সামগ্রিক বিজয়ই বিশ্ব বাঙালির কাম্য

মুহম্মদ শামসুল হক :

মহামারি করোনার নতুন সংক্রমণের হুঁশিয়ারির সংবাদে বর্তমানে বিশ্ববাসী তটস্থ। আর রাজনৈতিক চরম বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের খেটে খাওয়া ও নিরীহ জনগণের আহার-নিদ্রা নির্বাসনে যাওয়ার উপক্রম। এমন শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশেই স্বদেশে ও প্রবাসে বাংলাদেশিরা ৫২তম মহান বিজয় দিবস উদ্্যাপন করছে যাচ্ছেন ১৬ ডিসেম্বর শুক্রবার। বিজয় দিবসের প্রাক্কালে বরাবরের মতো এবারও বায়ান্নর ভাষাশহীদ, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে প্রাণ বিসর্জনকারী বীর বাঙালি, ১৪ ডিসেম্বরের শহীদ বুদ্ধিজীবী, একাত্তরের ৩০ লাখ শহীদ, দুই লক্ষাধিক সম্ভ্রমহারা মা-বোন, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সপরিজনে নিহত জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ৪ জাতীয় নেতা, সর্বোপরি করোনায় নিহতদের আত্মার চিরপ্রশান্তি কামনার পাশাপাশি সকলের প্রতি রইল গভীর সহমর্মিতা ও হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা। অনস্বীকার্য যে ঝিনুক দিয়ে সাগর সেচার প্রচেষ্টায় সাফল্য অর্জনের কল্পকাহিনি নেহাত গাঁজাখুরি গল্প হিসেবে হাস্যাস্পদ।

অথচ ১৯৭১ সালের ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে স্বল্পকালীন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাঙালি সর্বাধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত ৯৬ হাজার বর্বর পাক বাহিনীকে নাকানি-চুবানি খাইয়ে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা ছিল অতুলনীয় ইতিহাস সৃষ্টির গৌরবোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যুদ্ধজয়ের জন্য সমরাস্ত্রের চেয়ে মুক্তিকামী জনতার বজ্রকঠোর সংকল্প এবং আত্মাহুতির মনোবৃত্তি যে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ, স্বদেশপ্রেমে উজ্জীবিত মুক্তিকামী বীর বাঙালি ১৯৭১ সালে তা অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণ করেছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে চরম আত্মত্যাগের বিনিময়ে রাজনীতিবিদ, সেনাসদস্য, ইপিআর, পুলিশ বাহিনী, ছাত্র-শিক্ষক, কর্মচারী-আমলা-ব্যবসায়ী তথা সর্বস্তর ও পেশার বাঙালি যে কালোত্তীর্ণ ইতিহাস রচনা করেছেন, মহাপ্রলয়ের আগ পর্যন্ত তা গোটা বিশ্বের মুক্তিপাগল জনতার জন্য অনন্ত অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। একাত্তরে গুটি কতক দেশদ্রোহী ছাড়া সর্বস্তরের দেশপ্রেমিক বাঙালির নিরতিশয় ত্যাগ স্বীকার ও শৌর্যবীর্য বিশ্বের যেকোনো দেশ ও জাতির গগনচুম্বী শৌর্যবীর্য ও গৌরবকে অনায়াসে ম্লান করে দিতে সক্ষম।

যাহোক, যাবতীয় শোষণ ও বঞ্চনামুক্ত কাক্সিক্ষত বাংলাদেশের ভৌগোলিক স্বাধীনতা অর্জিত হওয়ার অব্যবহিত পরপরই সদ্যপ্রসূত বাংলাদেশের ভাগ্যাকাশে মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তি ও স্বার্থান্বেষী শকুনের আনাগোনা শুরু হয়। ফলে মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় বীর বাঙালির যাবতীয় অর্জন ও গৌরবগাথা চরমভাবে ভূলুণ্ঠিত হয় এবং নতুনভাবে ক্ষমতা দখল, ক্যু-পাল্টা ক্যুর সুযোগে স্বাধীনতাবিরোধীরা রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয়। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা মোশতাক মার্কা কুলাঙ্গাররা রাতারাতি অর্থবিত্তের পাহাড় গড়ার প্রতিযোগিতায় আদাজল খেয়ে লাগে। পরাজিত, দেশদ্রোহী, দুর্নীতিপরায়ণ রাজনীতিবিদ, স্বার্থপর আমলা-কামলা ও পেশিশক্তির অধীশ্বররা গাঁটছড়া বাধে এবং ভিন দেশের প্রত্যক্ষ মদদে বাংলাদেশে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানকে চরম বেকায়দায় ফেলে এবং দেশে বর্ণনাতীত নৈরাজ্য সৃষ্টি করে।

