সিরিয়াকে রাশিয়া, তুরস্ক ও ইরানের হাতে সঁপে দিয়ে ট্রাম্পের রণে ভঙ্গ

মঈনুদ্দীন নাসের : সিরিয়ায় অবশিষ্ট ইসলামিক স্টেট বাহিনীকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদুগানের হাতে শপে দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পিছুটান দিয়েছেন। প্রত্যাহার করছেন মার্কিন সেনাবাহিনী। মিত্রদের সাথে পরামর্শ নেই, নিজের কেবিনেট সচিবদের সাথে পরামর্শ নেই, দেশের পরিকল্পনাবিদদের সাথে পরামর্শ (বাকি অংশ ৮৭ পাতায়)
সিরিয়াকে রাশিয়া, তুরস্ক
(প্রথম পাতার পর)
নেই- ডোনাল্ড ট্রাম্প তার এক টুইটের মাধ্যমে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন সিরিয়ার আইএস-এর সাথে যুদ্ধরত মার্কিন সেনাবাহিনী। তার প্রতিরক্ষা সচিব জেনারেল মেটিস এর পরামর্শও তার কাছে অগ্রাহ্য। তাই সেনা প্রত্যাহারের প্রতিবাদে পদত্যাগ করেছেন মেটিস। তাকে অনুসরণ করেছেন আইএস-এর বিরুদ্ধে কোয়ালিশনে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য আমেরিকার প্রতিনিধি ম্যাকরুস। সিরিয়া থেকে আমেরিকার সৈন্য প্রত্যাহার বিশ্ব মঞ্চ থেকে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক গুটিয়ে নেয়ার এক ক্রান্তিকাল। আর এই ক্রান্তিকাল উৎসবে মুখরিত হয়েছে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদুগান, ইরান ও রাশিয়ায় ট্রাম্পের মেনটর প্রেসিডেন্ট পুটিন।
আমেরিকার বিশ্ব মিত্ররা মনে করছেন বিশ্ব মঞ্চ থেকে যুক্তরাষ্ট্র তার পাওড়ি গুটাচ্ছে। তারা তার এই পিছুটানের মধ্যে ট্রাম্পের স্লোগান ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এর সত্যিকার অর্থ খোঁজার চেষ্টা করছে। গত ১৪ ডিসেম্বর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদুগান ট্রাম্পের সাথে ফোনে কথা বলেন। আর তারপর ট্রাম্প যখন গত সপ্তাহে সিরিয়া থেকে সেনা প্রত্যাহারের কথা ঘোষণা করলেন তখন এরদুগান তার কূটনৈতিক বিজয় দাবি করলেন। এরদুগান এর দাবি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ডিফেন্ড করে বললেন ‘তুরস্ক ইসলামিক স্টেটের যা কিছু অবশিষ্ট আছে তার মোকাবেলা করতে পারবে।’
অথচ এরদুগানের সাথে টেলিফোন আলাপে ট্রাম্পের বলার কথা ছিল তার ধৈর্য পরীক্ষা না করতে। আর একই সাথে সিরিয়ার সামরিক হুমকি দেয়ার কথা বলছে।
তার পরিবর্তে ১৪ ডিসেম্বর দীর্ঘ ফোনালাপে ট্রাম্প তার ইনার সার্কেলসহ সকল মহলকে তাক লাগিয়ে দেন। তিনি এরদুগানের পরামর্শ মতো পেন্টাগনের সিরিয়া কৌশল ঘুরিয়ে দেয়ার কথা মেনে নিলেন।
এরদুগান ও ট্রাম্পের মধ্যে কথাবার্তায় সরাসরি সাক্ষী আছেন এমন সূত্র থেকে বলা হয় আলাপের সময় এরদুগান ট্রাম্পের ওপর চাপ দেন একথা ব্যাখ্যা করতে যে, ইসলামিক স্টেটকে পরাজিত করার পর আজও কোন উদ্দেশে সিরিয়ায় আমেরিকান সৈন্য অবস্থান করছে। এরপর ট্রাম্প এরদুগানের যুক্তি মেনে নেন। তার রিপাবলিকান মিত্র ও অন্যদের কাছ থেকে সমালোচনা শোনার পর ট্রাম্প ২২ ডিসেম্বর শনিবার আবার বলেন, ‘আইসিস ব্যাপকভবে পরাজিত। আর তা হলো ১৯ ডিসেম্বর টুইটে যা বলা হয়েছে ‘আমরা সিরিয়ায় আইসিসকে পরাজিত করেছি। ডিসেম্বর ১৪ তারিখের ফোন কলের পর ট্রাম্প বলেন, এরদুগানের কথার একটা পয়েন্ট আছে আইসিসি এর পরাজয় নিয়ে। তার দীর্ঘদিনের বিশ্বাসের পুনরাবৃত্তি করে তিনি বলেন, আমেরিকায় সৈন্যবাহিনী সিরিয়া থেকে সরে আসা উচিত যেকোনভাবে। আমেরিকান কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করে ট্রাম্পের মনোবৃত্তির কথা প্রকাশ করেন।
