সাহিত্যের ২০১৭

ড. ফজলুল হক সৈকত : ক্যালেন্ডার বদলানোর সময় হলো। ঘরের দেয়াল, টেবিল, মোবাইল ফোনের স্ক্রিন আর মনের পাতা থেকে আর মাত্র দুই দিন পর সরিয়ে ফেলতে হবে ২০১৭ সালের ক্যালেন্ডার। নানান ঘটনার সাথে কালের গভীর অরণ্যে বিলীন হয়ে যাবে সাহিত্যভুবনের আরো একটি বছর। অথচ কত আনন্দ-বেদনার আর প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তিতে ভরে ছিল এ বছরটির সময়গুলো। সাহিত্য যেহেতু জীবনেরই কথা বলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে, তাই ফেলে আসা জীবনের দিকে তাকাতে গেলে আমরা সাহিত্যের পর্দাটুকুও দেখতে ভুল করি না। আসুন, একবার পেছন ফিরে দেখি সাহিত্যের ’১৭ কতটুকু দিয়ে গেছে আর কী-ই বা হারালাম আমরা
দুই.
আবেগে পরিপূর্ণ জাপানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ সাহিত্যিক কাজুও ইশিগুরো এ বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন। ইংরেজি ভাষার প্রখ্যাত এই ঔপন্যাসিক, চিত্রনাট্যকার ও ছোট গল্পকার অসাধারণ আবেগীয় শক্তিতে ভরপুর উপন্যাসগুলোর মধ্য দিয়ে বিশ্বের সাথে সংযোগের েেত্র অলীক ধারণার আড়ালে বিদ্যমান গভীর হতাশা উন্মোচন করেছেন। কাজুওর বয়স যখন পাঁচ বছর, ১৯৬০ সালে তার পরিবার ইংল্যান্ডে পাড়ি জমায়। গত ১০ ডিসেম্বর সুইডেনের স্টকহোমে তার হাতে পুরস্কার তুলে দেয়া হয়েছে। নোবেল ভাষণে কাজুও বলেছেন
“আমি তখন পাঁচ বছরের, কোলে একটি বই নিয়ে আমাদের মেঝেতে শুয়ে আছি, একজন পশ্চিমা মানুষের বৃহৎ সমৃদ্ধ রঙে সচিত্র মুখ স্পষ্ট মনে করতে পারি, আমার বইয়ের পুরো পৃষ্ঠায় ছিল তার আধিপত্য। এই ঝরঝরে মুখের পেছনে, এক পাশে ছিল বিস্ফোরণের ধোঁয়া ও ধুলো, আর অন্য দিকে বিস্ফোরণ থেকে আসা ক্রমবর্ধমান ধোঁয়াÑ মনে হচ্ছিল কোনো সাদা পাখি যেন আকাশ ছুঁতে চায়। সম্ভবত আমার মায়ের বিশেষ আবেগ ভরা কণ্ঠস্বরের কারণে সেই মুহূর্তটি আমার মনে একটি ছাপ রেখে গেছে। আমার মা একজন মানুষের ডায়নামাইট উদ্ভাবনের গল্প বললেন। তার পর সেই মানুষটি এর অ্যাপ্লিকেশন সম্পর্কে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন, তখন তিনি ‘নোবেল শো’ তৈরি করেছেনÑ আমি প্রথমে তার জাপানি নামে তাকে জেনেছি। আমার মা বলেন, ‘নোবেল শো’ (নোবেল পুরস্কার) শান্তি বা ঐকতানকে উন্নীত করে। আর সময়টা ছিল আমাদের শহর নাগাসাকি পারমাণবিক বোমায় বিধ্বস্ত হওয়ার মাত্র চৌদ্দ বছর পরে। আমি জানলাম শান্তি বা ঐক্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু, যেটা ছাড়া আমার পৃথিবী ভয়ঙ্কর কোনো কিছু দিয়ে আক্রান্ত হতে পারে।”
আমাদের এই প্রিয় পৃথিবীকে নিরাপদ আবাসভূমিতে পরিণত করার সেই কৈশোরিক চেতনা থেকে ব্যক্তি ও লেখক ইশিগুরো নিজের আবেগকে প্রশ্রয় দিয়েছেন সব সময়। সব মিলিয়ে তিনি বই লিখেছেন আটটি, যেগুলো এখন পর্যন্ত ৪০টির বেশি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। ১৯৮৯ সালে ‘দি রিমেইনস অব দি ডে’ বইয়ের জন্য ম্যানবুকার পুরস্কার লাভ করেন কাজুও ইশিগুরো। সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী ইশিগুরো পুরস্কার বাবদ পেয়েছেন ৯০ লাখ সুইডিশ ক্রোনার (১১ লাখ ডলার)। তিনি প্রবলভাবে স্মৃতিকাতর লেখক। তাঁর ভাষায়Ñ ‘আমি স্মৃতিকে একটি চমৎকার শৈলী হিসেবে দেখতে থাকি। এটি একটি ফিল্টার, যার মধ্য দিয়ে আমরা নিজেদের দেখতে পাই।
তিন.
