সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের ৪ কি. মি. ভূমি নদীগর্ভে

নিজস্ব প্রতিবেদক : সীমান্তবর্তী ১৫টি নদীর তীর ভাঙন থেকে বাংলাদেশের ভূখ- রক্ষা করা যাচ্ছে না। নদীর প্রবল ভাঙনে নদীপাড়ের জমি এবং বসতবাটি নদীর বুকে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বাস্তুহারা হচ্ছে শত শত মানুষ। গত ১০ বছরে নদীতীরের প্রায় চার কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। নদীর ভাঙন অব্যাহত থাকার পরও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ড এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে সীমান্ত এলাকার নদীতীর সংরক্ষণের কাজে হাত দেয়নি। এ-সংক্রান্ত কোনো প্রকল্পই বাস্তবায়ন করা হয়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ-ভারত ও বাংলাদেশ-মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকায় এই নদীগুলো প্রবাহিত। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী এলাকায় ১২টি নদী রয়েছে। এর মধ্যে আটটি নদী খুবই খর¯্রােতা। বর্ষাকালে সবগুলো নদীতেই প্রবলস্রোত থাকে। এর ফলে সীমান্তবর্তী এলাকা ব্যাপকভাবে প্লাবিত হয় এবং নদীতীরে তীব্র ভাঙন দেখা দেয়। ফেনী, সিলেট, চট্টগ্রাম, নবাবগঞ্জ, নওগাঁ, লালমনিরহাট, ডালিয়া, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, পঞ্চগড়ের সীমান্তবর্তী এলাকা নদীর তীর ভাঙন কবলিত হয়। এ নিয়ে দুই দেশের যৌথ নদী কমিশন এবং বিজিবি-বিএসএফের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে সীমান্ত নদীর তীর প্রতিরক্ষা কাজ সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নে পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়ে সম্মত সিদ্ধান্ত হয়। সীমান্তবর্তী নদীগুলোর ভাঙন রোধে ১৯৯৮-৯৯ সালে সীমান্ত নদী সংরক্ষণ ও উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্প নেওয়া হয়। এই প্রকল্পের আওতায় ৫০ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকার নদীতীর সংরক্ষণ কাজ সম্পন্ন করা হয়। এ কাজ শেষ হয় ২০০৭-০৮ সালে। এরপর বিগত ১০ বছরে সীমান্তবর্তী নদীগুলোর অবশিষ্ট এলাকায় কোনো সংরক্ষণ কাজ করা হয়নি। সীমান্তবর্তী নদীগুলোর তীরবর্তী এলাকাসমূহে ব্যাপক ভাঙনের পরও পানি উন্নয়ন বোর্ড এ ব্যাপারে আর কোনো পরিকল্পনা নেয়নি। ২০১৭ সালের ২-৭ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে কারিগরি সভায় বিনিময়কৃত তালিকা বিএসএফকে হস্তান্তর করা হয়। উভয় পক্ষ যৌথ নদী কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তীর সংরক্ষণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযোগিতা প্রদানে একমত হয়। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে কোনো কার্যক্রম নেওয়া হয়নি।
অব্যাহত ভাঙন থেকে বাংলাদেশের ভূখণ্ড রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড শেষ পর্যন্ত একটি প্রকল্প নিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১০টি বিভাগের আওতাধীন ৭৮টি প্যাকেজে ৩৪ দশমিক ০৯৭৪ কিলোমিটার নদীর তীর সংরক্ষণ কাজের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদনও নেওয়া হয়। মোট প্রকল্প ব্যয় নির্ধারিত হয় ৪৪৭ কোটি ৫৩ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। এজন্য দরপত্র আহ্বান করা হলে বেসরকারি ১০টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। কিন্তু প্রত্যেকের কোট করা দরই ছিল অনেক বেশি। পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ এদের মধ্যেই দুটি প্রতিষ্ঠানকে বেছে নেয় এবং তাদের মধ্য থেকে যেকোনো একটিকে বেছে নেওয়ার পক্ষে মত দেয়। কিন্তু দুটি প্রতিষ্ঠানের দরই প্রাক্কলিত দর অপেক্ষা অনেক বেশি। একটির ৭০ কোটি টাকা, অপরটির ৬৫ কোটি টাকা বেশি। তৎকালীন পানিসম্পদমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এতটা অধিক রেটে কাজ দেওয়ার বিপক্ষে অবস্থান নেন। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মাধ্যমে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের পক্ষে মত নেন। নৌবাহিনী খুলনা শিপইয়ার্ডের মাধ্যমে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেশ কয়েকটি প্রকল্প ইতিপূর্বে সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে।
নৌবাহিনীর পরিচালনায় খুলনা শিপইয়ার্ড প্রকল্প বাস্তবায়নে গভীর আগ্রহ দেখায়। তারা প্রাক্কলিত দর অপেক্ষা মাত্র শূন্য দশমিক ৯৭৩ শতাংশ বেশি রেট দেয়। মন্ত্রণালয় এতে সম্মত হয় এবং ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিও অনুমোদন দিয়েছে। আসন্ন শুকনো মৌসুম থেকে কাজ শুরু করা হবে। শেষ করা হবে তিন বছরের মধ্যে।