বিহারিদের পরিত্যক্ত সম্পদ অবৈধভাবে হাতড়ে নেওয়া, সরকারি কোষাগার ও সম্পদ লুটপাট, নদী-খাল-বিল-ভূমি গলাধঃকরণ ছাড়াও অতি মুনাফাখোরি-লুটেরা ব্যবসায়ী ও সর্বভুক গণদুশমনরা বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিপন্ন করার প্রাণান্ত প্রচেষ্টায় মেতে ওঠে। দেশজুড়ে চরম দুর্ভিক্ষের সুযোগে একাত্তরের পরাজিত শত্রু এবং পাকিস্তানের সমর্থক রাষ্ট্রগুলো সিরাজ শিকদারের সর্বহারা, জাসদসহ তথাকথিত বাম সংগঠনের কাঁধে ভর করে ভয়ানক ত্রাসের সৃষ্টি করে। সেই চরম যুগসন্ধিক্ষণে ইতিহাসধিক্কৃত মোশতাক-তাহের উদ্দিন ঠাকুর প্রমুখ কিছুসংখ্যক বিপথগামী সেনাসদস্যের পারস্পরিক যোগসাজশে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট সপরিজনে সহস্র বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি মুজিব এবং তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের নৃশংসভাবে হত্যার মাধ্যমে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন কালো অধ্যায়ের জন্ম দেয়।

পরবর্তী সময়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতার বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড, ইনডেমনিটি বিল পাস, পাকিস্তান প্রত্যাগত জেনারেল এরশাদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মদদে অসংখ্য ক্যু-পাল্টা ক্যুতে জেনারেল জিয়া, মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরসহ বহুসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা ও সেক্টর কমান্ডারের প্রাণহানি এবং এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণের ঘৃণিত ইতিহাস বিশ্ববাসীর অজানা নয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে বাংলা মায়ের সিঁথির সিঁদুর ভাগীরথীর জলে ভাসিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে নবাব সিরাজের বড় খালা প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের ঊর্ণনাভ ঘসেটি বেগম এবং সিপাহসালার ইতিহাসধিক্কৃত মীর জাফরের নাম বিশ্ববাসী ঘৃণার সঙ্গে স্মরণ করবে। অনুরূপভাবে একাত্তরের ১৫ আগস্ট সহস্র বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সপরিজনে নিহত হওয়ার ক্ষেত্রে তাঁরই শেষ নৈশভোজের সঙ্গী কুখ্যাত মোশতাকের ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসের পৃষ্ঠা থেকে কস্মিনকালেও মুছে যাবে না।

যাহোক, দেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং অধিকারবঞ্চিত বাঙালির মুখে হাসি ফোটানোর বজ্রকঠোর সংকল্প নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু-তনয়া শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নানা ধরনের প্রতিকূলতা, ষড়যন্ত্র এবং প্রভাবশালী দেশগুলোর কাক্সিক্ষত সহযোগিতা না পেলেও শেখ হাসিনা সরকার ইমডেমনিটি বিল নামক কালাকানুন বাতিল, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের মধ্যে কয়েকজনকে আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করাসহ অনেক গঠনমূলক দায়িত্ব পালন করে। সহস্র প্রতিকূলতা সত্ত্বেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে শেখ হাসিনা সরকারের পাঁচ বছরের কার্যকালের সাফল্যের পাল্লা ব্যর্থতার তুলনায় নিশ্চিতভাবে ভারী। অবশ্য ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন সরকার এবং পরবর্তীতে ২০০৭-২০০৮ সালে সামরিক সরকার দেশ পরিচালনা করে।

