সিক্স বাই সিক্স যে ঘরে জন্ম ঠিকানার — মাহবুবুর রহমান

সিক্স বাই সিক্স। স্কাইলাইন রেস্তোরাঁর ছোট্ট একটি কক্ষ। অনেক দিন হয়, ওদিকে আর যাওয়া হয় না। স্কাইলাইন রেস্তোরাঁটি কি এখনো আছে? সম্ভবত না। জানতে ইচ্ছে করে, ওই রুমটি কি অবিকল তেমনি আছে? ছয় বাই ছয় ফুট রুমে দুটি ছোট টেবিল। এক টেবিলে শাহীন ভাই, আরেকটিতে আমি। দু-তিনটে চেয়ার। ফোন-ফ্যাক্স, কাগজ-কলমসহ টুকটাক প্রিন্টিং সরঞ্জাম। সবার অজান্তে রুমটি ইতিহাসের অংশ হয়ে গেল। কারণ, ঠিকানার জন্ম এ ঘরেই।
১৯৮৯ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ইমিগ্র্যান্ট হয়ে নিউইয়র্কে পা রাখি। সে সপ্তাহেই ছিল জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের অভিষেক, ডাউনটাউন ম্যানহাটানে। প্রধান অতিথি সিলেট মহিলা কলেজের প্রিন্সিপাল হুসনে আরা আহমদ। বিশেষ অতিথি প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. সাদুজ্জামান চৌধুরী, জালালাবাদের সে সময়কার সভাপতি মরহুম সিরাজউদ্দিন আহমদ ও সাধারণ সম্পাদক এম এম শাহীন। অভিষেকে আমিও আমন্ত্রিত। সেখানে প্রথম পরিচয় এম এম শাহীনের সঙ্গে। সুদর্শন, স্মার্ট এক যুবক! তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতার আলামত পেলাম সে অনুষ্ঠানেই।
অভিষেকের পর শাহীন ভাই বললেন, একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছি আমরা। কৌশিক আহমদ আছেন আমার সঙ্গে। আপনি জয়েন করলে খুব খুশি হব। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে কোনো বাংলা সাপ্তাহিক পত্রিকা ছিল না। ছিল একটিমাত্র পাক্ষিক। শাহীন ভাইয়ের আহŸানে সাড়া দিলাম, যদিও নিকট দু-একজন আত্মীয় স্মরণ করিয়ে দিলেনÑস্ত্রী ও দুটি সন্তান আমার ওপর নির্ভরশীল! আমি কি তাদের সাপোর্ট দিতে পারব? তখন ওসব আমার ভাবনায় ছিল না। একটি পত্রিকার জন্মে যে আনন্দ-বেদনাÑআমি তার মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিলাম!
যথারীতি কাজ শুরু হলো। শাহীন ভাই, আমি ও কৌশিক আহমদ। পরপর কয়েকটি বৈঠক হলো আমাদের। তিনজনের নামে বের হলো একটি আবেদন (ফ্লায়ার)। তা বিতরণ শুরু হলো চারদিকে। জানাজানি হলোÑআসছে একটি নতুন পত্রিকাÑসাপ্তাহিক ঠিকানা! স্কাইলাইন রেস্তোরাঁর অন্যতম মালিক ছিলেন শাহীন ভাই। সেই রেস্তোরাঁর কোণের একটি ছোট্ট রুম ঠিক করা হলো ঠিকানার অফিসের জন্য।
স্কাইলাইন রেস্তোরাঁ ছিল সে সময় বাঙালি কমিউনিটির প্রিয় জায়গা। সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাÐের প্রাণকেন্দ্র। নিউইয়র্কের অন্যতম প্রধান সংগঠন বাংলাদেশ লীগ অব আমেরিকার অলিখিত প্রধান কার্যালয়ও ছিল স্কাইলাইন। পাশের পার্কে প্রচÐ শীতে অস্থায়ী শহীদ মিনার বানিয়ে একুশে পালন করতেন বাঙালিরা। শাহীন ভাই ছিলেন লীগের প্রাণপুরুষ। ওখানে অনেকের সঙ্গেই আমার প্রথম সাক্ষাৎ-পরিচয় হয়েছে। তাঁদের মধ্যে মরহুম ডা. খন্দকার আলমগীর, ডা. সারওয়ারুল হাসান, ইলিয়াস কবির, লাকী খালেক, মরহুমা রাণী কবির, এমাদ চৌধুরী, আব্দুল মোসাব্বির, ফখরুল আলম, মরহুম জাহাঙ্গীর, সৈয়দ বশারত আলী, বেদারুল ইসলাম বাবলা, সোহেল খালিক, হাসিব চৌধুরী, জনাব সেলিম, জনাব কোবাদ, আব্দুল কাদির চৌধুরী শাহীনসহ ছিলেন আরো অনেক।