২০১৭ সালে ম্যানবুকার জয় করলেন ইসরাইলি লেখক ডেভিড গ্রসমানের উপন্যাস ‘আ হর্স ওয়াকস ইনটু আ বার’। এই প্রথম কোনো ইসরাইলি লেখক ম্যানবুকার পেলেন। হিব্রুতে লেখা বইটি অনুবাদ করেছেন জেসিকা কোহেন। কানাডা প্রবর্তিত সারা দুনিয়ায় কবিতার সবচেয়ে দামি পুরস্কার (৬৫ হাজার ডলার) ‘গ্রিফিন পোয়েট্রি প্রাইজ’ এ বছর পেয়েছেন ব্রিটেনের অ্যালিস অসওয়াল্ড ও কানাডার ভ্যানকুভারের কবি জর্ডান আবেল। এ পুরস্কার প্রতি বছর একজন কানাডিয়ান এবং অপর একজন ভিনদেশীকে দেয়া হয়। জর্ডান ও আবেলের কবিতার যে বিষয়টি এবার বিবেচনা করা হয়েছে, তা হলোÑ সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে তাঁর সরবকণ্ঠ। ট্রাভেল রাইটিং বা ভ্রমণ বিষয়ে লেখার জন্য যুক্তরাজ্যের লেখক মাইকেল প্যালিন। তিনি ব্রডকাস্টার, অভিনেতা ও পর্যটক। গত ২ ফেব্রুয়ারি ৭৩ বছর বয়সী এই লেখক পুরস্কার গ্রহণ করেন। তাঁর বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ বই বিবিসির ডকুমেন্টারি হিসেবে প্রস্তুতকৃত। ট্রাভেল রাইটিং পুরস্কার প্রবর্তন করা হয় ২০১৬ সালে। প্যালিন এই পুরস্কার পাওয়া দ্বিতীয় ব্যক্তি। পুরস্কারটির অফিসিয়াল নামÑ ‘দি অ্যাডোয়ার্ড স্ট্যানফোর্ড ট্রাভেল রাইটিং অ্যাওয়ার্ড’। কেনিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট ও স্বাধীনতার স্থপতি জোমো কেনিয়াত্তার নামে করেছেন ভনে আদহিয়ান্দো আউর। প্রতি দুই বছরে দেয়া হয় এই পুরস্কার। ১৯৭৪ সালে প্রবর্তিত এই পুরস্কারের স্পন্সরশিপ গ্রহণ করেছেন দেশটির টেক্সটবুক সেন্টার। কেনিয়ার স্থানীয় ভাষা কিসওয়াহিলিতে রচিত ভনের পুরস্কার-বিজয়ী উপন্যাসটির নাম ‘ডাস্ট’। সম্প্রতি ঝলক সাহিত্য পুরস্কারের প্রতিযোগিতা থেকে মনোনীত উপন্যাস ‘নিনা ইজ নট ওকে’ এবং নিজের নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছেন অশ্বেতাঙ্গ কমিনিউটির (বিএএমইÑ ব্ল্যাক, এশিয়ান অ্যান্ড মাইনরিটি এথনিক) ব্রিটিশ লেখক শাপ্পি খোরসান্দি। ২০১৭ সালে প্রবর্তিত এই পুরস্কার সম্পর্কে খোরসান্দির অভিমতÑ ‘এই পুরস্কারের জন্য তিনি বিবেচিত হয়েছেন গায়ের রঙের জন্য, লেখার জন্য নয়।’ সার্বিয়ার পারফরম্যান্স আর্টিস্ট মারিনার একটি শিল্পকর্মকে ভিত্তি করে রচিত উপন্যাস ‘দ্য মিউজিয়াম অব মডার্ন লাভ’-এর জন্য ২০১৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার স্টেলা প্রাইজ পেয়েছেন হিদার রোজ। অস্ট্রেলিয়ার নারী লেখকদের জন্য ২০১৩ সালে ৫০ হাজার ডলার অর্থমূল্যের এই প্রাইজ প্রবর্তন করা হয়। পুরস্কারের পাশাপাশি হিদার রোজসহ শর্টলিস্টে থাকা আরো