ন করেন, বাঙালিরা মুসলমান কি না অথবা মুসলমানদের ভাষা বাংলা কি না। অনেকে আবার এটাও বলি, বাঙালি মুসলমান। বাঙালি মুসলমান বলতে একটা সম্প্রদায়, আরেকটা ধর্ম। দুটো মনে হয় ভিন্ন কিছু। একটা থেকে আরেকটা বিচ্ছিন্ন করার একধরনের অপচেষ্টা। প্রকৃত অর্থে ভাষার সাথে ধর্মের কোনো বিরোধ নেই। এই বিরোধ চিন্তাটা ‘সাম্প্রদায়িক’ বা ‘কমিউনাল’ চিন্তার অংশ।
এটা অস্বীকার করা খুব কঠিন যে বাঙালি জাতির মধ্যে সম্প্রদায় চিন্তা যতটা ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে, সেই অর্থে কোনো জাতি বা সম্প্রদায়ের ‘সাম্প্রদায়িকতা’ সমাজকে বিভক্ত করে বেশি। বাঙালি জাতি দুটি প্রধান ধর্মে বিভক্ত। একটি হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ; অপরটি ইসলাম অনুসারী।‌ উভয়ের মাতৃভাষা এক। সংস্কৃতিও অনেকটা অভিন্ন। বাধা, সংঘাত বা দ্বন্দ্ব কোথায়? সেটা বাঙালির ধর্মবিশ্বাসকেন্দ্রিক না যতটা, তার চাইতে বেশি বাঙালির ধর্মচিন্তার অজ্ঞানতা, অতিরিক্ত দুর্বলতা অথবা অতিরিক্ত অবজ্ঞা বা অবিশ্বাসকে কেন্দ্র করে। অথবা বিশেষ কোনো মহলের বিশেষ কোনো নেতিবাচক চিন্তা এটা।‌ এই চিন্তাগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ মূলত মানুষের সহজাত ধর্ম ‘বিশ্বাসকে’ ব্যবহার করে নিজেদের রাজনীতি ও অর্থনীতির শ্রেণিস্বার্থকে রক্ষা করতে চেষ্টা করে। এটা আমরা ভুলে যাই, কোনো সম্প্রদায়ের ভেতরে নিজস্ব ধর্মবিশ্বাসকে অবহেলা অথবা অসম্মান করা সম্প্রদায়ের ইতিবাচক কল্যাণকে নির্দেশ করে না বরং সেটা অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করে সম্প্রদায়কেন্দ্রিক সাম্প্রদায়িকতার অপশক্তিকে। এই কথায় এটা অনেকটাই প্রমাণিত হয় যে সম্প্রদায়ের ভেতর সাম্প্রদায়িকতার উৎসটা রাজনৈতিক।
বাঙালি জাতির একটি বড় দুর্বলতা আমাদের দৃষ্টি এবং চিন্তার সংকীর্ণতার একটি দিক। ধনী-দরিদ্র, শিক্ষিত-অল্প শিক্ষিত সবার মধ্যে এই সংকীর্ণতা বেশ কাজ করে বলে মনে হয়। বাঙালি জাতির নানান অহংকারের একটি সবাই কমবেশি মনে করি, ‘আমরাই’ সব জানি। কেউ কেউ অন্য কাউকে জানার ব্যাপারে ন্যূনতম শ্রদ্ধা দেখাতেও কুণ্ঠাবোধ করি। এটাও আরেক ধরনের সাম্প্রদায়িকতা।
আমাদের অনেকের মধ্যে ‘প্রগতিশীলতা’ অর্থ সবার আগে নিজেদের ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলা। অথবা নিজের ধর্মকে অসম্মান করা। এই পথে চললে সহজেই নিজেকে ‘প্রগতিশীল’ বলে বাঙালি সমাজেও প্রতিষ্ঠা করা সহজ হয়। বাঙালি সমাজে যেকোনো ধর্মের প্রতি কোনো প্রকার বিশ্বাস বা আনুগত্যÑএটাকে একধরনের অপ্রগতিশীল চিন্তা অথবা ‘কমিউনাল’ বলেও বলা হয়। এটা আমাদের মানসিকতার সংকীর্ণতা। যুগের প্রবাহ কি না তা অবশ্য জানি না।
