সাগর পাড়ি দিয়ে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত পাচার হচ্ছে রোহিঙ্গারা

গ্রামবাংলা ডেস্ক : সাগর পথে সুদূর অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্যরা। এপারে আশ্রিত এবং সীমান্তের ওপারে অবস্থানরত এসব রোহিঙ্গাদের সাগর পথে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে যাচ্ছে মানবপাচারকারী একটি সিন্ডিকেট। গত সপ্তাহে ৮০ রোহিঙ্গার একটি দল ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছে আশ্রয় পাওয়ার পর দুই দফায় দেড় শতাধিক রোহিঙ্গা ইঞ্জিনচালিত বড় বোটে সাগর পাড়ি দেয়ার সময় ইন্দোনেশীয় পুলিশ উদ্ধার করেছে। ওপারের সূত্রগুলো জানিয়েছে, অস্ট্রেলীয় পুলিশের সহায়তায় ইন্দোনেশীয় পুলিশ ইতোমধ্যে বেশ কয়েক দালালকে গ্রেফতার করতে সমর্থ হয়েছে। এরাও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্য।
গত বছরের ২৫ আগস্টের পর লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। তবে কিছুসংখ্যক রোহিঙ্গা সাগর পথে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় পালিয়ে আশ্রয় লাভের পর বর্তমানে বহু রোহিঙ্গা বোটে সাগর পাড়ি দিয়ে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কিছু কিছু বাংলাদেশিও রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। ইন্দেনেশীয় পুলিশের উদ্ধৃতি দিয়ে সূত্র জানিয়েছে, পাচারচক্রে জড়িত একজন রোহিঙ্গাসহ তিন সন্দেহভাজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। সন্দেহভাজন তিন পাচারকারীর অপর দুজন বাংলাদেশি ও ইন্দোনেশীয়। তবে মানবপাচারকারী ওই চক্রটির মূল হোতা হচ্ছেন ধনাঢ্য এক রোহিঙ্গা।
বিভিন্ন সূত্রে জানানো হচ্ছে, ব্যাপক গোপনীয়তায় আশ্রিত ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের প্রলুব্ধ করছে দালালরা। এ প্রক্রিয়ায় কক্সবাজার ছাড়াও দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকেও ওসব দেশে যেতে আগ্রহীদের সংগ্রহ করা হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কিছুসংখ্যক বাংলাদেশিরও রোহিঙ্গা বানিয়ে মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ায় পাচারে তৎপর দালালরা। আগে থেকে ওসব দেশে প্রবাসজীবনে অবস্থানকারী বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের নাগরিকরা স্বজনদের পৌঁছে দেয়ার ব্যয়ভার মেটাচ্ছে। সূত্র মতে, ইন্দোনেশীয় পুলিশ সন্দেহ করেছে, ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে স্পিডবোটে করে মালয়েশিয়া থেকে ইন্দোনেশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর কালিমানতান ও জাভা হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তাদের অস্ট্রেলিয়ার নিকটবর্তী পাপুয়া নিউগিনির মেরাউকিতে পাচার করা হয়। আরও পরে স্থানীয় মাছধরার নৌকা ভাড়া করে এদেরকে অস্ট্রেলিয়া পাঠানো হয়।
এ দিকে, টেকনাফ ও উখিয়ার বিশাল ১২ আশ্রয় শিবির ছাড়াও বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা রোহিঙ্গা নেতারা (পুরনো রোহিঙ্গা জঙ্গি) শরণার্থী শিবিরে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী রোহিঙ্গাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তারা যেভাবে হোক প্রত্যাবাসন কার্যক্রম বানচাল করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। মিয়ানমার সীমান্তের কাছে টেকনাফ উখিয়ায় বসবাস করছে অসাধু ওই চক্রটি (পুরনো রোহিঙ্গা) তাদেরকে বাংলাদেশে স্থায়ী বসবাস নতুবা বিভিন্ন দেশে আশ্রয় দেয়ার আশ্বাস দিচ্ছে বলে জানা গেছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বহুজাতিক কোম্পানিতে কাজ পাইয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতিও দেয়া হচ্ছে। মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকা হচ্ছে ২৭১ কিলোমিটার। তন্মধ্যে ৪৫ কিলোমিটার নদীপথ। ওই সীমান্ত এলাকার ফাঁকফোকর দিয়ে রোহিঙ্গারা নিয়ে আসছে মাদক ইয়াবার চালান। অনুপ্রবেশ করার সময় সন্ত্রাসী রোহিঙ্গারা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে বহু আগ্নেয়াস্ত্র। যেসব রোহিঙ্গার কাছে অবৈধ অস্ত্র রয়েছে, তা ভালোভাবে জানে পুরনো রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা। ওই রোহিঙ্গাদের সঙ্গে তারা সাক্ষাতে নতুবা মোবাইল ফোনে যোগাযোগ রক্ষা করত। তবে এখন তাদের যোগাযোগের ধারণ পাল্টে গেছে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন মোবাইল ট্র্যাকিং করছে সন্দেহে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা ই-মেইলে যোগাযোগ করে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।
অপর দিকে, আশ্রিত রোহিঙ্গাদের একটি অংশ আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর পাশাপাশি ইয়াবা-মাদক ব্যবসা ছাড়াও মানবপাচার কাজ শুরু করে দিয়েছে। যেহেতু এক ক্যাম্প থেকে অন্য ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের যাতায়াতে কোনো ধরনের অনুমতি প্রয়োজন পড়ে না। এ সুযোগে রোহিঙ্গা দালাল চক্র মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াগামী যাত্রীদের সহজে শামলাপুর সাগর পাড়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছে। মাছ ধরার ট্রলারের শ্রমিক হিসেবে রোহিঙ্গারা টেকনাফ শামলাপুর পয়েন্টে গিয়ে সাগরে অবস্থানকৃত বড় আকৃতির ইঞ্জিন বোটে উঠছে। সূত্র জানায়, সম্প্রতি বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধিত ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে নিবন্ধিত করা হলেও বেশকিছু রোহিঙ্গার অস্তিত্বও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এদের মধ্যে কেউ কেউ দেশের বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে গেলেও অনেকে দালাল চক্রের হাত ধরে সাগর পথে মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার পাশাপাশি সুদূর অস্ট্রেলিয়ায়ও পাড়ি জমাচ্ছে।
রোহিঙ্গাদের কারণে অসহায় গ্রামবাসী অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের কারণে এক প্রকারে জিম্মি ও অসহায় হয়ে পড়েছে উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দারা। রোহিঙ্গারা চুরি-ডাকাতি এমনকি অন্যায় করলেও গ্রামবাসীরা প্রতিবাদ করতে পারছে না। রোহিঙ্গারা মিথ্যা অভিযোগ নিয়ে গেলেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন গ্রামবাসীদের ধরে নিয়ে হয়রানি করার অভিযোগ রয়েছে।