সহাবস্থানই বড় চ্যালেঞ্জ: সিদ্ধান্তহীনতায় ছাত্রদল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন

রাজধানী ডেস্ক : সব ছাত্র সংগঠনের সহাবস্থান নিশ্চিত করাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল ছাত্র সংসদ নির্বাচনের প্রধান চ্যালেঞ্জ। আগামী ১১ মার্চ অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ডাকসু নির্বাচনের জন্য এখনো ক্যাম্পাসে সহাবস্থান নিশ্চিত হয়নি বলে দাবি ছাত্রলীগ ছাড়া অন্যান্য ছাত্র সংগঠন ও কোটা আন্দোলনের নেতাদের। অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে ‘ক্যাম্পাসে সহাবস্থান আছে। কোথাও যদি কোনো ধরনের ব্যত্যয় ঘটে, তবে সকলের সহযোগিতায় সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে।’

ডাকসু নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতিপূর্বে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে ছাত্র সংগঠনগুলোর যতগুলো সভা হয়েছে সবগুলোতেই প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল সহাবস্থান নিশ্চিত করা। ছাত্রদলসহ বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলো ক্যাম্পাসে এখনো অবাধে ক্লাস-পরীক্ষা দিতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেছেন। অন্য দিকে ছাত্রলীগের দাবি ক্যাম্পাসে সহাবস্থান আছে। সবাই স্বাভাবিকভাবে ক্যাম্পাসে চলাফেরা করছে। ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।

গত ২৮ জানুয়ারি দুপুরে ডাকসু নির্বাচনের জন্য গঠিত আচরণবিধি প্রণয়ন কমিটির আহŸায়ক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. নাসরীন আহমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতারা। এসময় তারা পাঁচটি দাবি করেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ ক্যাম্পাসে সহাবস্থান নিশ্চিত করে সব শিক্ষার্থী যাতে নির্বিঘেœ ক্যাম্পাসে চলাফেরা করতে পারে; কোনো রাজনৈতিক সংগঠন যাতে ক্যাম্পাসে সবার সহাবস্থানে কোনো প্রকার বাধা সৃষ্টি না করতে পারে; সম্প্রতি যারা শিক্ষক; শিক্ষার্থীদের ওপর বিভিন্নভাবে হামলা চালিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং হলে আবাসিক শিক্ষার্থীরা যাতে কোনো প্রকারের নির্যাতন বা ভয়ভীতির সম্মুখীন না হয় তা নিশ্চিত করা এবং নির্বাচন সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং সুষ্ঠু করার লক্ষ্যে তফসিল ঘোষণার আগেই ক্যাম্পাসে নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করা।

এ দিকে ডাকসু নির্বাচনের দিনক্ষণ চ‚ড়ান্ত হওয়ার পর থেকে ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক নিজেদের তৎপরতা বাড়িয়েছে ছাত্র সংগঠনগুলো। মধুর ক্যান্টিনে নিয়মিত সময় দিচ্ছে ছাত্রলীগ। ক্যাম্পাসে শোডাউন করছেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। বাম ধারার ছাত্র সংগঠনগুলো নিয়মিত মধুর ক্যান্টিনে হাজির থাকছেন। বারবার নিজেরা বসছেন ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিলে তার করণীয় নিয়ে। বিভিন্ন ইস্যুতে ক্যাম্পাসে মিছিল মিটিংও অব্যাহত রাখছেন তারা। অন্য দিকে ছাত্রলীগ ও বামসমর্থিত ছাত্র সংগঠনের যখন দৃশ্যমান তৎপরতা তখন অনেকটা ভেতরে থেকে ডাকসু নির্বাচন নিয়ে কাজ করছে ছাত্রদল ও কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের প্ল্যাটফরম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। মধুর ক্যান্টিন তো নয়ই, ক্যাম্পাসের আশপাশে ঘেঁষতে পারছে না ছাত্রদল। মাঝে মধ্যে টিএসসিকেন্দ্রিক দেখা মেলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের। স্বল্পসময় থেকে অবস্থান পরিবর্তন করছে তারা। এ ছাড়াও সংগঠনটির নেতাকর্মীরা নির্বিঘেœ ক্লাস-পরীক্ষায়ও অংশ নিতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেছেন। একই অবস্থা কোটা আন্দোলনের নেতাদের। মাঝে মধ্যে ক্যাম্পাসে এলেও তাড়াতাড়ি সরতে হচ্ছে। টিএসসিকেন্দ্রিক তাদের তৎপরতা বেশি। সর্বশেষ গত ২৪ জানুয়ারি বাংলা একাডেমিতে কোটা আন্দোলনের নেতা নুরুল হক নুরুসহ কয়েকজন নেতাকে অবরুদ্ধ করার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। যদিও ছাত্রলীগ সে অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ক্যাম্পাসে সহাবস্থান নেই বলে অভিযোগ করেন ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের পরিবেশ এখনো  তৈরি হয়নি। আমরা বারবার বলার পরও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছেন। আমাদের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে যেতে পারছেন না। তারা বাধা পাচ্ছেন। নির্বাচনের জন্য প্রধান যে শর্ত সহাবস্থান, সেটি নিশ্চিত না হলে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান হবে না।’