সাম্প্রদায়িকতার আরেকটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে, একের ওপর অন্য দল বা শ্রেণির আধিপত্য সৃষ্টি করার অসুস্থ মনস্তাত্ত্বিক অনুপ্রবেশের অপচেষ্টা বা প্রবণতা। এটা রাজনীতি ও অর্থনীতি উভয়ের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য। সাম্প্রদায়িকতা কেবল ধর্মীয় বিষয়কে কেন্দ্র করেই হয়, তা-ও নয়। রাজনীতি ও অর্থনীতিতেও হয়। তাই যেকোনো সম্প্রদায়ের সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে কেবল ধর্মকে চিহ্নিত করাটা যুক্তিসংগত নয়। কিন্তু লক্ষ করি, অন্য কোনো ক্ষেত্রে কোনো আধিপত্যবাদকে সাম্প্রদায়িক বলি না, যতটা ধর্মকেন্দ্রিক হলে সেটাকেই সাম্প্রদায়িক বলি। এটাও আমাদের চিন্তার সংকীর্ণতা।
পাক-ভারত উপমহাদেশের রাজনীতিতে অনেক সময় সম্প্রদায় ও সাম্প্রদায়িকতা তার জাতীয়তাবাদ চিন্তা-চেতনার জন্ম দিয়েছে বলেও বলা হয়। ১৯৯৪ সালে ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে সমাজগবেষক ভারতের জয়া চ্যাটার্জির একটি বই প্রকাশিত হয়। বইটির নাম ‘বেঙ্গল ডিভাইডেড’।
এই বইটা পড়ে জানতে পারি, বাংলার হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে ভয়াবহ দাঙ্গার ফলে ১৯৪৭ সালে বাংলা দ্বিতীয়বার ভাগ হয়। দ্বিতীয়বার বাংলা ভাগ নিশ্চিত হওয়ার অব্যবহিত পূর্বে একটা সংঘবদ্ধ আন্দোলন পরিচালিত হয়, যার লক্ষ্য ছিল ধর্মের ভিত্তিতে প্রদেশকে ভাগ করা। তখন থেকেই শুরু আদর্শ ও রাজনৈতিক আচরণের দিকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিভিন্ন জটিল রূপের মিশ্রণ এবং উপমহাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ভেতরকার ঐক্যকে নষ্ট করে দিয়ে সেখানে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শ্রেণিস্বার্থে সাম্প্রদায়িকতার উন্মেষ ঘটানো।
ভারতের আরেক সমাজগবেষক ও লেখক অম্লান দত্ত তার ‘বাংলাদেশ দেখে এলাম’ রচনার এক জায়গায় লেখেন : ‘বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার প্রাদুর্ভাব আমি দেখিনি। সাম্প্রদায়িক বৃদ্ধি থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে মুক্ত সাধারণ মানুষের মন। হিন্দুদের ভেতর ভয়-সংশয় যথেষ্ট আছে। কিন্তু মুসলমান সাম্প্রদায়িকতায় সে জন্য দায়ী, এমন আমার মনে হয়নি। অপরিচিতা এক হিন্দু মহিলা আমাকে নিজের পরিচয় দিলেন। তিনি বললেন, কিছুদিন আগে তার বাড়িতে ডাকাতি হয়েছে, তিনি বাংলাদেশ ত্যাগ করার কথা ভাবছেন। পশ্চিমবঙ্গেও কিন্তু ডাকাতি হয়, আমরা সে জন্য দেশত্যাগ করার কথা ভাবি না। বাংলাদেশের অস্থির অবস্থায় এসব ঘটনা বিরল নয়, হিন্দুরা অপেক্ষাকৃত দুর্বল বলেই তাদের দুর্বলতার সুযোগ নেয় দুর্বৃত্তরা। এটা দুঃখজনক, কিন্তু অধিকাংশ মুসলমানকে বিচার করা যাবে না অল্প কিছু অপরাধের আচরণ দিয়ে।’ (গ্রন্থ : সমাজ, সংস্কৃতি, স্মৃতিÑঅম্লান দত্ত, প্রকাশক, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৯৮৭, পৃষ্ঠা-৪২)