সংগত কারণেই বলতে হয়, প্রতিটি সরকারের আমলেই কিছুসংখ্যক স্বার্থান্বেষী ও প্রভাবশালী মন্ত্রী-এমপি, আমলা-কামলার আশ্রয়-প্রশ্রয় ও ছত্রচ্ছায়ায় বাংলাদেশের প্রান্তিক চাষি ও নিরীহ জনগণের ভাগ্য নিয়ে কমবেশি ছিনিমিনি খেলা হয়েছে। অধিকন্তু দুর্নীতি নামক মহাব্যাধির চারাগাছটি জবাবদিহি ও আইনের শাসনের অভাবে এবং রাজনৈতিক অনুকূল পরিবেশে দিনে দিনে বিশাল মহিরুহে পরিণত হয়ে সমগ্র জাতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিস্তার লাভ করেছে এবং বর্তমানে গোটা দেশ ও দেশবাসীকে গিলে খেতে উদ্যত হয়েছে। যাহোক, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে শেখ হাসিনা সরকার গঠন করার পর থেকেই দেশের সার্বিক উন্নয়নে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন এবং বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের লেবাস পরিয়েছেন। গ্রামীণ পর্যায়ে চিকিৎসা পরিষেবা নিশ্চিত করা, রাস্তাঘাট ও অবকাঠামোর আধুনিকায়ন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মাধ্যমে মহাকাশ যুগে পদার্পণ, নিজস্ব অর্থায়নে স্বপ্নের পদ্মা সেতু ও কর্ণফুলী টানেলের বাস্তবায়ন ইত্যাদি সাফল্য অর্জনের দাবিদার শেখ হাসিনার সরকার। তবে কুইক রেন্টালের নামে সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয়, সরকারি তহবিলের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎকারী এবং মোটা অঙ্কের অর্থ বিদেশে পাচারকারী ও প্রভাবশালী চিহ্নিত রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে শেখ হাসিনা সরকারের ভূমিকা সমালোচকদের দৃষ্টিতে বহুলাংশে প্রশ্নবিদ্ধ। বালিকাদের অবৈতনিক শিক্ষাব্যবস্থা, বয়স্ক ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতাসহ বিভিন্ন গঠনমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে শেখ হাসিনা বিশ্ববাসীর পক্ষ থেকে রাশি রাশি প্রশংসা কুড়িয়েছেন। বর্তমানে অন্যের অনুকম্পানির্ভর এবং পরাশ্রয়ী জীবনের স্থলে শিক্ষা-দীক্ষা-কর্মক্ষেত্রে পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বাঙালি নারীরা অভাবনীয় নৈপুণ্য ও পারঙ্গমতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন।

