সাড়ে তিন হাত দেহের জন্যে তিন হাত ঘর যথেষ্ট না

সেই সব নানা রঙের দিনগুলি (পর্ব-৩০)


শামসুল আরেফিন খান
যুক্তরাষ্ট্রে ঘন্টাপ্রতি সর্বনিম্ন মজুরি হার এখন ১০ ডলারে ডলারে উঠেছে। কোথাও সাড়ে ১২ ডলার। কোন কোন রাজ্যে ১৫ ডলারও হয়েছে।সর্বনিম্ন মজুরি মানে যার কম কাউকে অফার করা যাবেনা। তবে গরজ বড় বালাই। যারা বৈধ অভিবাসী না ,তারা স্বেচ্ছায় অনেক কম মজুরি নিয়ে চোরাগুপ্তা কাজ করছেন। মালিকরাও তার শতভাগ ফায়দা লুটে নিচ্ছে। সেটাও ওপেন সিক্রেট। এদেশের সুধীমহল এ সময় লিভিং ওয়েজের উপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। লিভিং ওয়েজ মানে বেঁচে থাকার মত মজুরি। সর্বনিম্ন মজুরি দিয়ে মানুষের জীবন চলেনা। তার মধ্যে আবার অনেক ছলচাতুরি ও ফাঁক ফোকর আছে। সে সবের ভিতর দিয়ে শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ গলে বেরিয়ে যায। স্থায়ী, ফুলটাইম ও পার্ট টাইমের মধ্যে রয়েছে অনেক গোমর। কর্পোরেট ও রিটেলের মধ্যেও অনেক ফারাক। ফুলটাইম মানে সপ্তায় ৫ দিন ৮ ঘন্টা করে ৪০ ঘন্টা কাজ। সেই সাথে রিটায়েরমেন্ট-গ্রাচ্যুইটির প্রাপ্যতা। পারিশ্রমিক গোড়ায় ঘন্টায় ১৫ ডলার। উপরে মাথা ঠেকবে আকাশে। যোগ্যতাই মাপকাঠি। কর্পোরেটে ফুল টাইমারই বেশি। তারা স্বাস্থ্য বীমাসহ আরও কিছু বাড়তি সুযোগ পেয়ে থাকেন্। রিটেলে নিম্নতম মজুরিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সপ্তায় সর্বোচ্চ ৩০ ঘন্টা কাজের সুযোগ মেলে। তাতে আবার স্বাস্থ্যবীমা নিয়ে সংশয় থাকে। স্বামীস্ত্রী মিলে কাজ করে কোন রকমে জীবন অবশ্য কেটে যায়। ১৮-২২ বছর অবধি শিশু ও ৬৫ উর্ধ্ব প্রবীণদের জন্যে ভর্তুকি ও সামাজিক নিরাপত্তার একটা ঢালাও ব্যবস্থা রয়েছে বলে নিম্ন আয়ের ৩০ ভাগ মানুষের দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়না। সবার জন্যেই কষ্টের যায়গাটা হচ্ছে বাড়ি ও গাড়ির কিস্তি। সার্বজনীন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার একটা গড়পরতা ব্যবস্থা শ্রেণী বিভক্ত পুঁজিবাদী সমাজের বাইরের চাকচিক্য ও ফিটফাট অবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছে। তবে বাস্তবতার নিষ্ঠুর গল্পটা এই যে শিকাগোর ‘হে- মার্কেট ট্রাজেডির’ সময় থেকে সর্বোচ্চ আট ঘন্টা শ্রম সময় নির্ধারিত থাকলেও এখনও ১০/১২ ঘন্টা কাজ না করলে বাঁচার মত আয় হয়না। তবে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক , সব ধরনের কর্মক্ষেত্রের জন্যে অভিন্ন জাতীয় মজুরি ও বেতন স্কেল থাকায় শ্রমজীবী ও কর্মজীবী মানুষ অনুন্নত, উন্নয়নকামী ও উন্নয়নশীল দেশের সাধারণ মানুষের চইতে অনেক সুখে আছেন। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থাও নাকি একসময় খুবই করুণ ছিল। “শিয়ালের ছিল গর্ত, পাখির ছিল নীড়। কিন্তু মানুষের জন্যে মাথা গোঁজার ছিল না কোন ঠাঁই”। আজও এদেশে রাস্তায় বের হলে অসংখ্য ‘হোমলেস’ মানুষের দেখা মেলে। সরকারী ভর্তুকিতে তাদের পেট ভরে। কিন্তু ঘর জোটে না। বৌ জুটলে সংসার জোটে না।
এদেশের শাসক ও পুঁজি মালিকদের চুয়ানো অর্থনীতি বেঁচে আছে মাছের তেলে মাছ ভাজার অভিনব ‘’রণকৌশলে’। ভরাডুবিতে ব্যবসা ধসে গেলে বা বসে গেলে মালিক নিজেকে দেউলে ঘোষণা করে হাত ধুয়ে বেরিয়ে পড়ে সব দায়মুক্ত হয়। গরীবের কাজ চলে যায়। কিন্তু বেকার ভাতা ও ক্রেডিট কার্ডের কল্যাণে বাজার সওদা, কেনাকাটা, গাড়িবাড়ির কিস্তি দেয়া বন্ধ হয়না। কর্মসংস্থান বা চাকুরিও জুটে যায়। একটা না হলে আর একটা। ব্যবসা বাণিজ্য বেচে যায় ব্যাপক ও সার্বিক মন্দা থেকে। এই উদার শোষণ নীতির ব্যাপক আযোজনের মাঝে বাংলাদেশের পোষাক শিল্প নিশ্বাস নেয়ার মত একটা অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে চীন , ভারত, ভিয়েৎনাম কমপুচিয়ার কনুইগুতার মধ্যেই। অস্ট্রেলিয়া , কানাডা , জার্মানি ও ই-ইউসহ পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশের পোষাক শিল্প নিজগুণে স্বদেশের ব্রান্ড এমবেসেডারের ভূমিকা পালন করছে বলা চলে। পোষাক শিল্পই বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একটা স্বস্তির জায়গায় পৌঁছে দিয়ে চাঙ্গা রেখেছে।
তৈরি পোষাকই এ সময় বাংলাদেশের প্রধান শিল্প ও বাণিজ্য খাত। এক কোটির উপর প্রবাসী শ্রমজীবী বাঙালির ঘামে ভেজা ডলার -রিয়াল-পাউন্ড- ইউরোর সাথে যুক্ত হয়েছে পোষাক খাতের অসামান্য রপ্তানিমূল্য। তাতেই গড়ে উঠেছে গর্ব করার মত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যা’ সুনামি ঝাপ্টাও সইবার শক্তি দিচ্ছে। ব্যাংক ডাকাতি হচ্ছে দেদার।
‘মা-মু ‘র ভাষায় “চার হাজার কোটি টাকা লোপাট হওয়া তেমন কোন ব্যাপারই না”। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভোল্টে হ্যাকাররা অবাধে ঢুকছে। বের হচ্ছে। শেয়ার বাজার থেকে হাজার হাজার স্বল্প আয়ের মানুষের শেষ সম্বল ও নিশ্চিন্ত বাঁচার লালিত স্বপ্ন হারিয়ে যাচ্ছে ‘সর্বদলীয় রাঘব-বোয়ালদের’’ উদরে। তবুও জাতির অহঙ্কার পদ্মা সেতু বিশ্ব ব্যাংকের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে নিরবধি মাথা তুলছে “নিজস্ব অর্থায়নে”। মিশরের মুক্তিদাতা কর্ণেল নাসের একদা সাম্রাজ্যবাদের