সিলেটে থামছে না যৌন নির্যাতন

সিলেট : যৌন নির্যাতন থামছেই না সিলেটে। বিকৃত মানসিকতার কারণে প্রায়ই ঘটছে এই লোমহর্ষক ঘটনা, ঘটছে ঘরে-বাইরে সর্বত্রই। স্কুল-কলেজে যাওয়ার পথে প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়া, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে সম্পর্ক স্থাপন, পরে এসব নিয়ে হচ্ছে খুনোখুনিও। বিকৃত মানসিকতা থেকে মুক্তি পাচ্ছে না শিশুরাও। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে তা ইন্টারনেটে।
সিলেটে গত এক বছরে লোমহর্ষক খুনের ঘটনা ঘটেছে বেশ কয়েকটি। কিছু ঘটনায় মামলা হয়েছে থানায়, আবার অনেক ঘটনায় আসামিরা রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। আবার কোনো কোনো ঘটনায় মুখ খোলেননি কেউ কেউ। সব মিলিয়ে সিলেটে একের পর এক নির্যাতনের ঘটনায় উদ্বিগ্ন সুধী মহল। শুধু সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) ৮ মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে কয়েকশ।
ওসিসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ৮ মাসে সিলেটে ৩৭২ নারী ও শিশু ধর্ষিত ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। হাসপাতালের ওসিসিতে এসে চিকিৎসা নিয়েছেন তারা। এর মধ্যে ২৩১ জন ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার, শারীরিক নির্যাতনের শিকার বাকি ১৪১ জন। এদের অনেকেই নির্যাতিত হয়েছেন স্বামী ও পরিবারের লোকজনের হাতে। এর মধ্যে জুলাইয়ের ৬১টির মধ্যে ৩৪টিই ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির ঘটনা।
সিলেট সদর উপজেলার খাদিমনগর বড়জান চা বাগান এলাকায় চার বছরের এক শিশু ধর্ষণের শিকার হয় গত ২৯ এপ্রিল। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসিতে ভর্তি করা হয়। ধর্ষক চা বাগানের লেবার ও কোয়ার্টারের বাসিন্দা
গওহর মিয়ার ছেলে কাজলকে আটক করেছে পুলিশ। চকলেট দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ওই শিশুকে ধর্ষণ করেছিল কাজল।বখাটে ইয়াহিয়া সন্দার ১৬ ডিসেম্বর রাতে সুনামগঞ্জের আনোয়ারপুর গ্রামে বাসায় ঢুকে ছুরিকাঘাত করে দশম শ্রেণির ছাত্রী হুমায়রা আক্তার মুন্নিকে। মারা যায় সে। এ ঘটনায় প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় পুরো সিলেটজুড়ে। হত্যাকারীর গ্রেফতারের দাবিতে সিলেটের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধনসহ পালন করা হয় নানা কর্মসূচি। সচেতন মহলের চাপে অবশেষে পুলিশ গ্রেফতার করে বখাটে ইয়াহিয়াকে।
ওসমানীনগরের ব্রাহ্মণশাসন গ্রামের ১৭ বছরের এক কিশোরী প্রেমিকের কথামতো তাজপুর কদমতলায় আসে গত ১৫ নভেম্বর। প্রেমিককে না পেয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক ছমির মিয়ার খপ্পরে পড়ে সে। প্রেমিকের বাড়ি নিয়ে যাওয়ার কথা বলে একটি গ্যারেজে আটকে রেখে ধর্ষণ করে তাকে। পরে চকবাজারের অটোরিকশা গ্যারেজ থেকে আটক করা হয় ধর্ষক ছমির মিয়াকে।
এ বছরের ১২ মে জৈন্তাপুরে ধর্ষণের শিকার হন এক গৃহবধূ (৩০) ও তার মেয়ে (১৬)। তাদের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসিতে (ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার) ভর্তি করে পুলিশ। জৈন্তাপুর থানার ওসি সফিউল কবির জানান, ডেমা গ্রামের কালাই মিয়ার ছেলে রাজমিস্ত্রি নিমার আহমদ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে মা ও মেয়েকে ধর্ষণ ও ভিডিও ধারণের বিষয়টি স্বীকার করে। যৌন সম্পর্কের ২৫টি ভিডিওচিত্র ভাইরাল হওয়ার পরই রিকশাচালক স্বামী আবদুর রশিদ তালাক দেন তাকে।
জগন্নাথপুর উপজেলার পাটলী ইউনিয়নের দরিদ্র এক কৃষকের মেয়ে ধর্ষণের শিকার হন এ বছরের ২ আগস্ট। একই ইউনিয়নের কাছিমপুর গ্রামের আবু মিয়ার ছেলে অটোরিকশাচালক ইউনুস মিয়াসহ দু-তিনজন রাস্তা থেকে তাকে জোর করে অটোরিকশায় তুলে নিয়ে ধর্ষণ করে। এ ঘটনার বিচার চাইতে গিয়ে চরমভাবে অপমানিত হন তার বাবা। অপমান সহ্য করতে না পেরে ক্ষোভে-দুঃখে বিষপানে আত্মহত্যা করে মেয়েটি।এ ব্যাপারে যৌন হয়রানি নির্মূলকরণ নেটওয়ার্ক সিলেটের আহ্বায়ক ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ওসিসি এবং পুলিশের হিসাবের বাইরে অসংখ্য ঘটনা রয়েছে, যেগুলো রয়েছে অন্তরালে। পারিবারিকভাবে নির্যাতিত হলেও সম্মানের কথা চিন্তা করে মুখ খুলতে চান না অনেক নারী। নারী নির্যাতন বন্ধ করতে হলে ছেলে এবং মেয়েকে নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে পারিবারিকভাবে। নারী নির্যাতন নির্মূলের জন্য মেয়েদের উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজগুলোর সামনে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা জরুরি।
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সিলেট বিভাগীয় সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট সৈয়দা শিরিন আক্তার বলেন, অল্পবয়সী তরুণরাই অসহিষুষ্ণ হয়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকা-ে। সামাজিক মূল্যবোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বাড়ালে এসব অপরাধ থেকে উত্তরণ ঘটতে পারে।
মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার আবদুল ওয়াহাব এ ব্যাপারে বলেন, ঘটনা ঘটছে, আসামিরাও ধরা পড়ছে। সচেতন হতে হবে আমাদের। ছেলেমেয়েরা কখন কী করছে একটু খেয়াল নিতে হবে মা-বাবাদের। অভিভাবকরা সচেতন হলে অনেক ঘটনাই রোধ করা সম্ভব।