বর্তমানে পুরুষ-নারী, শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে কর্মপ্রবণ যুবক-যুবতী-শ্রমিক চাকরির পেছনে ছোটাছুটি না করে স্বকর্মসংস্থানের বাস্তবসম্মত উদ্যোগের মাধ্যমে বেকারত্বের অবসান ঘটাচ্ছে। প্রকৃতির আনুকূল্যনির্ভর ও অদৃষ্টবাদী সাবেক চাষিগোষ্ঠী আধুনিক পদ্ধতির চাষাবাদ ব্যবস্থা, উন্নতমানের মৎস্য চাষ, পশুপালন ইত্যাদির মাধ্যমে খাদ্যশস্য উৎপাদনে যুগান্তকারী অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছে। আর নিত্যনতুন প্রযুক্তির অনুশীলন, উদ্ভাবন এবং উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে বাংলাদেশের উদ্ভাবনী শক্তিসম্পন্ন শিক্ষিত যুব সম্প্রদায় বিশ্বপরিমণ্ডলে নতুন মডেলে পরিণত হয়েছে। নারীদের ক্ষমতায়নে বিশেষ অবদান, গতিশীল নেতৃত্ব এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতাবলে শেখ হাসিনা বর্তমান গ্লোবাল বিশ্বে রোল মডেলে পরিণত হয়েছেন। অথচ স্বল্পসংখ্যক অত্যুৎসাহী আওয়ামী লীগার শেখ হাসিনার যাবতীয় অর্জনকে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থে বিসর্জন দিচ্ছে। আওয়ামী লেবাসধারী স্বল্পসংখ্যক লুটেরা, ভূমিদস্যু, দুর্নীতিবাজ আমলা-কামলা অহেতুক স্তুতিবাদের ছদ্মাবরণে শেখ হাসিনার সর্বনাশ করছে।
লুটেরা গোষ্ঠী ও দুর্নীতিপরায়ণরা আইনের দণ্ড থেকে অব্যাহতি এবং গণরোষের কবল থেকে চামড়া বাঁচানোর খাতিরেই আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনাকে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করছে। দুর্নীতিগ্রস্ত আমলা-কামলা ও আওয়ামী লেবাসধারী তস্কররা রাষ্ট্রের গৌরবোজ্জ্বল বদনে অহর্নিশ কলঙ্কের কালিমা লেপন করছে এবং জাতীয় উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা গ্রামের প্রান্তিক চাষি এবং হতদরিদ্র জনগণের দ্বারে পৌঁছাতে অহেতুক বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে সুজলা-সুফলা-অরণ্যকুন্তলা গ্রামপ্রধান বাংলাদেশের সিংহভাগ জনগোষ্ঠীর ভাগ্য অতীতের মতো তিমিরেই রয়ে গেছে এবং ভূমিহীন, বাস্তুহারা মানুষের শহর অভিমুখে যাত্রার স্রোত বাঁধভাঙা বানের পানির মতো অব্যাহত রয়েছে।

অমার্জিত শোনালেও বলতে হচ্ছে, ৫২ বছর বয়সী স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে বর্তমানে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার, পেশিশক্তির মাত্রাতিরিক্ত উত্থান, স্বজনপ্রীতির সাথে গাঁজা, ভাং, ফেনসিডিলসহ নেশা উদ্দীপক মাদকদ্রব্যের ব্যবহার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বিস্তার লাভ করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নীতিভ্রষ্ট সদস্য এবং রাজনৈতিক উচ্ছিষ্টভোগীদের প্রত্যক্ষ আশকারায় শহর-বন্দরের অলিগলি, গ্রামের ঝোপঝাড়, শ্মশান-গোরস্থান এবং গ্রাম-গঞ্জের ছোটখাটো হাট-বাজারও ইয়াবা, ভাং, গাঁজা ইত্যাদির কেনাবেচা ও সেবনের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। আর নেশাখোর-মাস্তান, জবরদখলকারীরা দেশজুড়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে বলে খবরে প্রকাশ। আবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাজনৈতিক জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার অশুভ পদচারণ গণতন্ত্র, দেশ ও জাতির জন্য বিরাট অমঙ্গলের। সরকার, ভোটার এবং দেশবাসীর নিকট অনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহির বালাই না থাকায় পরিণতিতে তারা স্বেচ্ছাচারী ও নীতিভ্রষ্ট ব্যক্তিতে পরিণত হয়ে থাকেন। তবে স্বেচ্ছাচারী জনপ্রতিনিধি, শাসক ও রাষ্ট্রনায়কদের করুণ পরিণতির ভয়াবহ কাহিনিতে মানবসভ্যতার ইতিহাস ভরপুর। যাহোক, আধুনিক ও উচ্চশিক্ষার সনদধারী স্বল্পসংখ্যক আমলা-কামলা-রাজনীতিক-প্রভাবশালী ও দুর্নীতিপরায়ণ ছাড়া বাংলাদেশের সিংহভাগ জনগোষ্ঠী কর্মনিষ্ঠ, সৎ, কষ্টসহিষ্ণু, পরিশ্রমী এবং অল্পে পুরিতুষ্ট জীবনযাপনে অভ্যস্ত। ধর্মের প্রতি অবিচল আস্থা এবং কাজানুরূপ ফল ও পাপানুরূপ শাস্তির ভয়ে অন্যায়ের চেয়ে অভুক্ত-অর্ধভুক্ত জীবনযাপন এবং প্রয়োজনে না খেয়ে মৃত্যুবরণকে তারা প্রাধান্য দেন। গ্রামের সহজ-সরল মাটির মানুষগুলো নিজেরা শান্তিতে থাকতে চান এবং সামাজিক সম্প্রীতি এবং সুস্থিতি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য-সৌভ্রাতৃত্ব বজায় রাখতে সচেষ্ট থাকেন। আল্লাহভীতির আশীর্বাদধন্য, সর্বংসহা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে মাত্রাতিরিক্ত সম্পদের মোহ, কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ-মাৎসর্য এবং ইন্দ্রিয়পরায়ণতা প্রলুব্ধ করতে পারে না। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ন্যায়নিষ্ঠ শিক্ষিত জনগণ এবং অজপাড়াগাঁয়ের নিরক্ষর গোবেচারা জনগণ রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনকানুন অক্ষরে অক্ষরে পালন এবং নিয়মিত কর-ট্যাক্স পরিশোধ করেন। জনপ্রতিনিধি এবং সরকারের নিকট শান্তিপ্রিয়, কর্মনিষ্ঠ এবং হালাল রোজগারে অভ্যস্ত এ শ্রেণির দেশবাসীর অমূলক প্রত্যাশা নেই।

