সাধারণ সুখ

রুনু হক

উচ্চাশা থাকা ভালো, কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত উচ্চাশা মানুষের জীবনে বিপদ ডেকে আনে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। তাহের নামের আমার এক প্রয়াত বন্ধু প্রায়শ বলতেন- মানুষের সাধারণভাবে বাঁচার মধ্যেও আছে আনন্দ। সব মানুষকেই একটা কিছু করার জন্য প্রাণপাত করতে হবে, তার কোন মানে নেই। এখানে একটা ছোট গল্প বলা যায়। একজন ধনী ব্যবসায়ী রাতে ঘুমাতে পারতেন না। ভীষণ চিন্তা তার, কিভাবে টাকা-পয়সা, অর্থ-সম্পদ তিনি রক্ষা করবেন এবং কিভাবে আরো অর্থের পাহাড় গড়বেন। তাই প্রায় নিদ্রাহীন রাত কাটতো তার।
এদিকে একজন গরীব মানুষ, দিন আনে দিনে খায়। সে রাতে শুয়ে গলা ছেড়ে গান গেয়ে এক সময় গাঢ় নিদ্রায় তলিয়ে যেতো। রাতে খেটে খাওয়া মানুষটির গান শুনলেই ধনী মানুষটির মনে হিংসা হতো- দরিদ্র মানুষটির কি সুন্দর দুশ্চিন্তা মুক্ত জীবন! রাতে ঘুমিয়ে কতো সুখ!
আমার সেই বন্ধু তাহের সাহেবের কথা আজও আমার মনে পড়ে। নিজের আরাম-আয়েশ নষ্ট করে রাত-দিন কেবল একটা ভীষণভাবে বিখ্যাত হওয়ার পেছনে ছুটে বেড়ানোর মাঝে কিভাবে জীবনকে উপভোগ করা যায়। জীবন খুব ছোট। খুব অল্প সময়ের জন্য আমরা পৃথিবীতে আসি। সুতরাং এই ছোট সময়টুকু অমানুষিক দুশ্চিন্তার মধ্যে না কাটিয়ে সহজ ও সুন্দরভাবে কাটানোই বুদ্ধিমানের কাজ।
মনে পড়ে বন্ধু তাহের সাহেবের কথা। যখন শুনি অমুক বিখ্যাত ব্যক্তি প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক অকারণে আত্মহত্যা করেছে তখন চমকে উঠে মন। এতো প্রতিপত্তি, সমাজে এতো সুনাম থাকা সত্ত্বেও আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন কেনো মানুষটি? তার কি প্রত্যাশা পূর্ণ হয়নি। মানুষের মন জটিল অঙ্কের সমাধানের চেয়েও কঠিন এক জিনিস। বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেও এর রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি। তাইতো যখন ফারিয়া শুনতে পেলো তার বিখ্যাত মামা যে তার যাদুকরী কণ্ঠের মাধুর্য দিয়ে গান গেয়ে সুনামের শীর্ষে অবস্থান করছিলেন। রেডিও-টিভি-মুভি বলতে একনামে তার সুনাম সবার মুখে মুখে। গানের মাধুর্য দিয়ে প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক। স্বদেশে-বিদেশে কয়েকটি বাড়ি। সেই মনময় চৌধুরী মামার আত্মহত্যা তাকে চমকে দিলো ভীষণভাবে! মামার খুব কাছের আর প্রিয় ছিলো ফারিয়া।
বিদেশে গান গাইতে গেলেই তার জন্য সবচেয়ে সুন্দর আর দামি উপহার নিয়ে আসতেন তিনি। মামি ছিলেন স্কুল টিচার। মামাকে নিয়ে মামির মুখে কোন অনুযোগ-অভিযোগ শুনিনি কখনোই। তিনি খুব সাধারণ একজন ভদ্রমহিলা। সংসার আর দু’সন্তানকে নিয়ে তার জীবন আবৃত। সবসময় মামিকে ফারিয়া হাসি মুখে কথা বলতে দেখেছে।
মামাকেও সে দেখেনি বা শোনেনি তার নামে অভিযোগ করতে। তা হলে মামার জীবনে কি এমন ঘটলো, যার জন্য তিনি এই দুর্বিসহ জিঘাংসার মধ্য দিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ কররেন। মামার ছবিসহ রেডিও-টিভি, খবরের কাগজে খবর ছাপতে শুরু হলো। এসব দেখলে ফারিয়া কেঁদে উঠতো। তার চিৎকার করে মামাকে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করতো- মামা আপনি জীবনে কি পাননি? একটা মানুষের জীবনে আর কি চাওয়ার থাকতে পারে। এক জীবনে আপনি সুনাম-সম্মান, অর্থবিত্ত, স্ত্রীর ভালোবাসা- সবইতো পেয়েছিলেন। অজস্র ভক্তের চিঠি, ফোন, সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার আপনাকে এনে দিয়েছে খ্যাতির মহিমা। একটা মানুষের যে চাওয়া-পাওয়া থাকে, তার কোনটাই বিধাতা অপূর্ণ রাখেনি। তাহলো কি দুঃখে আপনি বেছে নিলেন, নিজ জীবনকে পৃথিবীর আলো থেকে ঠেলে দিলেন মৃত্যুর অন্ধকারে!
