সাংবাদিক থেকে তারকা এবং তারকা থেকে সাংবাদিক হয়েছেন যারা

কেউ অভিনয় করে মুগ্ধতা ছড়িয়ে যাচ্ছেন আবার কেউ গান গেয়ে মন ভরাচ্ছেন। তারা আমাদের প্রিয় তারা। মজার ব্যাপার হলো এই মানুষগুলোর আরও একটি পরিচয় আছে। কোনো না কোনো কারণে তারা সাংবাদিকতার সঙ্গেও জড়িয়েছেন। কেউ সাংবাদিকতার সূত্রে শোবিজে এসেছেন, কেউ আবার তারকাখ্যাতির খাতিরে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এমন তারকাদের অনুসন্ধান করতে গিয়ে তালিকায় দেখা গেল অনেক জনপ্রিয় নামের ভিড়। আর সংখ্যাটাও কম নয়। এমনই বেশ কজন তারকাকে নিয়ে সাজানো হয়েছে এই প্রতিবেদন-

ফেরদৌস : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ে পড়াশুনা করেছেন ফেরদৌস। আনন্দ আলো ম্যাগাজিনেও সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই মডেলিং ও অভিনয়ের প্রতি টান ছিল তার। সেই টান থেকেই তিনি হয়ে উঠেছেন আজকের নায়ক ফেরদৌস।
তার চলচ্চিত্রে আগমন ঘটে প্রয়াত নৃত্য পরিচালক আমির হোসেন বাবুর হাত ধরে। তখন আমির হোসেন বাবু পরিচালক হিসেবে নাচভিত্তিক একটি চলচ্চিত্র ‘নাচ ময়ূরী নাচ’ নির্মাণের পরিকল্পনা করছিলেন। কিন্তু আমির হোসেন বাবু সেই ছবির কাজ আর শুরু করতে পারেননি। তাই ফেরদৌস অভিনীত মুক্তি পাওয়া প্রথম চলচ্চিত্র প্রয়াত নায়ক সালমান শাহের অসমাপ্ত কাজ ‘বুকের ভিতর আগুন’। এটির পরিচালক ছিলেন ছটকু আহমেদ।

মৌসুমী : প্রিয়দর্শিনী অভিনেত্রী মৌসুমী। ঢাকাই সিনেমা তিনি মাতিয়ে রেখেছেন সৌন্দর্য আর অভিনয়ে। ৩ নভেম্বর ছিল তার জন্মদিন। এই দিনে একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের সম্পাদক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন তিনি। নিউজ পোর্টালটির নাম ‘ইয়েসনিউজবিডিডটকম’।
এখানে কেবলমাত্র শোবিজের খবর পাওয়া যাবে। মৌসুমী বলেন, ‘সাংবাদিকতার প্রতি অনেক আগে থেকেই আগ্রহ ছিল। পেশাজীবনে অনেক সাংবাদিকের সঙ্গে মিশেছি। সেই জন্য এই পেশার প্রতি ভালো লাগা আরও বেশি। আশা করি অভিনয়ের মতো সাংবাদিক ক্যারিয়ারেও সবাইকে পাশে পাবো।’
মৌসুমী বেশ কয়েক বছর আগে জনপ্রিয় ম্যাগাজিন ‘প্রিয়জন’-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

শবনম বুবলী : অনার্স পড়েছেন ইকোনোমিক্সে। এরপর মার্কেটিংয়ে এমবিএ। টেলিভিশনে অন্যদের খবর পড়া দেখতে দেখতেই এই পেশার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয় তার। বুবলীর বোনও নিউজ প্রেজেন্টার ছিলেন। তাকে দেখেই অনুপ্রাণিত হন বুবলী।
অনার্স সেকেন্ড ইয়ার পার হওয়ার পরেই নিউজ প্রেজেন্টের উপর কোর্স করেন। এরপর বাংলাভিশনে সংবাদপাঠিকা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। বেশ সফলতার সঙ্গেই চলছিল তার এই পেশা।
এরই মধ্যে শাকিব খানের সঙ্গে অভিনয় করার সুযোগ পান। তার পরের গল্পটা সবার জানা। এখন নায়িকা হিসেবেই সবাই চেনেনে তাকে।

ইলিয়াস কাঞ্চন : বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যবসা সফল ‘বেদের মেয়ে জোছনা’ সিনেমার নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। অংখ্য জনপ্রিয় সিনেমা উপহার দিয়েছেন তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি সমাজসেবক হিসেবেও তিনি খ্যাতিমান।
২৫ বছর ধরে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন করে আসছেন। পেয়েছেন একুশে পদক। আরও একটা পরিচয় আছে তারা। নিরাপদ নিউজ নামের একটি অনলাইন নিউপোর্টালের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

