‘সাহিত্যজগতে বাংলার উপস্থিতি জানছে বিশ্ববাসী’

প্রথম আলো: এ বছর ঢাকা লিট ফেস্টের উৎসবের সাত বছর পূর্ণ হলো। পেছন ফিরে তাকালে কী কী অর্জন এবং কোন কোন অপ্রাপ্তি চোখে পড়ে? 
কাজী আনিস আহমেদ: আমাদের প্রথম উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বের বুকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে তুলে ধরা। একই সঙ্গে নতুন পাঠকদের সামনে বিশ্বের বিভিন্ন সাহিত্যধারাকেও গভীরভাবে তুলে ধরা। এই সাত বছরে ৩৩টি দেশ থেকে তিন শতাধিক লেখক-সাহিত্যিক-চিন্তাবিদ আনতে পেরেছি আমরা। উৎসবের এই সাত বছরে যেসব বিশ্ব-সাহিত্যিকদের সঙ্গে বাঙালি নাগরিকদের সম্মুখ পরিচয় ঘটেছে, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে সেটি একটি বড় ঘটনা। এগুলো অর্জনের দিক। আর অপ্রাপ্তি?
যেহেতু আমি লেখক, পাশাপাশি একজন উদ্যোক্তাও, সত্যিকার অর্থে তাই আমি নেতিবাচক তেমন কিছু সহজে আমলে নিই না। তারপরও বলি, সাহিত্য উৎসবকে ঘিরে আমাদের স্বদেশি লেখকদের অনেকের অনেক বিষয়ে হয়তো মন ভরে না, কোনো কোনো ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে প্রশ্ন ও বিরক্তিও তৈরি হয়; এসব যখন ঘটে, আয়োজক হিসেবে আমাদেরও তখন মন খারাপ হয়। আমরা সব সময় চাই, আয়োজনকে ত্রুটিমুক্ত করে এমন একটা জায়গায় নিয়ে যাব, যেখানে দেশের সব লেখক–চিন্তাবিদ–পাঠক এই উৎসবে যুক্ত হবেন এবং কারও মনে কোনো খেদ বা বিরাগ থাকবে না।
প্র আ: ২০১১ সালে এই উৎসব যখন শুরু হয়, নাম ছিল ‘হে সাহিত্য উৎসব’। তখন অনেকেই উৎসবের বিরোধিতা করেছেন। সেই বিরোধিতা এখন হ্রাস পেলেও অভিযোগ থেমে যায়নি। অনেকে অভিযোগ করেন, দেশীয় সাহিত্যের বৃহত্তর সমাজকে এই উৎসব এখনো একীভূত করতে পারেনি। আরও অভিযোগ এমন যে বাংলাদেশে ইংরেজি ভাষায় যাঁরা লেখেন, বাংলা ভাষার লেখকদের প্রতি তাঁদের একধরনের উন্নাসিকতা আছে। কী বলবেন এই বিষয়ে?
আনিস: একটু গোড়া থেকে শুরু করি। তারপর প্রশ্নের উত্তর দেব। প্রথমে বলি, হে নামটা কিন্তু কাকতালীয়ভাবে এসেছিল। হে উৎসবের মূল পরিচালক পিটার ফ্লোরেন্স চেয়েছিলেন এই উৎসবকে নিয়ে যাবেন বিশ্বের বিভিন্ন শহরে। প্রথমবার যখন ঢাকায় হে উৎসব হয়, তখন কিন্তু ভারতের কলকাতা ও কেরালাতেও এটা হয়েছিল। সে বছর ঢাকায় মাঠপর্যায়ের আয়োজক ছিলেন সাদাফ সায এবং তাঁর প্রতিষ্ঠান যাত্রিক। আয়োজকদের মধ্যে ছিলেন তাহমিমা আনাম আর আহসান আকবর। সে বছর আমি ছিলাম উৎসবের প্রথম স্পনসর। আমাদের সবার সম্মিলিত প্রয়াস এত চমৎকার ছিল এবং পাঠকদের সাড়া এত অভূতপূর্ব ছিল যে কলকাতা ও কেরালাকে ডিঙিয়ে ঢাকাই উঠে আসে দক্ষিণ এশিয়ায় হে-র ঠিকানা হিসেবে। এটা ছিল আমাদের সবার জন্য একটা জিত। হে উৎসব অন্যের চাপিয়ে দেওয়া বা সহজে পাওয়া কোনো ব্যাপার ছিল না, বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ সৃষ্টির জন্য এটা ছিল আমাদেরই তৈরি করা একটা সেতু।