তারপর ট্রাম্প তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনকে জিজ্ঞেস করেন, যথাশীঘ্র সৈন্য প্রত্যাহার সম্ভব কিনা। বোল্টন হ্যাঁ সূচক জবাব দেন এবং সাথে সাথে তা শুরু হয়ে গেল।
অবশেষে সিরিয়া থেকে আমেরিকা তার ২০০০ সেনা সদস্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। আর তাতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মঞ্চকে রাশিয়া ও ইরানের প্রভাবে ফেলে দেয়া হয়। ট্রাম্প ইরানকে শত্রু বানাতে গিয়ে ইরানের পক্ষেই তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। সিরিয়ার বশর আল আসাদকে রক্ষা করার অন্যতম মিশন হচ্ছে ইরানের। আর তার এই সিদ্ধান্ত সৌদি আরবকেও অনেকটা শঙ্কিত করবে। শিয়া প্রভাবিত মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তে বিজয় অনুভব করছে। অন্যদিকে খাশোগি হত্যাকারী সন্দেহে অভিষিক্ত সৌদি রাষ্ট্রমহল, সুন্নি ও কুর্দিরা ভীতসন্ত্রস্ত। এরদুগান অন্যদিকে তার দেশে হিরো বনে গিয়েছেন। তার জয় জয়কার এ জন্য যে, তুরস্কবিরোধী সিরিয়ার অবস্থিত শত্রুদের ঘায়েল করতে সুযোগ সৃষ্টিতে তাদের প্রতি ওয়াশিংটনের সমর্থনকে প্রত্যাহার করে নিতে রাজি করানোর কাজে সফল হয়েছে। অর্থাৎ কুর্দিস জঙ্গিদের যাদের (ওয়াইপিজি) বলা হয় তাদের নাস্তানাবুদ করার পথ রচিত হয়েছে তুরস্কের জন্য। উত্তর সিরিয়ায় যুদ্ধ করতে এই কুর্দিরা আমেরিকার সাথে জোটবদ্ধ ছিল। কিন্তু তারা তুরস্কের মঞ্চে সিরিয়ায় অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসীদের সাথে ঐক্যবদ্ধ। এরদুগান দীর্ঘদিন ধরে এই কুর্দিদের নিশ্চিহ্ন করতে চায়। আর তার সাথে বশরের সন্ত্রাস বিরোধী শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়।
এই পরিস্থিতি সৃষ্টির মধ্য দিয়ে এরদুগান একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের মূল খেলোয়াড় হয়ে উঠেছে এবং আমেরিকায় পররাষ্ট্র নীতির একজন নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর সেজন্য তিনি মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে পাস কাটিয়ে আমেরিকায় সেনাবাহিনী বের করে আনতে ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য অস্থির মানসিকতাকে কাজে লাগাতে পেরেছে। আর তার এসব ঘটেছে যখন নতুন করে আমেরিকার ট্যারিফ নিয়ে ট্রাম্প ও এরদুগান এর মধ্যে মন কষাকষি চলছে। তুরস্ক যখন আমেরিকায় এক ধর্মযাজককে মুক্তি দিতে অস্বীকার করেছে, আর এরদুগান ২০১৬ সালে ব্যর্থ ক্যু এর জন্য দাবি করেন এমন এক ধর্মযাজককে আমেরিকা থেকে ফেরত পাঠানোর দাবি করছেন। ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল মুখপাত্র গ্যারেট মারফিল ট্রাম্প এরদুগানের টেলিফোন আলাপকে যেভাবে দেখা হয়েছে তা নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, বিষয়টা যা ঘটেছে তার মিথ্যা প্রচার। হোয়াইট হাউজ কয়েক মাস ধরে ট্রাম্প বিদেশি নেতাদের সাথে যে সব কথা বলছেন তার রুটিন মাফিক কোনো বর্ণনা দিচ্ছে না।
এরদুগান গত অক্টোবর মাসে ওয়াশিংটন পোস্ট কলামিস্ট মোকাবিলা করেছে, আর তা থেকে যে কূটনৈতিক পুঁজি হাতিয়ে নিয়েছে তা যথাযথভাবে ব্যবহার করেছে। জামাল খোশোগিকে ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটে সৌদি অফিসিয়ালদের একটি টিম হত্যা করেছে। তুরস্ক কৌশলে এমনভাবে সংবাদ তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়াতে প্রকাশ করেছে যাতে ট্রাম প্রশাসন ও সৌদি ক্রাউন প্রিন্স অনৈসলামিক চরিত্রের ইসলামিক নেতা মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। সাবধানতার সাথে