ফারিয়ার মনে পড়ে সেই সহকর্মী বন্ধুর কথা- সব মানুষকে যে একটা কিছু হতেই হবে, তার কোন মানে নেই। সাধারণভাবে বাঁচার মধ্যেও আছে আনন্দ। মনময় মামার রান্নার হাত ছিলো অসাধারণ। যেখানে যেতেন সুর ভাজতে ভাজতেই বাবুর্চিখানায় গিয়ে হাতা-বেড়ি তুলে নিতেন। সর্বদা হাসি-খুশি কথাবার্তায় সবাইকে মাতিয়ে রাখতেন। এমন একটি সর্বগুণান্বিত মানুষ যে নিজের হাতে নিজের জীবনকে শেষ করে দেবেন, ভাবাই যায় না!
মামার দুঃখে ফারিয়া কয়েকদিন অফিস যাওয়া বন্ধ করতে বাধ্য হলো। অসহায় কান্নাই হলো তার সম্বল। সে জানে তাকে সবাই বহু প্রশ্ন করবে। কিন্তু যদিও সে মামার প্রিয়পাত্রী ছিলো, কিন্তু তার মনের গভীরে তলিয়ে দেখার শক্তিতো ফারিয়ার নেই।
মামী কাঁদছেন অহর্নিশ। সবাই তার অতি কাছের মানুষ। কিন্তু কেউই জানেন না, এভাবে তার অকালে জীবন বিসর্জন দেয়ার কারণ কি? ফারিয়া যখন একাকী বসে থাকে, তখনই তার মামার কথা মনে পড়ে। নিজের মনেই বিশ্লেষণ করে, তবে কি তার মামা খ্যাতির শীর্ষ চূঁড়ায় অবস্থান করে ভাবতেন- একদিন তার খ্যাতি শেষ হয়ে যাবে! তখন আর তাকে কেউ এভাবে স্মরণ করবে না! সেই যন্ত্রণাই কি তাড়িত করেছে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে? কে বলতে পারে মানুষের মনের কথা। ফারিয়ার মতো সাধারণ মানুষের এ কেবল চিন্তামাত্র। বড় বড় মনস্তত্ত্ববিদরাই কি পেরেছে আত্মহত্যার কারণ বের করতে? বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন কারণে আত্মহত্যা করে থাকে। সুতরাং প্রচুর খ্যাতি অর্জনকারী, অর্থবিত্ত-মর্যাদাসম্পন্ন মানুষেরা কেনো আত্মহত্যা করে, তার কারণ কেউ বের করতে পেরেছে কিনা সন্দেহ।
ফারিয়া লক্ষ করছে যতোদিন যাচ্ছে, হতদরিদ্র মানুষের চেয়ে খ্যাতিমান-বিখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েই চলেছে। আবারও তাই ফারিয়ার মনে পড়ে সেই বন্ধু-কলিগের কথা- সাধারণভাবে বেঁচে থাকার মধ্যেও আছে আনন্দ!
নর্থ ক্যারোলিনা।