সাহিত্য একাডেমির একযুগ

মুহম্মদ ফজলুর রহমান :

সাহিত্য একাডেমি এক যুগ পেরিয়ে এলো। ভালো সময় পানির মতো বয়ে যায়। মনে হয় এই তো সেদিন জ্যাকসন হাইটসের বেলাজানো বলরুমে কত সাড়ম্বরে উদযাপিত হলো সাহিত্য একাডেমির শততম আসর। আসরটি উৎসর্গ করা হয়েছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর উপর আলোচনার মূল প্রবন্ধটি লেখার এবং পাঠ করার।

আমি একদম সূচনাকাল থেকে সাহিত্য একাডেমির সঙ্গে সংযুক্ত ছিলাম না। অনেকটা সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর আমি কৌতূহল বশেই সাহিত্য একাডেমিতে তাদের একটি আসরে সে সময় নিয়মিত অংশগ্রহণকারী মুমু আনসারীর (আমার মেয়ে) সঙ্গে যাওয়ার জন্য মনস্থির করি। দিন-তারিখ মনে নেই। সম্ভবতঃ ডিসেম্বরের শেষ শুক্রবারের সন্ধ্যায়। প্রবল তুষারপাত হচ্ছিল সন্ধ্যা থেকেই। আবহাওয়া বেজায় খারাপ। যেতে যেতে ভাবছিলাম হয়তো, যাওয়াটাই পন্ডশ্রম হবে। এরকম আবহাওয়ায় নিশ্চয় তেমন মানুষের আগমন ঘটবে না। বিধায় আসরও বসবে না। তখন সাহিত্য আসর বসতো আজকের ডাইভারসিটি প্লাজার উত্তর পাশে, সাহিত্য একাডেমির একমাত্র পরিচালক এবং প্রাণশক্তি মোশাররফ হোসেনের টিউটরিং-এ।
সেদিন আমি অবাক না হয়ে পারিনি। ঐ রকম প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও ঘরটিতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই! তখন আমার মধ্যে নিশ্চিত এ বিশ্বাস জন্ম নেয় যে, সাহিত্য একাডেমির শেকর মাটির অনেক গভীরে। আমার এই বিশ্বাস থেকেই ঠিকানায় সাহিত্য একাডেমি নিয়ে একটি লেখা লিখলাম। লেখাটিতে সাহিত্য একাডেমির প্রতি সাহিত্যানুরাগী মানুষের ভালোবাসা এবং সাহিত্য একাডেমির আগামীর যাত্রা নিয়ে কিছু কথা ছিল। তার মধ্যে মূল কথা ছিল- সাহিত্য একাডেমি তার লক্ষ্য নিয়ে অনেক দূর যাবে। প্রবাস জীবনের শুরু থেকেই নিউইয়র্কে সাহিত্য একাডেমির আগেও দু-একটি সাহিত্য আসর বা সাহিত্য আড্ডায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। শুরুর কিছুদিন পরই সেসব আসর বন্ধ হয়ে যেতেও দেখেছি।

সাহিত্য একাডেমির আসর নিয়ে আমার প্রত্যয় জন্মানোর পেছনে অন্যকোন যাদু-টোনা কাজ করেনি। ইতিহাসের পাতা থেকে অর্জিত কিছু অভিজ্ঞতা। একটি সঠিক সংগঠন এবং তার একজন নির্লোভ এবং সৎ ও নির্মোহ নেতা, যাদের লক্ষ্য কেবল জনকল্যাণ এবং দেশমঙ্গল, তাদের পক্ষে সমাজ সংস্কার, সমাজ বদল থেকে জনগণের মুক্তি থেকে দেশ-স্বাধীনতা কোন কিছুই অসম্ভব হয় না। ইতিহাসের পাতায় এ কথার স্বপক্ষে দৃষ্টান্তের অভাব নেই। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং স্বাধীন বাংলাদেশ। রাশিয়ার নেতা ভøাদিমির ইলিচ লেনিন ও তার রাশিয়ান কমিউনিস্ট পার্টি (বলশেভিক), চীনা কমিউনিস্ট পার্টি এবং তার নেতা মাও সেতুং, বর্তমানে যাকে মাও জে দং বলা হয়। এছাড়া কমিউনিস্ট পার্টি অব ভিয়েতমান এবং হোচি মিন। এসব মহান বিপ্লবী নেতা ছাড়াও মহান সংস্কারক নেতা, মালয়েশিয়ার মহাথীর মোহাম্মদ, সিঙ্গাপুর ও তার নেতা লি কুয়ান এসব দৃষ্টান্তের উল্লেখযোগ্য নাম।