উল্লিখিত কথাটা অসাম্প্রদায়িক চিন্তার একটি দৃষ্টান্ত বলা যেতে পারে। আজকের বাংলাদেশে আমরা এই দৃষ্টান্তগুলো আমাদের দৃষ্টি ও মেধায় ধরে রাখতে পারছি না। এটা হিন্দু কিংবা মুসলমান বাঙালির সম্প্রদায়ের ব্যর্থতা নয়। এই ব্যর্থতা রাজনীতির ও অর্থনীতির। এখানে কারোর নিজেদের ‘ধর্ম’ কারণ নয়। ধর্মকে কারণ তৈরি করা হয়। এটাতে সাধারণ মানুষকে খুব দ্রুত সমাজের শাসক ও শোষকদের ‘পদতলে’ কিংবা নিজেদের ‘বগলতলায়’ আনা সম্ভব। এই শাসক ও শোষকদের আরেক ভিন্ন শ্রেণিস্বার্থে সমাজের কিছু আধা শিক্ষিত আর কিছু উচ্চশিক্ষিত শ্রেণির কেউ কেউ কোনো না কোনোভাবে একে সমর্থন জোগান। তা-ও শ্রেণি বিভাজনের রাজনীতির স্বার্থে।
আমরা মানি যে সমসাময়িক ধারা, বিশেষ করে অভিজ্ঞতাই জ্ঞানের অন্যতম একটি প্রধান উৎস। ৫২-উত্তর আমাদের বাঙালি সম্প্রদায়ের বৃহত্তর অর্থে সামাজিক, নৃতত্ত্ব, ভাষাতত্ত্ব, সাহিত্য ও সংস্কৃতির নানাবিধ মেলবন্ধনের মিশ্র নানান রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক মেরুকরণে এবং এক ধূসর চিন্তার কারণে বাঙালি সম্প্রদায়ের ভেতর সাম্প্রদায়িকতার অঙ্কুর ধীরে ধীরে বড় হয়ে এখন সেটা প্রায় বটগাছের আকার ধারণ করেছে, বলা যায়। এটা দুঃখজনক।
লেখিকা জয়া চ্যাটার্জিও ‘বেঙ্গল ডিভাইডেড’ বইটি পড়লে আরো জানতে পারি, বাংলার ক্ষেত্রে অনেকে এই ধারণাকে একটি সাধারণ সত্য বলে গ্রহণ করেন যে বাংলার মুসলমানরা সহজাতভাবে সাম্প্রদায়িক ও বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং তাদের উচ্চশ্রেণির নেতারা নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য তাদের সাম্প্রদায়িক অনুভূতিকে সহজে সংগঠিত করতে পারেন। এ প্রসঙ্গে জয়া চ্যাটার্জি আরো বলেন, বাংলায় শ্রেণি ও সম্প্রদায়ের ঘনিষ্ঠ সমান্তরাল অবস্থার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন অনেক ঐতিহাসিক। তারা বলেন, বাংলার নানা রকম সামাজিক বিরোধ, সেটা শহর কিংবা পল্লি এলাকা যেখানেই হোক না কেন, অতি দ্রুত সাম্প্রদায়িকতার মাত্রা পরিগ্রহ করে বা করতে পারে।
তবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে, সাম্প্রদায়িকতার এই প্রক্রিয়ার শিকড় মুসলিম সমাজের মধ্যে নিহিত আছে বলে ধরে নেওয়া হলেও মুসলমান কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ জনগণকে সেভাবে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে দেখা যায় না, যতটা দেখা যায় বাঙালি রাজনৈতিক শ্রেণিগোষ্ঠীর এ ব্যাপারে অতিরিক্ত আগ্রহ প্রকাশ করার অপচেষ্টাকে। সমানভাবে এটাও সত্য, হিন্দু বাঙালিদের মধ্যেও এ রকম অসহিষ্ণুতা ও সাম্প্রদায়িকতার চিন্তার ইতিহাসটাও সীমিত নয়। এই দুয়ের কারণ দুই সম্প্রদায়ের নিজ নিজ ধর্মীয় কারণ না যতটা, তার চাইতেও বড় রাজনৈতিক হিংসা, প্রতিহিংসা এবং ক্ষমতার শ্রেণি বিভাজনের বৈষম্য। উৎপাদন সম্পর্কের বৈষম্য। অর্থনীতির অসম প্রতিযোগিতা। এই সবকিছু আমাদের রাজনীতি ও অর্থনীতির অবকাঠামোতে বিরাজমান আছে বলেই সেখানে সাম্প্রদায়িকতা একধরনের অক্সিজেন পায়।
এ থেকেও প্রমাণিত হয়, বাংলায় সাম্প্রদায়িকতা মূলত এই সমাজের নির্দিষ্ট শ্রেণির অবকাঠামো এবং স্বার্থের পক্ষে একটি বিশেষ সম্প্রদায় বা গোষ্ঠী, যার অথবা যাদের প্রধান একটি লক্ষ্য সমাজে বৈষম্যকে বজায় রাখা এবং ব্যক্তি বা দলীয় আধিপত্যবাদকে প্রতিষ্ঠা করা। কখনো সেটা অগ্রাধিকার পায় তথাকথিত দেশের কল্যাণের নামে, কখনো ধর্মের নামে, কখনো-বা গণতন্ত্রের নামে।