এবার এলিট প্রসঙ্গে একটা পরিসংখ্যান দেওয়া যাক। বাংলাদেশের জনসংখ্যা এখন ১৬ কোটি এবং যুক্তরাষ্ট্রে এর দ্বিগুণ। যুক্তরাষ্ট্রর সবচেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক যে তিনটি ম্যাগাজিন—নিউইয়র্কার, হারপার ও আটলান্টিকা, তাদের সম্মিলিত প্রচারসংখ্যা ২০ লাখের ওপরে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের সবচেয়ে চিন্তাশীল তিনটি সাহিত্য পত্রিকার প্রচারসংখ্যা কমপক্ষে ১০ লাখ হওয়া উচিত। সেটা না হলেও অন্তত এক লাখ হতে পারত। এখন বিনীতভাবে একটা প্রশ্ন করি, আমাদের দেশের কোনো সাহিত্য পত্রিকার প্রচারসংখ্যা কি ১০-১৫ হাজারের ওপরে? তাহলে আমরা যখন বাংলা ভাষায় লিখি, তখনো কি আমরা বলয় ভেঙে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারি? এ বছর আমাদের উৎসবের তিন দিনে প্রায় ত্রিশ হাজার পাঠক-শ্রোতা এসেছেন; তাঁদের মধ্যে দেশের ভেতরে দূরদূরান্ত থেকেও এসেছেন অনেকে।
এবার দ্বিতীয় প্রসঙ্গ। এই উৎসবের এখন তিনজন পরিচালক—আমি, সাদাফ সায ও আহসান আকবর। আমাদের মধ্যে আহসান ও সাদাফ শুধু ইংরেজিতে লেখেন। আমি ফিকশন ইংরেজিতে এবং মতামত ও অন্যান্য লেখা বাংলা-ইংরেজি দুই ভাষায়ই লিখি। আমার ইংরেজি লেখা যেমন নিউইয়র্ক টাইমস-এ ছাপা হয়, তেমনি বাংলা লেখা ছাপা হয় আনন্দবাজার পত্রিকায়। সুতরাং আমি নিজেকে শুধু বাংলাদেশি লেখক নয়, বাঙালি লেখক বলে মনে করি।
আমাদের অন্য দুই পরিচালকও বাংলা সাহিত্যের নিবিষ্ট পাঠক, বাংলা সংস্কৃতির একান্ত অনুরাগী। আমরা এই তিনজন যতজন বাংলা ভাষার লেখককে বিশ্বসাহিত্যের একটা মিলনমেলায় সম্মানের আসনে বসিয়েছি, এই চেষ্টা তো অন্য কেউ করেননি। এরপরও যাঁরা সমালোচনা করবেন, এটা করার এখতিয়ার তাঁদের আছে। এক্ষেত্রে অভিযোগ আমলে না নেওয়ার এখতিয়ারও আমাদের থাকতে হবে।
স্বীকার করি, বাংলাদেশে কিছু ইংরেজি ভাষার লেখক হয়তো আছেন, যাঁরা সত্যিকার অর্থে বাংলা ওভাবে জানেন না। তাঁদের এই না জানাকে অনেক সময় উন্নাসিকতা মনে হতে পারে। কিন্তু এটা তো একান্তই তাঁদের ব্যক্তিগত বিষয়। এ কারণে উৎসবকে দায়ী করা কতটা সমীচীন?
প্র আ: বছর দুই আগে এই উৎসবের আরেক পরিচালক সাদাফ সায উৎসবের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছিলেন, জগৎবাসীকে জানাতে চাই, আমাদের দেশের সাহিত্য কতটা সমৃদ্ধ। বাংলাদেশের সাহিত্যের বিস্তারে শুধু কি উৎসবের মাধ্যমেই কাজ চলছে, নাকি এর বাইরেও কাজ কাজ করছেন আপনারা? 