লাল চোখ উপেক্ষা করে বিশ্ব ব্যাংকের গালে পাল্টা চপেটাঘাত করেছিলেন বিকল্প অর্থাযনে আসোয়ান বাঁধ বানিয়ে। চিরকালের ঊষর মিসর তার ধূসর চেহারা কাটিয়ে শস্য শ্যামল হয়ে উঠেছিল সেই সাহসিকতায়। কর্ণেল নাসেরকে সাহস যুগিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চেকোশ্লোভাকিয়া। কিন্তু ৭৫ বছর পর বাংলার হিমালয় কন্যাকে সাহস যুগিয়েছে বিকাশমান পোষাক শিল্পের প্রায় ৪৫ লাখ শ্রমিক। তার ৯০ ভাগই নারী। তারাই নারী স্বাধীনতা ও নারীর ক্ষমতায়ন ও নারী অধিকারের ভ্যাগার্ড। পাশাপাশি প্রায় সোয়া কোটি প্রবাসী বাঙালি তো আছেই। সবাই মাথার ঘাম পায়ে ঢেলে জাতির জনকের সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন পূরণ করতে অবদান রাখছে। কিন্তু নেপোয় মারে দই।
বাপের ভিটেমাটি বন্ধক রেখে ও মায়ের নাকফুলটা পর্যন্ত বেচে দিয়ে তারা প্রবাসে এসেছে। “নব্য ক্রীতদাস” হয়ে তেল সাম্রাজ্যবাদ ও নয়া উপনিবেশবাদের শিকল পায়ে পরে রক্তপানি করছে। তাদের স্বার্থ দেখার কেউ নেই। কত জনই তো লাশ হয়ে ফিরছে। শত শত মানুষ কারণে অকারণে কারারুদ্ধ থাকছে। কত নারী নির্যাতনের চিহ্ন নিয়ে সব হারিয়ে শূন্য হাতে দেশে ফিরছে। তাদের দেখভালেরও কেউ নেই।
গার্মেন্টস শ্রমিকদের অবস্থারও তেমন কোন ঊনিশ বিশ নেই। ৩০ বছর আগে যার একটা কারখানা ছিল। ৩০ জন শ্রমিক কাজ করতো। এখন সেই মালিকেরই নামে বেনামে ৩০০ শ্রমিকের ১০ কারখানা হয়েছে। কাগজে কলমে একটায় লাভ; চারটায় লাভ-লোকসান সমান সমান; ৪টায় ডাহা লোকশান। ট্যাক্স ফাঁকির সুবর্ণ ব্যবস্থা। কিন্তু প্রত্যেক ফ্যাক্টরির নামে কাপড় ও নানা উপকরণ আমদানিতে ওভার ইনভয়েস করে টাকা পাচার ,আড়াইশ গজের শুল্ক দেওয়া গাট্টিতে ৩৫০ গজ কাপড় আমদানি করে ১০০ গজ ইসলামপুরের কালো বাজারে চড়া দামে বেচার মহোৎসব এখনও অবিরাম চলছে অবাধে। আজও সেই আগের নিয়মই বহাল অছে চোরা পথের কানা গলিতে। তখনও শ্রমিক স্বার্থ রক্ষায় দও কষাকষির জন্য রেজিস্টার্ড বারগেনিং এজেন্ট ছিলনা। এখনও নেই। প্রত্যেক কারখানায় আইনসম্মত ট্রেড ইউনিয়ন চালু করে ঝামেলামুক্ত সুস্থ উৎপাদনমুখী পরিবেশ সৃষ্টি করে শতভাগ কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রসহ সব আমদানিকারক দেশের ক্রেতাগোষ্ঠী। কিন্তু সবই অরণ্যে রোদন।