পাঁচজন লেখক নির্জনে লেখালেখির জন্য ভিক্টোরিয়ার অ্যাডিসে তিন সপ্তাহ থাকা-খাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। কর্নেল গাদ্দাফির নির্যাতনের শিকার ও নিখোঁজ বাবার অনুসন্ধানের অভিজ্ঞতানির্ভর আত্মজীবনীমূলক রচনা ‘দ্য রিটার্ন : ফাদারস, সানস অ্যান্ড দ্য ল্যান্ড ইন বিটুইন’ গ্রন্থের জন্য লিবীয়-মার্কিন লেখক হিশাম মাতার এ বছর পুলিৎজার ও র‌্যাটবোনস ফোলিও পুরস্কার পেয়েছে। ফোলিওর অর্থমূল্য হচ্ছে ২০০০ পাউন্ড। ‘আ জেনারেল থিওরি অব অবলিভিয়ন’ উপন্যাসের জন্য আয়ারল্যান্ডের ‘ইন্টারন্যাশনাল ডাবলিন লিটারেচার অ্যাওয়ার্ড-২০১৭’ পেয়েছেন এডয়ার্ডো আগুয়ালোসা। ৮৮ হাজার পাউন্ডের এই পুরস্কারকে বিশ্বেও অন্যতম ধনী অ্যাওয়ার্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মানুষের ক্ষমতার সামর্থ্য ও স্থায়িত্ব সম্পর্কিত কল্পকাহিনীনির্ভর উপন্যাস ‘দ্য পাওয়ার’-এর জন্য নাওমি পেয়েছেন যুক্তরাজ্যের অভিজাত ‘বেইলিস উইমেনস প্রাইজ’। ৩০ হাজার পাউন্ডের এই পুরস্কারের জন্য কেবল নারী লেখকেরা বিবেচিত হয়ে থাকেন। ২০১৭ সালের বেটজিম্যান পোয়েট্টি পুরস্কার পেয়েছে ১৩ বছর বয়সী লন্ডনে আশ্রয় নেয়া, গৃহযুদ্ধের শিকার, সিরিয়ার এক উদ্বাস্তু কিশোরী আমিনা আবু কেরেচ। অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে ওই কিশোরী বলেÑ ‘আমি এত খুশি হয়েছি যে, আমি আমার ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি।’ নিজ দেশের সমাজ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্বন্ধে ‘লেমেন্ট অব সিরিয়া’ নামের ইংরেজি-আরবি ভাষায় রচিত কবিতার জন্য আমিনা এই পুরস্কার পান। অস্ট্রেলিয়ার রিচলে প্রাইজ লাভ করেছেন স্যাম কোলে। তাঁর উপন্যাস ‘স্টেট হাইওয়ে ওয়ান’কে তীব্রভাবে মনোযোগ ধরে রাখার বই বলে মন্তব্য করেছেন বিচারকমণ্ডলী। ২০১৪ সালে চালু হওয়া এই পুরস্কারের জন্য কেবল উদীয়মান লেখকেরা বিবেচিত হয়ে থাকেন। এ বছর এডিনবরা ইস্টারন্যাশনাল বুক ফেস্টিভ্যালের ‘ফার্স্ট বুক অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন তুরস্কের ঔপন্যাসিক এসি তেমেলকুরান। প্রতি বছর আগস্ট মাসে স্কটল্যান্ডের এডিনবরায় এই বই উৎসব ও পুরস্কারের আয়োজন করা হয়। ইংরেজি ভাষায় অনূদিত প্রথম উপন্যাস এই পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হয়। ইন্দোনেশিয়ার বালিতে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ‘উবুদ রাইটার্স অ্যান্ড রিডার্স ফেস্টিভাল-২০১৭’। ২৫ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এ উৎসবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সাহিত্যিক অংশ নেন। এবারের উৎসবে শাহরাজের বই ‘দি হলি ওম্যান’ ইন্দোনেশিয়ায় বেস্ট সেলার হয়েছে। মুসলিম নারীদের এগিয়ে নেয়ার জন্য কাজ করছেন তিনি। তিনি এক সাাৎকারে বলেনÑ ‘আমি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদ সবখানেই আছে, সব ধর্মেই আছে, শুধু এককভাবে একটি মাত্র ধর্মের অনুসারীদের দায়ী করলে চলবে না।’ ফিলিস্তিনি ৫২ বছর বয়সী কবি ও লেখিকা হুজামা হুবায়েব ২০১৭ সালে নাগিব মাহফুজ সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ‘মখমল’ (ভেলভেট) উপন্যাসের জন্য তিনি এ পুরস্কার পান। বর্তমানে হুজামা সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাস করছেন।
চার.
মার্কিন ঔপন্যাসিক উইলিয়াম পিটার ব্ল্যাটি মারা ৮৯ বছর বয়সে গেছেন গত ১২ জানুয়ারি। আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস, নন-ফিকশন, চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লিখেছেন ব্ল্যাটি। নিজের লেখা কাহিনীর চলচ্চিত্র পরিচালনাও করেছেন। তাঁর পিতা-মাতা ছিলেন লেবানিজ অভিবাসী। কৈশোর ও যৌবনকালে বেশ কিছুকাল ‘অডজব’ করতে হয়েছে ব্ল্যাটিকে। যুক্তরাষ্ট্রের মৌখিক ইতিহাস রচয়িতা হিসেবে খ্যাত ৮৩ বছর বয়সী আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লেখক জিন স্টেইন গত ৩০ এপ্রিল নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনের নিজ বাসভবন বহুতল ভবনের ১৫ তলা থেকে লাফ দিয়ে আটতলায় পড়ে স্পটেই মারা যান। তিনি প্যারিস রিভিউ ও স্ট্রিট ম্যাগাজিন সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। এই বছর আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের সমর্থক ঔপন্যাসিক ও ইতিহাসবিদ কারেল শুম্যান আত্মহত্যা করেছেন। তিনি একটি সুইসাইড নোটও লিখেছেন। তাঁর ‘অ্যানাদার কান্ট্রি’, ‘দিস লাইফ’সহ বেশ কয়েকটি উপন্যাস ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। ২০১৭ সালে আমরা হারিয়েছি স্পেনের কবি-প্রাবিন্ধক-ঔপন্যাসিক, একসময় স্বৈরশাসক ফ্রাঁসোয়া ফ্রাংকোর বিরুদ্ধাচরণ করায় দেশ থেকে বিতাড়িত, হুয়ান গোইতিসোলোকে। তিনি গত জুনের ৪ তারিখে মারা গেলেন ৮৬ বছর বয়সে। ক্যান্সারে ভুগে ৬৪ বছরে ৫ জুন মৃত্যুবরণ করেছেন ব্রিটিশ কবি-ঔপন্যাসিক হেলেন ডানমোর। ২৭ জুন ৯১ বছর বয়সে লন্ডনে নিজ বাড়িতে মারা গেছেন শিশুসাহিত্যিক মাইকেল বন্ড। ব্রিটিশ কবি ও নাট্যকার হিথকোট উইলিয়ামস জুলাইয়ের ১ তারিখে ৭৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
পাঁচ.