আনিস: স্পষ্টভাবে বলি, তিন দিনের লিট ফেস্ট আয়োজন করা আমাদের তিন পরিচালকের আবশ্যিক দায়িত্ব। এর বাইরে ব্যক্তি উদ্যোগে দেশের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকদের লেখা ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করাচ্ছি আমরা। আমার উদ্যোগে চালু হয়েছে দুটি পৃথক প্রতিষ্ঠান—‘বেঙ্গল লাইটস’ ও ‘ঢাকা ট্রান্সলেশন সেন্টার’। ট্রান্সলেশন সেন্টার থেকে এখন পর্যন্ত সৈয়দ শামসুল হক, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সেলিনা হোসেন, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, মঈনুল আহসান সাবের, ইমদাদুল হক মিলন, শাহীন আখতার—বাংলা ভাষার এই লেখকদের বই অনূদিত হয়েছে। আগামী বছর থেকে এগুলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ভারত—তিন দেশে খ্যাতিমান প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘সিগাল’-এর মাধ্যমে বিপণন করা হবে। আদতে আমরা তিন ব্যক্তি নাগরিক তিনটি দিনের দায়িত্ব নিয়েছি বলতে পারেন। বাকি ৩৬২ দিনের জন্য আরও অনেককে এগিয়ে আসতে হবে।
প্র আ: উৎসব আয়োজন করতে গিয়ে কখনো কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি কি হয়েছেন? 
আনিস: হ্যাঁ, হয়েছি। আমার মতে, আমাদের সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গা হলো ইমিগ্রেশন। বিদেশি যেসব লেখক উৎসবে আসেন, বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁদের প্রথম পরিচয় ঘটে ইমিগ্রেশনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু সেখানে নানা রকম অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। অনারেবল ভিসা থাকা সত্ত্বেও কোনো বসার জায়গা পাওয়া যায় না সেখানে। ভিএস নাইপল কিংবা আদোনিসের মতো বিশ্ববিখ্যাত লেখকেরা আমাদের ইমিগ্রেশনের অনারেবল ডেক্সের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। গত বছর নাইপলের সঙ্গে যা ঘটেছিল, এবার অাদোনিসের সঙ্গেও তা-ই ঘটেছে। আমাদের একজন কর্মকর্তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ভেতরে গিয়ে তাঁদের ভিসা ও অন্যান্য কাগজপত্র গুছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। সে সময় ডেস্কের একজন কর্মকর্তা তাঁকে ধমকেছেন, চিৎকার-চেঁচামেচি করেছেন। অাদোনিসের মতো একজন বিশ্ববরেণ্য কবি বাংলাদেশে পা দিয়ে প্রথম যে অভিজ্ঞতা লাভ করলেন, সেটা হচ্ছে ধমক। এটা আমাদের জন্য এটা খুবই বেদনার অভিজ্ঞতা।
প্র আ: উৎসব নিয়ে আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? 
আনিস: আমাদের আশা ও স্বপ্ন অনেক বড়। উৎসবটি এর মধ্যেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটা অবস্থান তৈরি করেছে। আমরা চাই এমন সব লেখককে নিয়ে আসতে, যাঁদের চিন্তা-লেখা-বক্তব্য বৈচিত্র্য আনবে আমাদের চিন্তার জগতে। আগামী তিন বছর আমাদের অধ্যবসায় হবে এগুলো।
উৎসবের বিভিন্ন অধিবেশনে সব সময়ই আমরা চেষ্টা করছি প্রবীণ ও প্রতিষ্ঠিত লেখকদের পাশাপাশি তরুণ এবং প্রান্তিক লেখকদের প্রাধান্য দিতে। কারণ, বৈশ্বিক একটা জায়গা থেকে আমাদের প্রান্তিক করে রাখা হয়েছে। ফলে আমরা যদি ঢাকার বাইরের লেখককে জায়গা না দিই, তাঁদের প্রান্তিক করে রাখি, তবে আমিও তো সেই একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি করলাম। এবারে নতুন লেখকদের নিয়ে একটি অধিবেশন ছিল ‘সীমানাই যখন কেন্দ্র’ নামে। আমি বলব, এই তিন শব্দের মধ্যেই নিহিত আছে ঢাকা লিট ফেস্টের দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির মূলমন্ত্র।
সাত বছর খুব বেশি সময় নয়। অনেক কিছু শিখতে-বুঝতে হচ্ছে আমাদের। আর আমাদের এবারের উৎসব নিয়ে লে মঁদ, টাইম ও লস অ্যাঞ্জেলেস রিভিউ বুকসসহ বহু আন্তর্জাতিক মিডিয়া প্রতিবেদন করেছে। ফলে সাহিত্যজগতে বাংলার উপস্থিতি জানছে বিশ্ববাসী।
২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি এবং ঢাকা লিট ফেস্টের ১০ম বার্ষিকীতে সবাইকে নিয়ে এমন একটি অনন্য আয়োজন করতে চাই, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের সাহিত্যের পতাকা নতুন গৌরবে নতুনভাবে উড়তে শুরু করবে।