পেটে খেলে পিঠে সয়। শ্রমিক যদি খেয়ে পরে ভালো থাকে তাহলে উৎপাদন ভালো হয়। এ কথাটা পাশ্চাত্যের মুনাফাখোর মালিকরা বুঝেছেন সেই মার্কিন সিভিল ওয়ারের সময় থেকে। কিন্তু বাংলাদেশের অতিমুনাফাখোর মালিকগোষ্ঠী শুনেও শোনেনা, বুঝেও বুঝেনা। তাদের রয়েছে টাউট শ্রমিক নেতা। ভাড়াটে গুন্ডা। হালে শিল্প পুলিশ নামের উর্দিপরা তস্কর। রয়েছে ইন্সপেক্টর। তারা সরেজমিন আসেনা, ঘরে বসে রিপোর্ট লিখে মাসহারা খায়। আসবেই বা কেমন করে? সাড়ে তিন হাজার পোষাক কারখানার জন্যে মাত্র আড়াইশ পরিদর্শক। হালাল খেলে তাদের রাতের ঘুম হারাম হয়।
পক্ষান্তরে রক্তশূন্য শ্রমিকের আছে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতা। ঐক্যের বল ও জোট ক্ষমতা। বাংলাদেশে শোষক জনসংখ্যার অনুপাতে এখনও মাত্র শূন্য দশমিক ১ ভাগ। ইউরোপ আমেরিকাসহ পুঁজিবাদী দুনিয়ায় শোষক যেখানে ১%। তারাও গরিষ্ঠ সংখ্যার সাথে পেরে না উঠলে হেফাজত নামিয়ে দিয়ে হিলারিকে কুপোকাত করে দেয়। কিন্তু পাশ্চাত্যের সৌভাগ্য যে তাদের অখেরাতের ‘হেফাজত’কারীরা আইফেল টাওয়ার থেকে নেমে এসে বলেনা যে, শ্রমিককে পেটে পাথর বেঁধে গীর্জায় পড়ে থাকতে হবে স্বর্গসুখের আশায়। এও বলেনা যে মেয়েরা চার কেলাসের বেশি পড়তে পারবেনা। কিন্তু তাদেরকে চিকিৎসার জন্যে নারী ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। তারা জানে নারী ডাক্তার আকাশ থেকে পড়বে না ইভের মত্। এতটুকু আক্কেল অন্ততঃ আছে তাদের।
আমার দেখা ৩০ বছরে বহু কান্নাকাটি দেন দরবার ও হরতাল ধর্মঘট করে ১৫ শত টাকা নিম্নতম মজুরি ৮০০০ টাকায় উন্নীত হয়েছে। তখন বস্তির ঘরভাড়া ছিল মাত্র ১০০(একশ)টাকা। পেঁয়াজ একটাকা। বেগুন পঞ্চাশ পয়সা। এ সময় দুহাজার টাকার নিচে চিত হয়ে শোয়ার কোন ঘর মেলেনা। অবৈধ বিদ্যুৎ গ্যাস ও পানির লাইন সহ বস্তির একটা আলোবাতাসহীন ঘিঞ্জি ঘর চারজন মিলে পাঁচ হাজার টাকায় নিয়ে ঠাসাঠাসি করে মাথা গুঁজে তিন বোন ও মা শ্রমিকের একটা পরিবার। আমি তাদের চিনি। ৮ হাজার টাকায় তাদের জীবন চলে না।
বামপন্থী প্রান্তিক গোষ্ঠীর চিন্তাবীদরা দাবি করেন, লাভজনক পোষাক কারখানার শ্রমিকের বাচার মত নায্য মজুরি কম করে ২০,০০০ টাকা হওয়া উচিত। সিপিডির দাবি সাড়ে ২২ হাজার টাকা। আমি হিসাব করে দেখলাম, ঘন্টায় এক ডলার হারে সপ্তায় ৪০ ঘন্টা অর্থাৎ মাসে ১৬০ ঘন্টায় ১৬০ ডলার @ ৮০ টাকা হারে মজুরি পেলে বাংলাদেশের অদক্ষ পোষাক শ্রমিক বিশ্বায়নের যুগে এক মাসের মজুরি বাবদ পাবে কম করে ১২,৮০০ টাকা। বামদের হাটু কোমর শিরদাড়া সবকিছু যদি ভাঙা না থাকতো তা হলে আমাদের দেশের পোশাক শিল্পের শ্রমিকরা হয়ত সেটা পেতো। কিন্তু এটাই শেষ কথা হতে পারেনা। চীনে ২০% মজুরি বেড়েছে। তাতেই তারা গারসেন্টস সহ অনেক শিল্পকারখানা নিয়ে আমাদের মত স্বল্প মজুরির মানব সম্পদের দেশে দৌড়াদৌড়ি করছে। লন্ডনে কিংবা নিউইয়র্কে