প্রতি বছরের মতো এবারো ঢাকায় বাংলা একাডেমি ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে আয়োজন করে ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’। পুস্তক বিক্রয়ের পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্যের নানান বিষয় নিয়ে আলোচনা, প্রবন্ধ পাঠ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দর্শনার্থীদের মধ্যে বেশ সাড়া জাগায়। গত জুন মাসে কাজাখিস্তানে অনুষ্ঠিত হলো সপ্তাহব্যাপী আন্তর্জাতিক বইমেলা। প্রায় ১০০টি দেশ আর ২০টির মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা এতে অংশ নেয়। এ মেলায় লেখক-পাঠক সমাবেশের পাশাপাশি শিক্ষা-সংস্কৃতি ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমও আয়োজিত ও পরিচালিত হয়। বই বিপণন ছাড়াও গণতন্ত্র বিকাশের দিকে আগ্রহ প্রসারিত করে চলেছে এই বইমেলা।
ছয়.
সম্প্রতি কানাডার ভ্যানকুভার শহরে জাপানের চেরি ফুল বা সাকুরা উৎসবে পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট কাঠামোবদ্ধ কবিতা হাইকুর পাঠ দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে। ফুল মেলার পাশাপাশি এখানে জাপানি ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পের পসরাও বসে। যুক্তরাষ্ট্রের আরিজোনায় অনুষ্ঠিত হয়েছে পোয়েট্টি ফেস্টিভ্যাল। কবিতাকে স্বীকার করে নেয়া এবং আরো বেশি পাঠকপ্রিয় করে তোলা এ উৎসবের মূল লক্ষ্য। পার্বত্য-অঞ্চলীয় এই বার্ষিক ফেস্টিভ্যাল আয়োজিত হয়ে আসছে ১৯৮১ সাল থেকে। নভেম্বরে ঢাকায় বসে ছিল সপ্তমবারের মতো লিট ফেস্ট ২০১৭ আসর। এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মাধ্যমে সাহিত্য জগতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উপস্থিতি সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন সাহিত্যিকের কাজ ও দর্শন সম্পর্কে সরাসরি জানতে পারছেন সাহিত্যকর্মীরা। প্যারিসে নির্বাসিত সিরিয়ার কবি অ্যাডোনিস ছিলেন এবারের আয়োজনের প্রধান আকর্ষণ। আড্ডা-আলোচনায় তিনি আগত অতিথি ও শ্রোতা-দর্শকের মন জয় করে নেন। আলাপচারিতায় কবি অ্যাডোনিস বলেনÑ ‘আমার মা দুইজন। সম্ভবত আমিই একমাত্র সৌভাগ্যবান ব্যক্তি, যার দুইজন মা। এক মা আমার গর্ভধারিণী, আরেক মা কবিতা। আমার প্রথম মা প্রকৃতির মতো। দ্বিতীয় মা সৃষ্টিশীলতা, যে আমাকে প্রকৃতির বাইরে গিয়ে বড় হতে সাহায্য করেছে। দুইজনই গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতির বাইরে যেতে পারলেই মানুষ তার নিজের ইতিহাস তৈরি করতে পারে।’
সাত.
সাহিত্যচর্চা বা সাধনার সামাজিক তাৎপর্য যেমন রয়েছে, তেমনই এর আর্থিক স্বীকৃতিও মেলে মাঝে মধ্যে। সাহিত্যিকেরা সন্ন্যাসব্রত পালন করবেন কিংবা বৈষয়িক হবেন নাÑ এমনটি এখন আর ভাবা যায় না। জীবনের তাৎপর্য যারা লিখবেন, তারা যদি সুন্দরভাবে জীবনযাপন করার অধিকার বা সুযোগ না পায়, তাহলে তা হবে জীবনেরই সাথে প্রবঞ্চনা। কাজেই সাহিত্যের আসর-উৎসব-অনুষ্ঠান-পুরস্কারের মতো আয়োজনগুলো সাহিত্যের চলার পথকে আরো সুগম ও সুন্দর করবে। আর সাহিত্য হয়ে উঠবে আরো মানবমুখী।