সাতচল্লিশেই স্বাধীন রাষ্ট্র হতে চেয়েছিল বাংলা

আনোয়ার ইকবাল

১৯৪৭ সালের জুন। ক্লিমেন্ট এটলি তখন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। লন্ডনে নিযুক্ত মার্কিন দূতের সঙ্গে বাংলা নিয়ে তিনি আলাপ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, না ভারত আর না পাকিস্তান কোনো পক্ষেই যোগ দিতে নারাজ বাংলা; তারা বরং স্বাধীন একটা রাষ্ট্র হওয়ার পথই বেছে নেবে- এই ছিল তার বিশ্বাস।
মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ঐতিহাসিক কিছু দলিল প্রকাশ করেছে। এসব থেকে জানা যায়, ভারত ভাগ সম্পর্কে তার পরিকল্পনার কথা এটলি সর্বপ্রথম জানিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রকে।
যুক্তরাজ্যে তখন মার্কিন দূত ছিলেন লুইস উইলিয়ামস ডগলাস। সাতচল্লিশের ২ জুন তিনি ‘জরুরি ও অতিগোপন’ একটা টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জর্জ মার্শালকে। টেলিগ্রামে ডগলাস জানান, ওই দিনই বিকেলে তাকে এটলি তার কার্যালয়ে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। ওই বৈঠকেই ভারতভাগের বিষয়ে নিজের পরিকল্পনার ‘আগাম তথ্য’ সম্পর্কে এটলি তাকে অবহিত করেন।
পরের দিনই ভাইসরয় লুইস মাউন্টব্যাটন ওই পরিকল্পনার কথা ভারতবাসীকে জানান। এবং একই দিন এটলি তা নিয়ে আলোচনা তোলেন ব্রিটিশ সংসদে।
দুটি প্রধান পক্ষের কোনটিতে যোগ দেবে পাঞ্জাব ও বাংলাএ বিষয়ে প্রদেশ দুটি থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই সিদ্ধান্ত নিক, এটাই চেয়েছিলেন এটলি। এ কথা তিনি রাষ্ট্রদূত ডগলাসকে বলেছিলেন। সঙ্গে এ-ও বলেছিলেন, তারা যদি সিদ্ধান্তে পৌঁছতে ব্যর্থ হয়, তা হলে তাদের দুই ভাগে ভাগ করে ভারত ও পাকিস্তান উভয় পক্ষে দেওয়া হবে। এটলি বলেছিলেন, তার ধারণা, ‘পাঞ্জাবের বিভক্তি সম্ভবপর হতেও পারে’। তবে বাংলার বেলায় ‘জোর সম্ভাবনা রয়েছে যে, তারা না বিভাজনকে মেনে নেবে আর না তারা যোগ দেবে হিন্দুস্তান কিংবা পাকিস্তানে।’
আর এ রকম হিসাবের মানে, বাংলা একটা স্বতন্ত্র ডোমিনিয়ন হতে চেয়েছিল। এমন বিকল্প পাঞ্জাবের জন্যও খোলা ছিল। কিন্তু এটলির ধারণা ছিল, এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারাটা পাঞ্জাবের জন্য অভাবনীয় ছিল বটে। এসবই তিনি দূত ডগলাসকে বলেছিলেন।
ডগলাস ওই টেলিগ্রামে উল্লেখ করেছিলেন, তার সঙ্গে ভারতভাগ নিয়ে আলাপকালে এটলি ‘ফুরফুরে মেজাজে ছিলেন। আবার খানিকটা দুঃখবোধও ছিল।’ ডগলাস জানিয়েছেন, ‘এটলির দাবি, তিনি ভারত সংকট নিয়ে ২১ বছর ধরে কাজ করছেন।’ তার বিশ্বাস ছিল, ‘মন্ত্রিসভা যে পরিকল্পনা করছে, তার গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে একটা শেষ চেষ্টা’ করবেন ভাইসরয়।
আর যদি গ্রহণযোগ্যতা অর্জন সম্ভব না হয়, যেটার ‘আশঙ্কা খুবই কম বলে এটলির বিশ্বাস ছিল’, তা হলে ভাইসরয় ভারতের নেতাদের সামনে একটাই করণীয় তুলে ধরবেন। তা হলো, ‘ভারতকে ভাগ করে হিন্দুস্তান ডোমিনিয়ন ও পাকিস্তান ডোমিনিয়নে রূপান্তর করা।’
মার্কিন দূতকে এটলি বলেছিলেন, হিন্দুস্তানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে আগস্টের কোনো এক দিন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আর পাকিস্তানের যেহেতু প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল না, তাই তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে বিলম্ব হবে, যত দিন না এমন ব্যবস্থা চালু হয়।’
ভারতভাগ হলে কিছু সংকটও দেখা দেবে। বিশেষত সেনাবাহিনী নিয়ে। দূতকে এটলি বলেছিলেন, ভারতের বিভিন্ন ডোমিনিয়ন থেকে প্রতিনিধিদের একটা যৌথ কমিশন এসব ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেবে। ভারত ভাগে ‘রক্তপাতের কোনো ঘটনা ঘটবে না বলে আশাবাদী ছিলেন’ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। তবে তিনি ‘রক্তপাতের আশঙ্কা করেননি, তাও নয়।’
এটলি মার্কিন দূতকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে ভারতীয় সেনাবাহিনী অন্তর্বর্তীকালীন ভারত সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আদেশে কাজ করবে।
মার্কিন দূতকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ব্রিটিশ সংসদে এমন একটি যথোপযোগী আইন প্রণয়নে বিরোধীরা কোনোরূপ বাধা দেবে না বলে তার বিশ্বাস। এবং এটা খুব সহজেই সম্পন্ন হয়ে যাবে।
দূত ডগলাস টেলিগ্রামে লেখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে এমন আগাম তথ্য দেওয়ার জন্য আমি প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই। আমার জানা মতে, আর কোনো দেশের কাছে এখন পর্যন্ত এমন তথ্য জানানো হয়নি।’
১৯৪৭ সালের ২০ জুন দিল্লিতে মার্কিন দূতাবাসেও একটা টেলিগ্রাম পাঠানো হয়েছিল। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্শাল তা পাঠিয়েছিলেন। ওই টেলিগ্রাম থেকে জানা যায়, তখনো ভারত ভাগের বিরোধিতা করে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র।

পাকিস্তানের প্রভাবশালী গণমাধ্যম ডন ডটকমে গত ২৮ ডিসেম্বর প্রকাশিত। ইংরেজি থেকে নির্বাচিত অংশের ভাষান্তর -জাহাঙ্গীর সুর