সম্মিলিত প্রয়াসে জ্বলবে ফুটবলের আলো

ইকরামউজ্জমান : বর্তমান সরকারের বিগত ১০ বছরে ক্রীড়াঙ্গনে নারী খেলোয়াড় ও ক্রীড়াবিদদের উত্থান, সাফল্য, আশাসঞ্চারী ও গৌরবোজ্জ¦ল। সমাজে পিছিয়ে থাকা পরিবেশের মধ্যে থেকে, বিভিন্ন ধরনের প্রতিক‚লতার বিরুদ্ধে লড়াই করে নারীরা যেভাবে সাফল্য প্রদর্শন করে ক্রীড়াঙ্গনকে মহিমান্বিত করেছে, আন্তর্জাতিক চত্বরে দেশকে তুলে ধরেছে এটা সত্যি অনন্য। নারীরা ক্রীড়াঙ্গনে নতুন বিপ্লব ঘটিয়েছে। ইতিহাসের ধারা পাল্টে দিয়েছে। ক্রীড়াঙ্গনের দৃষ্টিভঙ্গি, মন ও মানসিকতায় এনেছে পরিবর্তন। নারীরা প্রমাণ করেছে সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো ক্রীড়াঙ্গনেও তারা পিছিয়ে নেই। ফুটবল, ক্রিকেট, সাঁতার, কাবাডি, শ্যুটিং, আর্চারি, অ্যাথলেটিক্স, ভারোত্তোলন, হ্যান্ডবল, উশু, দাবা ও অন্যান্য খেলায় দেশের বাইরে দলগত ও ব্যক্তিগতভাবে যেভাবে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে নারীরা আলো ছড়িয়েছে, এটা শুধু সচেতন মহলের নজর কাড়েনি, প্রশংসিতও হয়েছে।

যে সরকার গত ১০ বছর দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিল, তারাই আবার নতুন করে নির্বাচনের মাধ্যমে জয়ী হয়ে তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করেছে সর্বক্ষেত্রে অগ্রগতি ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার প্রতিশ্রæতি দিয়ে। এই নিবন্ধে শুধু নারী ফুটবল নিয়ে সংক্ষেপে আলোকপাত করছি। কারণ হলো সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন কিছু নির্দিষ্ট পদক্ষেপ ও চিন্তার কথা জানিয়েছে, যেটা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট। দেশের বৃহৎ ফুটবল ক্যানভাসে নারী ফুটবলকে এখনই গুরুত্ব দেওয়ার সময়। বাস্তবতার আলোকে নারী ফুটবলকে শুধু অগ্রগণ্যতা নয়, একটি সৃষ্টি প্রক্রিয়ায় এ ক্ষেত্রে প্রতিভা ও সম্ভাবনার বারুদগুলো জ্বালিয়ে দিতে পারলে দেশের ফুটবলে যে নতুন একটি অধ্যায়ের জন্ম হয়েছে, সেটি টেকসই হবে। কয়েক বছর ধরে নারী ফুটবলের অগ্রযাত্রা ধরে রাখার জন্য বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন দীর্ঘমেয়াদি আবাসিক ক্যাম্প পরিচালনার মাধ্যমে যেভাবে কাজ করেছে এর অর্থবহ ফল আমরা পেয়েছি। এটা কিন্তু ফুটবল ফেডারেশনের একার কাজ নয়, তা সত্তে¡ও ফুটবলের স্বার্থে এটা করেছে এবং তাদের কার্যক্রম এখনো অব্যাহত আছে ও থাকবে। মেয়েদের ফুটবল অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। বয়সভিত্তিক ফুটবলে সাফল্য আর জাতীয় দলের সাফল্যের মধ্যে আছে অনেক ফারাক। গত বছর মিয়ানমারে অলিম্পিক বাছাইয়ে এটা বোঝা গেছে।

পাশাপাশি ক্রীড়া উৎসাহী দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারী ফুটবলারদের উৎসাহিত এবং এ ক্ষেত্রে তাঁরা যাতে খেলে দেশের ফুটবলে আশানুরূপ ভ‚মিকা পালন করতে পারেন, এর জন্য প্রথম থেকেই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে নারী ফুটবলাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ভালো ফলাফলের জন্য পুরস্কার হিসেবে আর্থিক অনুদান এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দিয়েছেন। আমরা সবাই জানি, সমাজের কোন পর্যায় থেকে নারী ফুটবলাররা উঠে এসে ফুটবল খেলছেন দেশের জন্য। তাঁদের জন্য আর্থিক পুরস্কার সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই তো গত ২৪ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বছর অক্টোবরে ভুটানে সাফ অনূর্ধ্ব-১৮ নারী ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য ফুটবলার ও কর্মকর্তাদের আর্থিক অনুদান দিয়েছেন যথাক্রমে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা করে। এর আগে গত বছর অক্টোবরে ১৯ জন ফুটবলার ছাড়াও অফিশিয়ালদেরও পুরস্কার দিয়েছেন। আমরা মনে করি, ফুটবল ফেডারেশনের একক উদ্যোগ এবং প্রধানমন্ত্রীর সর্বাত্মক উৎসাহ নারী ফুটবলে সমস্যার সমাধান নয়। এটা নারী ফুটবলকে বাঁচিয়ে রেখেছে, পাশাপাশি চেষ্টা চলছে এই ফুটবলের ট্রেনকে লাইনে তোলার জন্য।