স্কাইলাইনের প্রধান শেফ রে’র কথা ভুলব না। চমৎকার রাঁধতেন। এর বাইরের জগৎ নিয়েও ছিল প্রচুর আগ্রহ। মাঝেমধ্যে আলাপ হতো। ভুলব না মাইককে। সাহেবি চেহারার মাইক ছিল শাহীন ভাইয়ের প্রচÐ ভক্ত। যখন-তখন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিত।
শাহীন ভাই কোম্পানি রেজিস্ট্রেশনসহ আনুষঙ্গিক কাজ এগিয়ে নিচ্ছিলেন। একদিন আমার এস্টোরিয়ার বাসায় এসে বললেন, মাহবুব ভাই, আপনি আমাদের মধ্যে সিনিয়র, সম্পাদক হবেন আপনি। বললাম, না, তা হয় না। আমি নতুন। সবে এসেছি। এ দায়িত্ব পালন আমার জন্য কঠিন হবে। পরে আমাদের তিনজনের বৈঠকে আমি প্রস্তাব করলাম এম এম শাহীন হবেন সম্পাদক, কৌশিক আহমদ নির্বাহী সম্পাদক। তখন দুজনই জানতে চাইলেন, আমার অবস্থান কী হবে? বললাম, বার্তা সম্পাদক। এটিই চ‚ড়ান্ত হলো। প্রিন্টার্স লাইনে তা-ই ছাপা হলো।
শাহীন ভাই লন্ডনের বহুলপ্রচারিত সুরমার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হলেন। সবকিছু কম্পোজ করে ‘এক্সপ্রেস’ মেইলে পাঠিয়ে দেবে, এখানে আমরা শুধু পেস্ট করব। নিউইয়র্কে তখন বাংলায় কম্পোজের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। খবর-লেখা সব ‘এক্সপ্রেস’ মেইলে সুরমায় পাঠিয়ে দেওয়া হতো। ওখানে কম্পোজ হয়ে ফিরে আসত আমাদের কাছে।
৯০-এর একুশে প্রথম সংখ্যা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে আমরা বুঝলাম, না, এভাবে হয় না। ওই সময়ের টেকনোলজি আজকের মতো নয়। নিউইয়র্ক-লন্ডন আনা-নেওয়া করে আর যা-ই হোক, পত্রিকা করা যায় না। এদিকে সম্ভবত, কাজ বাঁচানোর জন্য ‘সুরমা’য় যা ছাপা হতো, সব তুলে ক্লিপিং করে আমাদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। নতুন বিষয় কমই থাকত। পেস্টিং করার সময় প্রয়োজনে একটা অক্ষর পরিবর্তন বা পূরণ করা যেত না। মনে পড়ে, ছোট কাঁচি নিয়ে ঢাকার দৈনিক থেকে অক্ষর কেটে কেটে জোড়াতালি দেওয়া হতো।
শাহীন ভাই ইতিমধ্যে বুঝে ফেললেন সমস্যা গুরুতর! এভাবে লন্ডন-নিউইয়র্ক করে পত্রিকা করা যাবে না। কম্পোজের ব্যবস্থা নিউইয়র্কেই করতে হবে। চার সপ্তাহের জোড়াতালির পর শাহীন ভাই খুশির সংবাদ জানালেন! কম্পোজের জন্য কম্পিউটার ও প্রিন্টার কেনা হবে। একজন কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ (সম্ভবত তাঁর নামও শাহীন) সহায়তার হাত বাড়িয়েছেন। আরো খুশির খবর কম্পিউটার কম্পোজের জন্য একজন লোকও পাওয়া গেছে। তাঁর নাম মিসেস আফরোজা।
