সিদ্ধান্ত নিতে কেন দেরি করছেন শেখ হাসিনা?

ঢাকা অফিস : রাজনৈতিক দুর্যোগ কিংবা সাধারণ যেকোনো সংকটে চটজলদি সিদ্ধান্ত নিতে সিদ্ধহস্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু এই করোনাভাইরাস মহামারিকালে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে কিছুটা বিলম্ব করছেন প্রধানমন্ত্রী।
চারবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যতবার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছেন ততবার তাঁর সরকার পরিচালনার প্রাজ্ঞতা, বিচক্ষণতা এবং দূরদৃষ্টি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। যেসমস্ত যোগ্যতা দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে তাঁর মধ্যে একটি হলো, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিচক্ষণতা। একজন মানুষ সিদ্ধান্ত দ্রুত নিলে কাজ দ্রুত আগায় এবং সঙ্কট মোকাবিলা সহজতর হয়ে যায়। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলে কিছু ভুল সিদ্ধান্ত হতেই পারে, কিন্তু দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চার মেয়াদেই দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা সর্বমহলে প্রশংসিত হন। এমনকি তাঁর সমালোচকেরাও বলেন যে, শেখ হাসিনা কোনো কাজ ফেলে রাখেন না, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন।
১৯৯৬ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা ফাইল নিষ্পত্তিতে দ্রুততা আনার চেষ্টা করেন। কোনো টেবিলেই কোনো ফাইল যেন ২৪ ঘণ্টার বেশি না থাকে সে ব্যাপারে নির্দেশনা জারি করেছিলেন। এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি বৈপ্লবিক ভূমিকা রেখেছিল বলে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। আবার ১৯৯৬ থেকে ২০০১ এবং ২০০৯ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত শেখ হাসিনা কোনো কাজ ফেলে রাখেননি। সবসময় দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং দ্রুত বাস্তাবায়নের ক্ষেত্রে তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু সেই শেখ হাসিনাই এখন সিদ্ধান্ত গ্রহণে দেরি করছেন বলে নানা মহলে আলোচনা হচ্ছে।
এক মাসের বেশি সময় হয়ে গেছে মৃত্যুবরণ করেছেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শেখ মো. আব্দুল্লাহ। কিন্তু এখন পর্যন্ত ধর্ম মন্ত্রাণালয়ে কোনো মন্ত্রী নিযুক্ত করা হয়নি, সেই পদটি এখনো খালি পড়ে আছে। আবার মজার ব্যাপার হলো যে প্রতিরক্ষা সচিবের মৃত্যুর পরপরেই প্রতিরক্ষা সচিব হিসেবে নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন উঠেছে ধর্মপ্রতিমন্ত্রীর পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি রয়েছে কেন?
শুধু তাই নয়, যেমন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে নিয়ে বিপুল পরিমাণ সমালোচনার পরেও তাঁকে আসলে সরিয়ে দেওয়া হয়নি। তিনি পদত্যাগ করেছেন। যদিও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, তাঁর পদত্যাগ ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। কিন্তু যদি সরকার তাঁকে বরখাস্ত করে দিতো, তাহলে সরকারের ইমেজ আরো ভালো হতো বলে মনে করে অনেকেই। এক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রী কোনো সিদ্ধান্ত দেননি, বরং আবুল কালাম আজাদই সরে দাঁড়িয়েছেন। কেন শেখ হাসিনা এরকম সিদ্ধান্ত দিতে দেরি করছেন সে ব্যাপারে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিভিন্ন ধরণের মতামত দিয়েছেন।
প্রথমত তাঁরা মনে করছেন যে, শেখ হাসিনা ধীরে-সুস্থে ভেবেচিন্তে কাজ করছেন। কারণ করোনার কারণে এমন একটি বৈশ্বিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেটা সম্পূর্ণভাবে নতুন এবং এই ব্যাপারে চটজলদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো উপায় নেই। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ অন্য সময়ের তুলনায় বিলম্বিত হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আগে করার প্রবণতা। ধর্ম মন্ত্রণালয়ে যেহেতু একজন সচিব আছেন এবং এই মন্ত্রণালয়টির দায়িত্ব প্রতিমন্ত্রী পালন করতেন অর্থাৎ আসলে এই মন্ত্রণালয়টি প্রধানমন্ত্রীর উপরেই ন্যস্ত ছিল। কাজেই চটজলদি করে একজন প্রতিমন্ত্রী দেওয়ার থেকে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আগে সেরে ফেলা দরকার। কারণ করোনা এবং বন্যা মোকাবিলার জন্যে সরকারকে এখন অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হচ্ছে। এর মধ্যে এরকম পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে ভুল বার্তা যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তৃতীয়ত সকলে মনে করছে যে, শেখ হাসিনা এখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অনেক ভাবনাচিন্তা করছেন। এই সিদ্ধান্তগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং পারিপার্শ্বিক প্রতিক্রিয়া কি হবে তা চিন্তা করছেন, এই কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁর অন্য সময়ের তুলনায় বিলম্ব হচ্ছে। তবে করোনা সঙ্কটের সময় একটি বিলম্বিত সিদ্ধান্তের তুলনায় একটি ভুল সিদ্ধান্ত অনেক বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে বলে এই বিবেচনা থেকে প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে একটু ভেবেচিন্তে, ধীরে চলো নীতি অনুসরণ করছেন বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।