এসব উদাহরণ দেখে অনেকেই অপ্রাসঙ্গিক এবং অসামঞ্জ্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত বা বাড়াবাড়ি ভাবতে পারেন। অতীতে এমন ভাবনার দৃষ্টান্ত অনেক আছে। সূচনায় এ রকম মানুষকে অনেকেই ‘পাগল’ বলতেও দ্বিধা করেনি। ঐসব দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী মানুষেরা সেসব কথায় পিছু হটেননি। নিজেদের কর্তব্য-কাজ করে গেছেন। যার ফল ভোগ করছেন দেশের মানুষ। সাহিত্য একাডেমির একযুগ একদিন শতযুগে পা রাখবে। তখন শতযুগের সেই মানুষেরা সবই স্বাভাবিক মনে করে নেবে। সেদিন সেই মানুষেরা আজকের সাহিত্য একাডেমির ফলই ভোগ করবে। ভেবে দেখার প্রয়োজনই অনুভব করবে না যে, কার গাছের ফল তারা ভোগ করছে। সেদিন শতযুগের সাহিত্য একাডেমি আজকের মতো অসম্পূর্ণ মনে হবে না। পূর্ণ ফলবতী সেদিনের সাহিত্য একাডেমি সাহিত্যানুরাগীদের মনের সব চাহিদা পূরণ করবে। সেদিন মোশাররফ হোসেনকে স্মরণ করবে কিনা, কে জানে। তবে সাহিত্য একাডেমির ইতিহাস ধারণ করবে মোশাররফকে। মোশাররফ হোসেনের স্বপ্ন সেদিন পূর্ণতা পাবে, সেকালের সাহিত্য একাডেমির আসরে যারা থাকবেন। যাদের মন ও মস্তিষ্ক পরিপূর্ণভাবে বিকাশ লাভ করবে সাহিত্য একাডেমির প্রভাবে। সেদিনের বাঙালি কমিউনিটির সব সদস্য একবাক্যে স্বীকার করবে সাহিত্য একাডেমির উপযোগিতা এবং যারা গোড়াপত্তন করেছিলেন মোশাররফ নামের হার না মানা যুবক।

কলকাতার কফি হাউজ যেমন আজও কলকাতার বাঙালি মননকে স্পর্শ করে মেদুর করে তোলে। কফি হাউজের সেদিনের সেই আড্ডাটা আজ না থাকলেও তার প্রভাব জেঁকে বসে আছে বাঙালির মস্তিকে। পূর্ব বাংলার মানুষের মনও কাতর হয়ে ওঠে কফি হাউজের কথায়। পূর্ব বাংলার সাহিত্যানুরাগী মানুষেরা কলকাতায় গিয়ে কফি হাউজের স্পর্শকাতরতা মেটাতে চায়। সেদিন হয়তো একনিষ্ঠ স্বেচ্ছাকর্মী শিউলি ভাবি, পপি আপা, পলি বা বেনজির থাকবেন না। অন্য কোন নামের কেউ থাকবেন। পরিচালকও অবশ্যই নতুন কেউ থাকবেন। সাহিত্য একাডেমি এবং যার ব্রেইন চাইল্ড সাহিত্য একাডেমি, সেই মোশাররফ হোসেনের কথা ইতিহাসের বিবেচনায় রেখে দিয়ে আজকের প্রত্যাশা, সাহিত্য একাডেমির যুগপূর্তির উদযাপন সফল হোক। সার্থক হোক। জয়তু মোশাররফ হোসেন। জয়তু সাহিত্য একাডেমি। ইতিহাসের সুবর্ণ পথে তার যাত্রা এগিয়ে যাক।

লেখক : প্রধান সম্পাদক, ঠিকানা, নিউইয়র্ক।

১৯ নভেম্বর ২০২২