এটা কিন্তু আজকে ভারতেও দেখছি। আজকের ভারতের রাজনীতিতে, বিশেষ করে আজকের ভারতের শাসকশ্রেণির যে রাজনীতি, সেখানেও ভারতের বৃহত্তর জাতি ‘সম্প্রদায়ের’ ভূমিকাকে ‘সাম্প্রদায়িক’ করে গড়ে তোলার চেষ্টা কিন্তু অব্যাহত আছে।
আজকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর বিভিন্ন জনগোষ্ঠী এবং সম্প্রদায়ের মধ্যে যে বিভেদের গভীরতা লক্ষ করা যাচ্ছে, এর পেছনেও আছে ‘সাম্প্রদায়িকতার’ মনোভাব, যা নেই সেটা সম্প্রদায়ের ‘ইনক্লুসিভ’ কোনো চিন্তাশীল সংস্কৃতির চর্চা। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতেও সাম্প্রদায়িকতা এখন ধীরে ধীরে তার উগ্রমূর্তি ধারণ করছে। সেই উগ্রবাদিতার অন্য অর্থে সাম্প্রদায়িকতার উলঙ্গ প্রকাশ ঘটে ৬ জানুয়ারি ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে। এই সাম্প্রদায়িকতার কারণও কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতি।
মধ্যপ্রাচ্যেও একই রকম কৃষ্টির চর্চাই চলছে। মধ্যপ্রাচ্যে যে অশান্তি দীর্ঘদিন থেকে আছে, সেখানে একটি বিশেষ জনগোষ্ঠী সংখ্যায় বড় হলেও তাদের ভেতরে যে শ্রেণিস্বার্থের রাজনীতি কাজ করছে, এর পেছনেও কোনো ইনক্লুসিভ চিন্তা কিংবা কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের সার্বিক কল্যাণের চিন্তা নেই। যা আছে সেটাও হলো রাজনৈতিক সাম্প্রদায়িকতার। সৌদি আরবের রাজতন্ত্র এই সাম্প্রদায়িকতার আরেকটি বড় দৃষ্টান্ত।
আমরা যদি আমাদের চিন্তার সংস্কৃতিতে ‘সম্প্রদায়’কে প্রাধান্য না দিয়ে যদি ‘সাম্প্রদায়িকতাকে’ ‘আধুনিকতা’ বলে মনে করি, সেখানে আমাদের অকল্যাণ ছাড়া বড় কোনো কল্যাণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না। সে কারণে সম্প্রদায় ও সাম্প্রদায়িকতা এই দুটি বিষয় যে সম্পূর্ণ আলাদা, এটা আমাদের চিন্তা করা জরুরি এখন আমাদের যাপিত জীবনের প্রতিটি স্তরে। এই দুটির কোনটাকে আমরা গুরুত্ব দেব, অগ্রাধিকার দেব আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ বৃহত্তর কল্যাণের প্রয়োজনে, এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার সময় এখন।
এ ক্ষেত্রে আমাদের বায়ান্নর রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক স্বাধিকার আন্দোলন একটি উৎসাহ হতে পারে। ১৯৫২ সালে আমাদের মাতৃভাষার আন্দোলন ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক চিন্তা এবং কল্যাণের চিন্তাধারায় অনুপ্রাণিত। কোনো ধরনের ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ দ্বারা পরিচালিত নয়। বাংলা আমার মাতৃভাষা। তখনকার পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার যৌক্তিক আন্দোলন এবং দাবিটাও ছিল আমাদের তৎকালীন রাজনৈতিক একটি ন্যায় ও আদর্শিক লড়াই।