তাজিন আহমেদ : গত ২২ মে বিকেল ৪টা ৩৪ মিনিটে তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান একসময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী তাজিন। অভিনেত্রী হিসেবেই সবাই চেনেন তাকে। বিটিভির স্বর্ণালী সময়ে টিভি নাটকে অভিনয় করে দর্শকের কাছে প্রিয় হয়ে ওঠেন তাজিন আহমেদ।
রেডিও এবং টেলিভিশনে উপস্থাপনাও করতেন তাজিন। লেখালেখিও করতেন তিনি। তাজিনের লেখা ও পরিচালনায় তৈরি হয় ‘যাতক’ ও ‘যোগফল’ নামে দুটি নাটক। তার লেখা উল্লেখযোগ্য নাটকগুলো হচ্ছে- ‘বৃদ্ধাশ্রম’, ‘অনুর এক দিন’, ‘এক আকাশের তারা’, ‘হুম’, ‘সম্পর্ক’ ইত্যাদি।
তবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন তিনি সাংবাদিক হিসেবে। তাজিন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর করে ভোরের কাগজের সাংবাদিক হিসেবে যোগ দেন। এরপর প্রথম আলোসহ বিভিন্ন পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেছেন। আনন্দ ভুবন ম্যাগাজিনের কলামিস্টও ছিলেন তিনি।

আসাদুজ্জামান নূর : অভিনেতা, আবৃত্তিশিল্পী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, মন্ত্রী- অনেক পরিচয়ে মহিমান্বিত একটি নাম আসাদুজ্জামান নূর। তিনি নব্বই দশকের শুরুতে হুমায়ূন আহমেদের ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকে ‘বাকের ভাই’ চরিত্রে অভিনয় করে জনপ্রিয়তা পান।
তবে হয়তো অনেকেই জানেন না একজন সাংবাদিক হিসেবেই নিজের কর্মজীবন শুরু করেছিলেন আসাদুজ্জামান নূর। তিনি ১৯৭২ সালে বহুল প্রচারিত সাপ্তাহিক চিত্রালীতে কাজ করার মধ্যদিয়ে কর্মে প্রবেশ করেন।

সঞ্জীব চৌধুরী : কথা প্রধান গান, আর গানে গানের মানুষের সুখ-দুঃখ ফেরি করে বেড়ানো এক শিল্পীর নাম সঞ্জীব চৌধুরী। ‘আমি তোমাকেই বলে দেব’, ‘ভাঁজ খোলো আনন্দ দেখাও’, ‘তোমার বাড়ির রঙের মেলায়’সহ বহু জনপ্রিয় গান তিনি উপহার দিয়েছেন।
প্রয়াত এই শিল্পী একজন খ্যাতনামা সাংবাদিকও ছিলেন। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র আজকের কাগজ, ভোরের কাগজ ও যায়যায়দিনে কাজ করেছেন তিনি। আমৃত্যু যুক্ত ছিলেন সাংবাদিকতার সঙ্গে।

আসিফ আকবর : ‘বাংলা গানের যুবরাজ’ খ্যাত আসিফ আকবরও বেশ কিছুদিন সাংবাদিকতা করেছেন। কয়েক বছর আগে মানবজমিন পত্রিকায় বিশেষ সংবাদদাতা হিসেবে তার অনেক লেখা প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমানেও তার তত্ত্বাবধানে তার নামে একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল রয়েছে। লেখালেখির প্রতি ভালোবাসা থেকেই এই পোর্টালটি করেন তিনি।
এ ছাড়া ক্রিকেটসহ নানা বিষয়ে নিয়মিত কলাম লেখেন তিনি। বলার অপেক্ষা রাখে না, গানের মতো লেখাতেও জনপ্রিয় এই সঙ্গীত তারকা।

হাসান মাসুদ : নিউ নেশান, ডেইলি স্টার ও বিবিসি সব মিলিয়ে ১৫ বছরের অধিক সময় সাংবাদিকতার সঙ্গে ছিলেন অভিনেতা হাসান মাসুদ। এর আগে ছায়ানট থেকে নজরুল সঙ্গীতের ওপর পাঁচ বছরের একটি কোর্স সম্পন্ন করেন।
১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৯২ সালে অধিনায়ক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি নিউ নেশনস এবং পরে ডেইলি স্টারে ক্রীড়া প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করেন। মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর পরিচালিত ব্যাচেলর চলচ্চিত্রের মাধ্যমে চলচ্চিত্র জগতে তার পথচলা শুরু হয়। পরে তিনি মেড ইন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র এবং অনেক নাটকে অভিনয় করেন। তার প্রথম সঙ্গীত অ্যালবাম ‘হৃদয়ঘটিত’ ২০০৬ সালে প্রকাশ পায়। বর্তমানে অভিনেতা হিসেবেই অধিক পরিচিত তিনি।

মাহফুজ আহমেদ : ছোট পর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা মাহফুজ আহমেদ। সিনেমাতে অভিনয় করেও মানুষের মন জয় করেছেন তিনি। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুুরস্কার। মজার ব্যপার হলো মাহফুজ আহমেদও তার কর্মজীবন শুরু করেছিলেন সাংবাদিকতা দিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনাকালীন বিনোদন পাতায় লিখতেন। কাজ করেছেন তিনি পূর্ণিমা নামের একটি ম্যাগাজিনে। সেখানে কাজের সুবাদে ইমদাদুল হক মিলনের সঙ্গে পরিচয়। তারই পরামর্শে জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘কোন কাননের ফুল’ এ ছোট্ট একটি চরিত্রে অভিনয় করার মধ্য দিয়ে টিভি নাটকে নাম লেখান। এরপর হুমায়ূন আহমেদের বিখ্যাত ধারাবাহিক ‘কোথাও কেউ নেই’-এ বাকের ভাইয়ের বিরুদ্ধে সাক্ষী দেয়া মতি চরিত্রে অভিনয় করে পরিচিতি পান।