অনেকদিন থেকেই কোন পোষাক কারখানা নেই। একপ্রস্থ তৈরি পোষাকের মুনাফায় ভাগ বসায় দেশের বায়িং হাউজ ও অসাধু আমলা ও উর্দিপরা কামলার সাথে বিদেশে হোলসেলার ও রিটেলার। প্রযুক্তি দিয়ে খরচ কমানো যায়না। এসব কারনে মজুরিবৃদ্ধির সঙ্কট থেকেই যায়। তবে ২০৪১ সালে উন্নত দেশের কাতারে উঠে আগামী প্রজন্ম হয়ত রোবটের সাথে ঘর করার কথা ভাববে। বাংলাদেশও তখন বিদেশ থেকে নানা রঙের পোষাক আমদানি করবে। ততোদিনে হয়ত সমস্যাটাও সয়ে যাবে। মালিকের বেশুমার মুনাফার ওপর লাগাম পরাণোটাও বেশ কঠিন হবে। কারণ যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন পোষাক শিল্পের মালিকদের হাতেই থাকবে রাষ্ট্রের নিয়ামক ক্ষমতা।
(২): ১৯৮৮ সালে সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে ৩ বার জেল খেটে রাজনীতির মাঠে আমার বেশ নামডাক হয়েছিল। হাকডাকও ছিল তেমনি চড়া। “বিষ নেই কুলোপানা চক্কর”। আমার দল মানে আমি যে পার্টির স্বঘোষিত চেয়ারম্যান ছিলাম, অধুনালুপ্ত সেই দল সুডো বাম ইউপিপি তখন সাতদলীয় ঐক্য জোটের ২ নম্বর শক্তি। আমার মিছিলে খুব বেশি হলে ৫০০ লোকই হয়। কিন্তু লালপতাকা হাতে যখন গোলাপ শাহ মাজারে জনসভার দিকে লাইন করে আসে তখন মনে হয় রেড আর্মি আসছে। করতালির হিড়িক পড়ে যায়। জনসভায় আমি তিন নম্বর শেষ বক্তা। কাগজে নাম জাহির হয় লাগাতার। এদিকে রেজিস্টার্ড ন্যাশনাল ফেডারেশন #১০, বাংলা শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি হওয়ার সুবাদে সর্বদলীয় “শ্রমিক কর্মচারি ঐক্য পরিষদ “কপ’ এর সদস্য এবং শ্রম দপ্তরের ত্রিপক্ষীয় উপদেষ্টা কমিটিরও মেম্বার। এরকম একটা রম রমা সময় আমার বাজার দর বেশ চড়া হওয়ারই কথা। এমতাবস্থায় একদিন দুপুরে আমার ইন্দিরা রোডের পায়রার খোপের মত বাসায় হঠাৎ করেই আসলেন একজন নামজাদা গার্মেন্টস মালিক। তিনি সাবেক উপমন্ত্রী ও একজন হোমরা চোমরা বড় ব্যবসায়ী। তার নামের শেষ শব্দ ‘মুনশি’। তিনি আসলেন আমারই এক স্বল্পপরিচিত শুভাকাঙ্খী বন্ধুকে সাথে নিয়ে। বন্ধুবর হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা থাকতে আমার সুপারিশে বিনা বকশিশে অনেকের ভর্তি ও চিকিৎসার ব্যাপারে সাহায্য করেছেন। আমি তাঁর কাছে ঋণী। বিশিষ্ট মেহমান চায়ের কাপে হাত না বাড়িয়ে পকেট থেকে চেক বই বের করলেন। কোন ভূমিকা না করেই চেকের কয়েকটা খালি পাতা সই করে আমার সামনে পুরো বইটাই রেখে দিলেন নজরাণা দেয়ার কায়দায়। অকাতরে বললেন, “আপনি যে কোন পরিমান টাকার অঙ্ক বসিয়ে নেবেন”। আমি তো হতভম্ব ! ব্যাপার কী? আমার সেই বন্ধু বললেন ,‘ ভাই, আজ সকালে কাঠাল বাগানের যে পোষাক কারখানায় আপনি শ্রমিক জনসভায় বক্তব্য রেখেছেন, ইনি সেই কারখানার মালিক’। আমি বললাম, তো? এবার সেই মালিক ভদ্রলোকই আমার হাত জড়িয়ে ধরে বললেন,“ ভাই আমাকে বাচান্। আমি কিছুই জানিনা কী করে মেয়েটা খুন হ’ল। এখন তো সব দায় আমার ঘাড়ে। আপনিই কেবল পারেন আমাকে বাঁচাতে। আপনি যা বলেন আমি তাই করবো। আমি জানি, শ্রমিক নেতারা আপনার কথা শুনবে। আপনি বললে ওরা একটা মীমাংসায় আসবে। না হলে আমি শেষ”।
আমি বললাম ,ভাই আপনি চেক বইটা আগে তোলেন। মানির মান আল্লাহ রাখে। আপনি বরং মৃত রেশমার বাবামার সাথে মীমাংসা করেন গিয়ে। ওদের ব্লাড মানি দেন। পরিবারটাও বাঁচুক, আপনিও বাঁচেন। সেটা বরং আইন সম্মত হবে। ব্লাড মানি দিয়ে সৌদি আরবেও কল্লা বাঁচানো যায়। শ্রমিক নেতাদের ব্যাপারটা আমি দেখবো। আমি কোন অন্যায়ের সাথে থাকিনা। আমাকে যারা চেনেন তারা সবাই এ ব্যাপারে সাক্ষী দেবে।
সে সময় গার্মেন্টস সেক্টরের কয়েকজন শ্রমিক নেতা আমার পাশে ঘুরঘুর করতো। নেতা নামের কলঙ্ক তারা। শ্রমিক স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে মালিকের স্বার্থ হাসিল ও তার বিনিময়ে নিজের আখের গোছানোই তাদের মোক্ষ। তারাই আমাকে কাদাজলে চুবিয়ে মারার ব্যবস্থাটা করেছিল। তাদের মধ্যেএকজন ছিলএকটু ভদ্র ও নিরীহ । আমি তাকে জোনাকির আলোয় পথ চেনার দীক্ষা দিয়েছিলাম। ফলাফল মেপে দেখিনি। তবে এখনও সে টিকে আছে। দুশতাধিক অনিবন্ধিত গারমেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের একটা হ’ল ‘জাতীয় গারমেন্টস শ্রমিক লীগ। নামে লীগ। কিন্তু বহু তেলখড় পুড়িয়ে শ্রমিক লীগের স্বীকৃতি পায়নি। ছাল নাই কুত্তার নাম বাঘা। সেটারই সে আজীবন সভাপতি। চেহারাটা এখনও তেল চক চকে হয়নি। তাতে অবশ্য একথা ভাবার কোন কারণ নেই যে, সে যথেষ্ট পরিমাণ ভিটামিন গিলছে না। সম্ভবতঃ দুর্বল পেশী নিয়ে বেশি দূর এগোতে পারেনি। গারমেন্টস শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির সাম্প্রতিক আন্দোলনের পটভূমিতে সেদিন ‘বি.জে. এম.ই’-র সভাপতির পাশাপাশি একাত্তর টেলিভিশনের পর্দায় দেখে তাকে চিনতে কষ্ট হয়নি। কাকতালীয়ভাবে অতীত ও বর্তমানের দুটো প্রেক্ষাপটের মধ্যে মিল খুঁজে পেলাম।