যাহোক, সরকারি সম্পদ লুণ্ঠনকারী, খাল-বিল-নদী-নালা দখলকারী রাজনৈতিক দস্যু, প্রভাবশালী অবৈধ কোটিপতিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কঠোর অবস্থান এবং দুদকের ব্যাপক অভিযানের সংবাদে দেশের সাধারণ জনগণের সঙ্গে প্রবাসীরাও উল্লসিত। তবে গ্রেপ্তারকৃত ও অভিযুক্ত প্রভাবশালীদের বিচারে অযথা কালক্ষেপণে প্রবাসীরা উদ্বিগ্ন। কারণ বিলম্বিত বিচার কার্যত বিচারহীনতারই নামান্তর। তাই অভিযুক্ত প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে অতি দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দোষী সাব্যস্তদের স্থাবর-অস্থাবর সহায়-সম্পদ নিলামে বিক্রি করে লব্ধ অর্থ সরকারি রাজকোষে জমা দেওয়ার এবং তাদের দৈহিক শাস্তি নিশ্চিত করাই কাম্য। এমনতর বাস্তবতায় একমাত্র মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে প্রভাবশালী দুষ্কৃতকারীদের যথোপযুক্ত শাস্তি বিধান এবং দেশকে পেশিশক্তির দৌরাত্ম্যমুক্ত এবং দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব এককভাবে পালনের জন্য শেখ হাসিনার প্রতি অনুরোধ রইল। তাই এবারের মহান বিজয় দিবসে আমাদের আরাধ্য, বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মজলুম জননেতা ভাসানী এবং সহস্র বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাক্সিক্ষত ও পরম আরাধ্য যাবতীয় শোষণ ও বঞ্চনামুক্ত সামগ্রিক বিজয়ের ঐশ্বর্যমণ্ডিত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। ৫২তম বিজয় দিবসে ঠিকানার পক্ষ থেকে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের বীর শহীদবর্গ, বিশেষত ১৪ ডিসেম্বর নৃশংসভাবে নিহত জ্ঞানতাপস বুদ্ধিজীবী এবং মুক্তিযুদ্ধের মহান শহীদদের আত্মার চিরপ্রশান্তি, সম্ভ্রমহারা মা-বোনদের প্রতি গভীর সহমর্মিতা, জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের সুস্বাস্থ্য এবং শুভানুধ্যায়ীদের সার্বিক অগ্রগতি কামনা করছি।

লেখক : সহযোগী সম্পাদক, ঠিকানা, নিউইয়র্ক।
১৩ ডিসেম্বর ২০২২।