সাদা-কালো ছবির গল্প

সাদা- কালো সব ছবির পেছনেই মনে হয় একটা গল্প থাকে। কারণ আমাদের সেই সময়ে বিশেষ কোন কারণ ছাড়া ছবি তোলা হতই বা কয়টা! অবশ্য এ যুগে একথাটি তেমন বিশ্বাসযোগ্য হবেনা। আর ভবিষ্যতে ক্যামেরার ব্যবহারও বোধ হয় থাকবে না। কারণ হাতে একটা স্মার্টফোন থাকলেই সবকিছু করা যায়। শুধু শুধু একটা ক্যামেরা বহন করার কি দরকার! সেই প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে, বিশেষ বিশেষ সময়ের ছবি আমরা অ্যালবামে রেখে দিতাম আর অবসর সময়ে সেইসব ছবি দেখে স্মৃতির গভীরে চলে যেতে ভালবাসতাম । আর এখন! অগুণতি ছবি তোলা হচ্ছে একসাথে আবার হারিয়েও যাচ্ছে ছবির ভীড়ে । নিত্য নতুন উদ্ভাবিত প্রযুক্তির কবলে পড়ে, সকলে ধাবমান থাকতেই ভালবাসছে। হ্যা, সেকালে সাদাকালো ছবিই তোলা হোত। সেই হারিয়ে যাওয়া সাদা কালো ছবির গল্প বলব আজ। সত্যি বলতে কি, নিজের অ্যালবাম খুঁজে ও সাদা কালো ছবি বেশি পাওয়া গেলনা ।

১৯৭০ সালের জানুয়ারি মাসের কোন একদিনের ছবিটির স্মৃতিচারণ করব এখন । ডাক্তারি পাশ করেছি এক বছরও হয়নি। হাউস সার্জন হিসাবে প্রফেসর, ডাক্তার ফিরোজা বেগমের ইউনিটে, গায়নোকোলজী ও অবব্সটেট্রিক বিভাগে কাজ করি। হ্যা, আমাদের সময়ে পাশ করার পর ইন্টার্নশিপকে, হাউজ জব বলা হত। আর সদ্য পাশ করা ডাক্তারদের, হাউস সার্জন বলে ডাকা হত । তখন আমাদেরকে কিছু ভাতা বা বেতন দেয়াও নির্ধারিত হয়েছিল। প্রথম ছয় মাস, ১৫০ টাকা আর পরবর্তী ছয় মাস ২০০ টাকা। কারণ ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। হঠাৎ করে বিয়েটাও হয়ে গিয়েছিল।

এমন সময় স্বাস্থ্যসচিবের কাছ থেকে নির্দেশ এল, প্রফেসার ফিরোজা বেগমকে ঢাকার বাইরে কয়েকটি শহরে এক সপ্তাহের জন্য মেডিক্যাল টিম নিয়ে স্বাস্থ্যসেবা দিতে যেতে হবে। ম্যাডাম আমাকে আর আমার সহপাঠী ডাঃ সিতারা বেগমকে মনোনীত করলেন । বেশ আনন্দ হয়েছিল কাজ করতে গিয়ে। আবার ম্যাডামের কাছে বকুনিও খেয়েছিলাম। ঘটনাটা বলছি: আমরা সেখানে রোগীদের ছোটখাট অপারেশনও করেছিলাম। এমনি এক অপারেশানে আমি ম্যাডামকে সাহায্য করছিলাম। আমার ডান হাত বন্ধ ছিল তাই বাম হাত দিয়ে ম্যাডাম আমাকে একটা সেলাই থেকে ক্যাটগাট কেটে দিতে বললেন। আমি যথারীতি পারলাম না। কারণ বাম হাত দিয়ে আমি কিছুই করতে পারিনা। সে কথা বলার সাহস নেই। অতঃপর একটা ধমক খেলাম। অবশ্য সেসময় আমরা আমাদের স্যার ও ম্যাডামদের কাছে ধমক খাওয়াতে কিছুই মনে করতামনা। বরং অনেকটা আশীর্বাদের মত মনে হত। কারণ ঐ সাত দিনে ম্যাডামকে কাছে দেখার সুযোগ হয়েছিল। একান্ত অবসরে নিজের মায়ের মত স্নেহ পেয়ে ধন্য হয়েছিলাম।

ছবিটি, কুমিল্লা একাডেমীর গোলাপ ফুলের বাগান হতে ফুল নিয়ে কোথাও যাচ্ছিলাম। অপূর্ব সুন্দর ছিল সেই গোলাপ বাগান। সেই প্রথম আমি বিভিন্ন রঙের গোলাপ দেখেছিলাম। কাল রঙের গোলাপ দেখে অদ্ভুত এক অনুভূতি হয়েছিল। ছবিতে প্রথমে প্রফেসর ফিরোজা বেগম, এরপর ডাক্তার সিতারা এবং সবশেষে আমি। ডাঃ সিতারা পরবর্তীতে আর্মীতে যোগ দিয়েছিল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তার অসামান্য অবদানের কারণে বাংলাদেশ সরকার তাকে “বীর প্রতীক” খেতাব দিয়ে সম্মান দিয়েছে। আমরা গর্বিত ক্যাপ্টেন সিতারার জন্য। সে এখন আমেরিকায় বসবাসরত । আর ম্যাডামের স্মৃতি জাগরুক হয়ে আছে আমার স্মৃতির মণিকোঠায়। ম্যাডামের জীবনের শেষ দিনগুলোর একদিনে দেখা করতে গিয়েছিলাম তাঁর বাড়িতে। তিনি চিনতে পারেননি। মনের সে অনুভূতির কথা প্রকাশ করা সম্ভব নয়। শুধু অনুভব করা যায়।
মিনেসোটা।