পত্রিকায় তখন সূচনা হলো নবপ্রাণের। সবকিছু নতুন। টাটকা-তাজা খবর, লেখা ও বিজ্ঞাপনে বের হলো নতুন এক ঠিকানা! হু-হু করে বাড়তে থাকল বিক্রি, একই সঙ্গে পাঠকপ্রিয়তা। সে সময় পাক্ষিক পত্রিকাটির সুনাম ও কাটতি ছিল বেশি, কিন্তু ছয় মাস পেরোতে না পেরোতেই ঠিকানা ছাড়িয়ে গেল পাক্ষিকটিকে। ছুটতে থাকল অবিশ্বাস্য জনপ্রিয়তায় সামনের দিকে। বাংলাভাষী মানুষের প্রধান মুখপত্রে সম্মানিত হলো ঠিকানা। পাক্ষিকটি তখন সাপ্তাহিকী হিসেবে উন্নীত হলেও প্রকাশনার স্ক্যাজুয়েল রক্ষায় ব্যর্থতা ও অন্যান্য কারণে পিছিয়ে পড়ল। এদিকে জয়যাত্রা অব্যাহত থাকল ঠিকানার।
শুরুতে ঠিকানাকে অনেক প্রতিক‚লতা মোকাবেলা করতে হয়েছে। ঠিকানার উত্থান সে সময়ে একটি মহল মানতে পারেনি। নানাভাবে অপপ্রচার হয়েছে। একবার বাংলা ভাষার এক রেডিওতে জঘন্য মিথ্যাচার করা হলো। বলা হলোÑঠিকানা যারা বের করেন বা কাজ করেন, তারা কস্মিনকালেও সাংবাদিক ছিলেন না।
আমরা ঠিকানার মার্কেট উন্নয়নে বিভিন্ন জায়গায় যেতাম। সভা-সমাবেশে ফ্রি ঠিকানা বিতরণ করতাম। পাঠক গড়ে তুলতে এটা খুব সহায়ক ছিল। একবার শাহীন ভাই ও আমি কানেকটিকাটে ডাক্তারদের এক সম্মিলনে কয়েক বান্ডিল ঠিকানা নিয়ে হাজির হলাম। কারণ জানি না, আমাদের ভেতরে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হলো না। অগত্যা, ডা. খন্দকার আলমগীরের রেফারেন্সে দোরগোড়ায় পত্রিকাগুলো রেখে চলে এলাম।
ঠিকানার স্কাটলাইনের দিনগুলো স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল। ছোট্ট রুমে কাজে ব্যস্ত! হঠাৎ নক হলো, সাজু ভাই (শাহীন ভাইয়ের অনুজ) বারে ডাকছেনÑমধ্যাহ্নভোজ, মজাদার সব খাবার। এক মেন্যু প্রতিদিন নয়, একেক দিন একেক মেনু। রকমারি-বিচিত্র খাবার। যার স্বাদ এখনো ভুলিনি।
ঠিকানা পরিবারের সবাই ছিলেন নিবেদিত। মনে পড়ে ভাবিী (শাহীন ভাইয়ের স্ত্রী), রব ভাই ও ভাবি, সাজু ভাই, দূর থেকে খালেদ ভাইÑঠিকানার আত্মপ্রকাশ ও বেগবান প্রকাশনায় অবদান রেখেছেন নিঃস্বার্থভাবে। সবার ইস্পাতদৃঢ় অঙ্গীকার ছিল, আমরা দাঁড় করাবই। হলোও তা-ই, ঠিকানা দাঁড়িয়ে গেল!
সে সময় ড. শওকত আলী ও তাঁর সঙ্গী অবসরপ্রাপ্ত এক বিচারক (নাম মনে করতে পারছি না) ঠিকানার সেই ছোট্ট রুমে নিয়মিত আসতেন। উৎসাহ-পরামর্শ দিতেন। দূর থেকে, কখনো কাছে থেকে হাজী আব্দুল মালিক, মিসবাহউদ্দিন, আব্দুল রউফ খান মিষ্টু, আব্দুল মোসাব্বিরসহ আরো অনেকে নিয়মিত খোঁজখবর রাখতেন। ঢাকা থেকে আকবর হায়দার কিরণ, পরে মতিউর রহমান চৌধুরী টাটকা ও এক্সক্লুসিভ খবর পাঠিয়ে ঠিকানার অগ্রযাত্রায় অবদান রেখেছেন।
অনেকেই জানতে চান, ওই সময়ে ঠিকানার সাফল্যের নেপথ্যে কী ছিল? আমার মতে, দুটি প্রধান কারণ। এক. স্ক্যাজুয়েল রক্ষা। বৃহস্পতিবার সকালেই স্টোরে স্টোরে পৌঁছে যেত ঠিকানা। কখনোই এর ব্যত্যয় ছিল না। একই দিনে মেইলও হতো। এই অভ্যাস ঠিকানার কাটতিকে স্থায়ী করে।
দুই. কমিউনিটির সঙ্গে একাত্মতা। কমিউনিটি ভাবতে শুরু করে এ কাগজ তো আমাদের, আমাদেরই কথা বলে। সব খবর, সুখ-দুঃখ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কর্মকাÐ সযতেœ প্রকাশ করা হয়। যে ঘরের ভিত্তি মজবুত, সে ঘর টেকে দীর্ঘদিন! ঠিকানার ভিত্তিও মজবুত, তাই দীর্ঘায়ুর প্রত্যাশা খুবই স্বাভাবিক।
লেখক : নিউইয়র্ক প্রবাসী সাংবাদিক।