উল্লেখ্য, দীর্ঘ ২৮ বছর পর আগামী ১১ মার্চ জাতীয় নেতৃত্ব তৈরির কারখানা বলে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। গত ২৩ জানুয়ারি নির্বাচনের দিনক্ষণ চ‚ড়ান্ত করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। ২০১২ সালে ২৫ সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীর রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর ছয় মাসের মধ্যে ডাকসু নির্বাচন দেয়ার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন আদালত। এরপর রায়ের পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আপিল করলে রায় স্থগিত ও চ‚ড়ান্তভাবে প্রধান বিচারপতি ডাকসু নির্বাচনের নির্দেশ দিলে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। বিভিন্ন সময় ডাকসু নির্বাচনের জন্য সাধারণ শিক্ষার্থী ও বামসমর্থিত ছাত্র সংগঠনগুলো আন্দোলন করলেও আলোর মুখ দেখেনি। তবে ২০১৭ সালের নভেম্বরে ওয়ালিদ আশরাফ নামে সান্ধ্য কোর্সের এক শিক্ষার্থীর আন্দোলন ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। কর্তৃপক্ষও ডাকসু নির্বাচনের দৃশ্যমান পদক্ষেপ হাতে নেয়।

ইতোমধ্যে নির্বাচনকে সামনে রেখে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ হাতে নিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। দুই দফায় পরিবেশ পরিষদের অন্তর্ভুক্ত ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেছেন ভিসি। নিয়োগ দেয়া হয়েছে প্রধান নির্বাচনী রিটার্নিং অফিসারসহ ছয় রিটার্নিং অফিসারকে। গঠন করা হয়েছে ১৫ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদ ও সাত সদস্যের আচরণবিধি প্রণয়ন কমিটি। আচরণবিধি প্রণয়ন কমিটি খসড়া একটি আচরণবিধি প্রণয়ন করেছে। ১৪টি ধারায় বিভক্ত আচরণবিধিটি গত ২৫ জানুয়ারি ছাত্র সংগঠনগুলোর কাছে পাঠানোও হয়, যাতে আপত্তির বিষয়ে জানানো হয়।

সিদ্ধান্তহীনতায় ছাত্রদল

দিন-তারিখ ঘোষণার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের তৎপরতা চলছে জোরেশোরে। আগামী ১১ মার্চ অনুষ্ঠেয় এ নির্বাচনের ভোটার তালিকা প্রণয়ন, প্রধান ও অন্যান্য রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ, নির্বাচনী আচরণবিধির খসড়া প্রণয়নসহ সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ২৯ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের সভায় ডাকসুর গঠনতন্ত্র সংশোধনী ও নির্বাচনী আচরণবিধি চ‚ড়ান্ত হবে। দীর্ঘ ২৮ বছর পর ডাকসু নির্বাচন আয়োজন নিয়ে জমজমাট এখন ক্যাম্পাস। কিন্তু ডাকসু নির্বাচন ইস্যুতে এখনও কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি ছাত্রদল।

কয়েকদিন আগে ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভিসির আমন্ত্রণে ক্যাম্পাসে গিয়েছিলেন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান। সেখানে ভিসির সঙ্গে সকল ছাত্রসংগঠন ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলের প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি। পরে তার সঙ্গে কোলাকুলি করেছেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানী।

এ দৃশ্য সকল রাজনৈতিক সংগঠনের সহাবস্থানের একটি দৃশ্য হলেও ছাত্রদল নেতারা বলছেন, সেটা ছিল ক্ষণিকের। বাস্তবে ক্যাম্পাসে সকল ছাত্রসংগঠনের সহাবস্থানের ন্যূনতম পরিবেশ নেই। সে পরিবেশ তৈরিতে কোনো আন্তরিক উদ্যোগও নেই ছাত্রলীগের। এমন পরিস্থিতিতে, ডাকসু নির্বাচন ইস্যুতে এখনও সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি ছাত্রদল। তবে এ ইস্যুতে ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক কয়েকদফা বৈঠক করেছেন নেতারা। সংগঠনের একাংশ নির্বাচনে অংশগ্রহণের পক্ষে এবং অন্য অংশটি বিপক্ষে তাদের যুক্তিতর্ক তুলে ধরেছেন দলীয় ফোরামে। যারা বিপক্ষে তারা গত ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের উদাহরণ টেনে আনছেন। অন্য দিকে যারা অংশগ্রহণের পক্ষে তারা বলছেন, পরিবেশ ও ফলাফল যাই হোক নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের রাজনীতিকে নতুন করে বিকশিত করার সুযোগটি হাতছাড়া করা ঠিক হবে না।