একুশ শতকের বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমরা নিজেদের সম্প্রদায়ের কী এবং কোন কোন ইনক্লুসিভ চিন্তাকে আমাদের সার্বিক কল্যাণে অগ্রাধিকারে রাখব। এটা আমাদের সবার প্রধান চিন্তা হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বিগত কয়েক বছর থেকে লক্ষ করছি, এ বিষয়ে আমাদের চিন্তাকে অগ্রসর করার চাইতে বেশি কাজ করছে নিজেদের ভেতর একধরনের সাম্প্রদায়িকতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ক্ষমতা এবং ব্যক্তি বা দলের আধিপত্যবাদকে প্রতিষ্ঠা করার সামন্ততান্ত্রিক চেষ্টা। এ ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরোধিতা করা ছিল বায়ান্ন সালে আমাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বকে প্রতিষ্ঠা করার লড়াইয়ের অন্যতম একটি লক্ষ্য। এর পেছনে অন্য আর কোনো ‘সাম্প্রদায়িক’ চিন্তা ছিল না।
আজকের বাংলাদেশে আমাদের সাম্প্রদায়িকতার কোনো চিন্তাভাবনাকে যেন নিজের অজান্তেও প্রশ্রয় না দিই। এতে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের কল্যাণের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বেশি। আধুনিকতা বলি বা প্রগতিশীলতা বলি, উভয় চিন্তাতেই সম্প্রদায় কথাটা যতটা ইতিবাচক ও যৌক্তিক এবং সভ্যতার ন্যায়বোধকে জাগ্রত করে সাম্প্রদায়িকতা সেভাবে করে না এবং করবেও না, সেটা যে ধরনের সাম্প্রদায়িকতাই হোক না কেন।
‘সম্প্রদায়ের’ কল্যাণ মানে নয় ‘সাম্প্রদায়িক’ হওয়া। আর সাম্প্রদায়িকতার কারণে কেবল নিজের ‘ধর্ম’বিশ্বাস বা চিন্তাকে শ্রেণিগত স্বার্থে অগ্রাধিকার দিয়ে বিপরীত কোনো ধর্মকে উপেক্ষা করা, অবজ্ঞা করা অন্যায় এবং অপরাধমূলক কাজ। পাশাপাশি এটাও আমাদের মনে রাখতে হবে, সাম্প্রদায়িকতা কেবল ধর্মকেন্দ্রিক হতে পারে না। সাম্প্রদায়িকতার মূল শক্তি কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্রের অপরাজনীতি। পৃথিবীর বুকে আমরা অবশ্যই একটি সম্প্রদায়। বাঙালি সম্প্রদায়। আমাদের বাঙালিদের ধর্ম ভিন্ন হতেই পারে। সেটা সাম্প্রদায়িকতা নয়। কিন্তু সেই ধর্মের বিভিন্ন ভুল ব্যাখ্যা অথবা বিবেচনাকে নিয়ে যখন আমরা কুবিতর্ক এবং রাজনীতি করা শুরু করি, তখন সেটা ‘সাম্প্রদায়িক’ হয়ে যেতেও পারে। আধুনিক বাংলাদেশে এটা কাম্য নয়।
বায়ান্নর ৮ই ফাল্গুন আমাদের জাতীয় অসাম্প্রদায়িক চিন্তার ফসল। আমাদের আগামী বাংলাদেশের সুবিকাশে এবং সুবিনির্মাণে এই দর্শন বা দেখাটাকে আমাদের সামনে অগ্রসর হওয়ার অন্যতম সহায়ক করে নিতে হবে। ২০২১ সালের বাংলাদেশে এবং আগামী বাংলাদেশ এটা যেন আমাদের সকল বাঙালির চেতনায় নাড়া দিতে পারে।
সবশেষে স্মরণ করছি লেখক আহমেদ ছফার একটি প্রবন্ধে উল্লেখিত বাংলার অজানা এক লোককবির অমর একটি কবিতার কয়েকটি লাইন, যা আমাদের ‘সম্প্রদায়’ চিন্তা থেকে ‘সাম্প্রদায়িকতাকে’ দূরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
‘মানুষের মান দাও
মানুষের গান গাও
মানুষ সবার সেরা
মানুষ ঈশ্বর ঘেরা
এ সংসারে।’
লেখক : সমাজ ও রাষ্ট্র বিশ্লেষক, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২১