এবারে একজন সুমন মিয়া প্রাণ দিয়েছে। ঘটনাচক্রে বুকে গুলি নিয়ে রক্ত ঢেলে দিয়েছে আন্দোলনের কোপানো মাটিতে। তবে ঢেউ উত্তাল হওয়ার আগেই আন্দোলন কুলে আছড়ে পড়ে খিতিয়ে গেছে। আগের বারে আমি ক্ষতিগ্রস্ত পারিবারকে ‘ব্লাড মানি’ পাইয়ে দিতে সক্ষম হযেছিলাম। কারণ কাজের জায়গায় খুন হওয়া মেয়েটার পরিচয় সঙ্কট ছিল না। কিন্তু সুমন মিয়া কে? সে নাকি অস্থায়ী শ্রমিক। তার তো কোন আইডি নেই। কাজেই ক্ষতিপূরণের কোন প্রাপ্যতাও নেই তার । মালিকদের ভাবটা এমনি। কিন্তু সে তো একজন গতর খাটানো মানুষ। দুপুরে কারখানা থেকে বেরিয়ে একপেট ক্ষুধা নিয়ে ডেরায় ফিরছিল চারটে ডালভাত গেলার জন্যে। কিন্তু যে বুলেট তার ক্ষুধা মিটিয়ে দিলো সেটা তো পরিচয়হীন না। বেসরকারিও না। দেশটাও অভিভাবকহীন হয়ে পড়েনি ৮৮সালের মত। বরকত সালাম রফিক অওয়ালের পরিচয় নিয়েও ১৯৫২ সালে প্রশ্নরাখা হয়েছিল। বলা হয়েছিল ওরা তো ছাত্রনা। তাতে কী ? ইতিহাসকী মুখ মুড়িয়ে পিছন দিকে হাঁটা দিয়েছিল? সুমন মিয়া যেই হোক না কেন , বদলি শ্রমিক হোক আর অনিয়মিত শ্রমিকই হোক , তাকে বেওযারিশ বানিয়ে তার পরিবারকে অকূলপাথারে ভাসিয়ে দেয়া যাবেনা। সেও এখন একাত্তরের তিরিশ লক্ষ শহীদের জ্ঞাতি। মনুমিয়া- নূর হোসেনদের বংশধর। মানি- মিডিয়া -মাসেল ও পুলিশ ভাড়া করে হালে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়া মালিকরাও পার পাবে না। মহাজোটের মহাবিজয়কে কলঙ্কিত করতে কোন গোপন ষড়যন্ত্র যদি তাকে মৃত্যু দিয়ে থাকে তাও গোপন থাকবে না। থলির বিড়াল ঠিকই বেরিয়ে পড়বে। পঞ্চাশ দশকে দেখতাম শাসকরা সব রক্তপাতের মধ্যে ভারতের ষড়যন্ত্র খুঁজে বের করাতে সচেষ্ট হতো। আর ইদানিংকালে দেশের বর্ধিষ্ণু বেসরকারি খাতের ৫০ লক্ষ শ্রমিক যখন রক্তপানি করা ত্যাগের বিনিময়ে পাওনার কড়িটা বুঝে নিতে মাথা তোলে তখনই ভন্ড শ্রমিক নেতা, ভাড়াটে গুন্ডা ও ঘুষখোর প্রশাসনের সহায়তায় তাদের “দাবায়ে” রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করা হয়। তাতেও রক্তচোষা মালিকরা ক্ষান্ত হয়না। তারা নিজেদের প্রতারণা চন্ডনীতি ও ছলচাতুরি ঢাকার জন্যে বিদেশী চক্রান্ত খোঁজা শুরু করে।
আমাদের পোষাক শিল্প ধ্বংস করতে ভারত-চীন -ভিয়েৎনাম-কম্পুচিয়া ছাড়া আর কে ষড়যন্ত্র করবে? মালিকরা এবারেও মামুর ঘাড়ে দোষ চাপাবার চেষ্টার কমতি করেনি। কিন্তু প্রাচীন রোমক কিংবদন্তীর দেবতা “জেনাস”এর মত সামনে পিছনে দুই দুই করে চার জোড়া চোখ নিয়ে যিনি চৈনিক দার্শনিক “মেনসিয়াস”এর ফরমূলায় জনগনের মা-বাবা হয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রয়াস পাচ্ছেন তিনি তো নিশ্চই জানেন , ‘সাড়ে তিন হাত দেহের জন্যে তিনহাত ঘর এমনকি সাড়ে তিনহাত ঘরও যথেষ্ট না’। কাজেই আমি আশাবাদী। গ্লাসের একভাগ যখন পূর্ণ হয়েছে আর একভাগও পূর্ণ হবে। গারমেন্টস শ্রমিকরা পুরেপিুরি সুবিচার পাবে ইনশাল্লাহ।
ক্যালিফোর্নিয়া।