তুরস্ক এমন কিছু প্রকাশ করেনি যাতে যুক্তরাষ্ট্র বা তার কোনো নেতা কোনো প্রকার বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের কোভেনট্রি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-পরিচালক আলপালান ওয়াজেরডেস এর মতে কিন্তু এরদুগানের এই কূটনৈতিক ভাবাবেগ ধরে রাখার জন্য এবং তার আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানোর জন্য তার খাশোগি হত্যাকা- অথবা আমেরিকায় সৈন্য প্রত্যাহার ছাড়াও অন্যান্য বিষয়ের প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এরদুগান এক উচ্চাভিলাষী নেতা। তিনি মনে করতে পারেন সিরিয়া থেকে আমেরিকার সেনাবাহিনী প্রত্যাহার এমন একটা মুখোশ যাকে কাজে লাগিয়ে তিনি বিশ্ব নেতৃত্বে আসীন হবার লক্ষ্য অর্জন করতে পারেন। আর সে জন্য মধ্যপ্রাচ্য আমেরিকা ও ইসরাইলের প্রতি সর্বোচ্চ হুমকি ইরানের বিরুদ্ধে একটি অবস্থান নিতে সুযোগ এনে দিবে।
তুরস্ক দেখছে সিরিয়ায় বসর আল আসাদকে সমর্থনকারী ইরানের সৈন্যদের বের করতে সেখানে কোনো সক্ষম গ্রাউন্ড কোর্স নেই। আর এ বিষয়ে সিরিয়ার আট বছরের সিভিল ওয়ার নিয়ে তুরস্কের কূটনীতিকরা আমেরিকায় সহকর্মীদের বুঝিয়েছেন। আমেরিকার পজিশন ছিল সিরিয়ায় ইরানের সৈন্যের উপস্থিতি মোকাবেলায় আমেরিকান সৈন্যের উপস্থিতি প্রয়োজন। কিন্তু ট্রাম্পের সেনা প্রত্যাহারের কারণে এই প্রয়োজন মুছে ফেলা হলো। আমেরিকায় সেনা প্রত্যাহারের পর সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণে এখন মস্কো, আঙ্কারা ও তেহরান অধিক ক্ষমতাবান। তারা ইতিমধ্যে সিরিয়া সম্পর্কে আলোচনায় ত্রিপক্ষীয় মতামতের প্রাধান্য দেয়। সেখানে ওয়াশিংটনের অবস্থান এক পাশে। কিন্তু পর্দার অন্তরালে আঙ্কারায় রয়েছে ইরান ও রাশিয়া সম্পর্কে অবিশ্বাস। অন্তত পশ্চিমাদের তাই-ই ধারণা। তবে তুরস্কের কথাবার্তায় মনে হয় যে, আমেরিকার চলে আসার পর থেকে রাশিয়া ও ইরান কুর্দিদের সাথে সহযোগিতা করে পথ চলতে পারে। আর সেখানে তুরস্কের সাথে নতুন সংঘর্ষ বাধতে পারে।
ওজেরডেস বলেন, এরদুগান এই বিষয়ে ওয়াকিবহাল। কুর্দিদের সাথে যুদ্ধ ছাড়াও সিয়িয়ায় আরও অনেক বড় কাজ রয়েছে। সেজন্য তুরস্ককে ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে আমেরিকার সাথে গাঁটছড়া বাঁধতে হবে।
ইসলামিক স্টেটের সাথে যুদ্ধরত বিশ্ব কোয়ালিয়শন আমেরিকার প্রতিনিধি ব্রেট ম্যাকগুরুক পদত্যাগ করেছেন ম্যাটিস এর পদত্যাগের পর। এ মাসের শুরুতে ওবামা প্রশাসনের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত ম্যাকগুরুক তার মধ্য ফেব্রুয়ারির পদত্যাগের পরিকল্পনা সৈন্য প্রত্যাহারের পর এগিয়ে আনেন।
ট্রাম্পের একক সিদ্ধান্তকে ইউরোপে মনে করা হচ্ছে তা সংকটের সকাল। অনেক দেশ আমেরিকার সাথে সম্পর্ককে পুনরায় পরিমাপ করছে। বিশেষ করে ট্রাম্পের সাথে সম্পর্ক। ট্রাম্প তার ট্রেডিশনাল সহযোগীদের তার প্রতিযোগী ভাবছেন। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে জাপান, ফ্রান্স থেকে জার্মানি, ন্যাটো জোটের অন্যান্য দেশ এবং এসব দেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা কীভাবে ওয়াশিংটনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির ওপর কম নির্ভর করে পথ চলা যায়, তা খতিয়ে দেখছে। তাদের মি. মেটিসের ওপর ভরসা ছিল। কিন্তু এখন সে ভরসা কচুপাতার জলের মতো গড়িয়ে পড়েছে। ট্রাম্প কি এরদুগানের তুরস্ক ও ইরানের মধ্যে যে বিরোধ তাকে কাজে লাগানোর চিন্তা করছেন না সংকটের চোরাবালিতে পড়ে গেছেন তা সময়ই বলে দেবে।