আমরা আনন্দিত, ঢাকা ব্যাংক পাঁচ বছরের জন্য এগিয়ে এসেছে নারীদের ফুটবলে সহযোগিতা করার জন্য। এগিয়ে এসেছে ইউনিসেফ। তারা চ্যারিটি পার্টনার হিসেবে দুই বছরের জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে। আশা করব, সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচির আওতায় এ ক্ষেত্রে আরো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং বড় করপোরেট হাউসগুলো এগিয়ে আসবে।

নারী ফুটবলের সূতিকাগার হলো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেয়েদের নিয়ে দেশজুড়ে বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্ট। একটি পর্যায়ে মেয়েরা আর এই ফুটবল খেলার সুযোগ পায় না। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় গত বছর থেকে ছেলেদের বঙ্গবন্ধু ফুটবল টুর্নামেন্টে যাতে প্রাইমারি লেভেলের পর, এই ছেলেরাই পরবর্তী সময়ে আবার খেলতে পারে এ জন্য শুরু করেছে বঙ্গবন্ধু অনূর্ধ্ব-১৭ ফুটবল টুর্নামেন্ট। মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, চলতি বছর থেকে (২০১৯) মেয়েদের জন্য বঙ্গমাতা অনূর্ধ্ব-১৭ ফুটবলের আয়োজন হবে দেশজুড়ে। আশা করব, নতুন সরকারের যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন।

গেল মাসের প্রথম সপ্তাহে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন বলেছেন, ছেলেদের জন্য আমরা বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক গোল্ডকাপ আয়োজন করি, এই বছর থেকে আমরা মেয়েদের জন্য (এপ্রিল মাসে ২০১৯) আন্তর্জাতিক (অনূর্ধ্ব-১৯) ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করব ঢাকায়। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবুজসংকেত দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন কাজী সালাউদ্দিন। বাফুফে সভাপতি আরো জানিয়েছেন, প্রথমবারের মতো বঙ্গমাতা আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার জন্য প্রাথমিকভাবে ১০টি দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। এরই মধ্যে ফুটবল ফেডারেশন বঙ্গমাতা অনূর্ধ্ব-১৯ আন্তর্জাতিক মহিলা ফুটবল টুর্নামেন্টের স্বত্ব কেনা ‘কে স্পোর্টসের’ সঙ্গে চুক্তির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছে। আমরা আশা করছি, সর্বমহলের সহযোগিতায় বঙ্গমাতা অনূর্ধ্ব-১৯ আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্ট যথাসময়ে অর্থবহ হিসেবে অনুষ্ঠিত হবে। দেশের নারী ফুটবলারদের জন্য এটা অনেক বড় সুযোগ। সুযোগ অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে নিজেকে তুলে ধরার।

এদিকে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন আবাসিক ক্যাম্পে থাকা ৫২ নারী ফুটবলারের মধ্যে ৩৬ জনের সঙ্গে এক বছরের চুক্তি করেছে। এই চুক্তির আগে নারী খেলোয়াড়দের অভিভাবকদের সঙ্গে এই চুক্তির বিষয়ে আলোচনা করেছেন বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন। এ, বি ও সি ক্যাটাগরিতে ৩৬ জন মাসিক বেতন পাবেন ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। নারী খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে কারো বেতন এই সময়ের মধ্যে বাড়তে পারে, আবার কমতেও পারে। ফেডারেশনের এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়।

ফুটবলসংশ্লিষ্ট সব সংগঠক, ক্লাব ও সংস্থার সবাইকে বুঝতে হবে নিজেদের মধ্যে অনৈক্য, আত্মকলহ, বিভাজন দেশের ফুটবলের অগ্রযাত্রার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়। ফুটবলে প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োজন সম্মিলিত প্রয়াস। ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ¦, হিংসা, বিদ্বেষ, পছন্দ-অপছন্দ, পরশ্রীকাতরতা দেশের ফুটবলকে অক্টোপাসের মতো আঁকড়ে ধরে আছে। যেখানে মাঠের ফুটবল বিবর্ণ, সেখানে ‘অর্গানাইজেশন’ ঘিরে ক্ষমতার লড়াই তো অর্থহীন।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক।