সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থা

সুদ ভিত্তিক অর্থনীতি সকল অপরাধের জননী। রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত ও আইনসম্মত হওয়ায় মানুষ সুদের দ্বারা শোষিত ও বঞ্চিত হলে প্রতিকার পাওয়া যায়না। ফলে অব্যাহতভাবে মানুষ সুদভিত্তিক অর্থনীতির যাঁতাকলে নিষ্পেষিত হয়। ফলশ্রুতিতে নৈতিকতা হারিয়ে অধিকাংশ মানুষ লোভের বশবর্তী হয় এবং সুদের কারবারে জড়িয়ে পড়ে। এ ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টি হওয়ায় মানুষ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে এবং ঘুষ ও দুর্নীতি মাথা চাড়া দিয়ে উঠে।
বাংলাদেশসহ বিশ্বে ৫৭টা মুসলিম দেশের কোন দেশেই ইসলামী পদ্ধতির সুদবিহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু নেই। মূলত অর্থই হল মানুষের জীবন যাপনে চালিকা শক্তি। অর্থ ছাড়া মানুষের পার্থিব জীবন অচল। প্রাত্যহিক জীবনের নিত্য অপরিহার্য লেন-দেন মানুষ অর্থের সাহায্যেই সম্পন্ন করে। তাই সুদভিত্তিক সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় আমরা প্রত্যেকেই ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় সুদের সাথে জড়িয়ে পড়েছি। এমনতর ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও সুদবিহীন প্রকৃত ইসলামী দর্শন ও চেতনাসম্পন্ন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করার কোন উদ্যোগ বিশ্বের কোন মুসলিম দেশই নিচ্ছেনা। উদাহরণ স্বরূপ প্রায় ৯২% মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশও সুদভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা দ্বারা চালিত ও নিয়ন্ত্রিত। ৯২% মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশের ও মত বিশ্বের বহু মুসলিম দেশে সুদবিহীন অর্থ ব্যবস্থা সুহবিহীন অর্থ ব্যবস্থা নেই। মুসলিম বিশ্বে সুদবিহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালুর সম্ভাবনাও নিতান্ত ক্ষীণ।
সুদ : সুদ হল শোষণের আরেক নাম। ধরুন আপনার নিকট গচ্ছিত ১০০০০০/= (এক লক্ষ) টাকা আছে। উক্ত অর্থ মাছের ব্যবসায় ব্যবসায় খাটাতে গিয়ে আপনি লোকসান করলেন ১০০০০/= (দশ হাজার) টাকা। কাজ সময় অর্থ শ্রম পন্ড হয়ে গেল, তাই সব মিলে লোকসান গুণতে হল। এক্ষেত্রে আপনার কিছুই করার অবশিষ্ট থাকলনা। আর নিজের মূলধন বার্ষিক ১০% সুদে রহিমকে ধার দিলে তার কাছ থেকে বছর শেষে আপনি সুদে-মূলে পাচ্ছেন ১লাখ ১০ হাজার টাকা। রহিমের ব্যবসায়িক ক্ষতি শর্তেও বছর শেষে সে আপনার ১লাখ ১০ হাজার টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হলে আপনি তার বিরুদ্ধে চুক্তি ভঙ্গের মামলা করবেন। এক্ষেত্রে পৈতৃকসূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি বিক্রি করে হলেও সে আপনার টাকা পরিশোধ করল। অথচ রহিম সব কিছু হারায়ে সর্বহারা হয়ে গেল। সুদের দায়ে উচ্ছন্নে যাওয়ার এ ধরনের কোটি কোটি নজির সারা বিশ্বে বিরাজমান। তাই সুদ এবং সুদের দর্শন সব কিছুই প্রকাশ্য জুলুম। সারা পৃথিবীর অর্থনৈতিক বৈষম্যের পেছনে রয়েছে সুদ ভিত্তিক অর্থনীতি। মাত্র ৬২ জন ধনকুবেরের দখলে সারা পৃথিবীর অর্ধেক সম্পত্তি।
টাকার মুদ্রা চালু হওয়ার আগে পৃথিবীতে স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা চালু ছিল। ব্রিটিশ শাসনামলেই কাগুজে মুদ্রার প্রচলন ঘটে। আর ইহুদী এবং খ্রিস্টানদের তৈরি ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা সুদের আন্তর্জাতিকিকরণে বলিষ্ঠ ভ‚মিকা পালন করছে। মূলধারার পাশাপাশি ইসলামের নামে যে ইসলামী ব্যাংকিং দেখি তার পুরো অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা সুদভিত্তিক ব্যাংকিং হতে শেখা ও নেয়া। তাই ইসলামের নামে চালানো হলেও ইহুদী খ্রিস্টানদের তৈরি ব্যাংকের আদলে তৈরি এবং সকল ব্যবস্থাপনাও তাদের শেখানো পদ্ধতির অনুরূপ। তাই ইসলামের নামধারী ব্যাংকগুলো সুদভিত্তিক ব্যাংকগুলোর ন্যায় আচরণ করে। সোজা কথা – মুসলিম জাতি কতটা চিন্তা চেতনা দর্শন বিজ্ঞানে দেউলে হয়ে আছে তা এই সকল ইসলাম নামধারী ব্যাংকগুলোর দিকে লক্ষ্য করলেই বুঝা যাবে।
প্রথিতযশা জ্ঞানতাপস ড: মো: শহীদুল্লাহর “গল্পের রূপান্তর” প্রবন্ধটি থেকে জানা যায়, জনৈক ঋৃষি ইঁদুরকে বিড়ালের আক্রমণ হতে বাঁচাতে তাকে বিড়াল বানালেন। অতঃপর তন্ত্র বলে বিড়ালকে কুকুর, কুকুরকে বাঘ এবং সবশেষে বালিকায় রূপান্তরিত করার পর তাকে বিয়ে দিতে গিয়ে বিপাকে পড়লেন। শেষ পর্যন্ত ঋৃষি বালিকার ইচ্ছায় তাকে মূষিক শাবকের সাথেই বিয়ে দিলেন। তেমনি সুদভিত্তিক ব্যাংকিং অবকাঠামো, ব্যবস্থাপনা ও দর্শনের ব্যাংকের উপর কিছু ইসলামী নিয়ম কানুন চাপিয়ে দিয়ে তার আগে ইসলাম নামকরণ করলে তা প্রকৃত ইসলামী অর্থ ব্যবস্থা হয়ে যায় না। তাই হাদিসে স্পষ্ট নিষেধ করা হয়েছে, “তোমরা ইহুদী খ্রিস্টানদের অনুরূপ কিছু করো না”।
মুসলিম দেশসমূহের প্রথম অগ্রাধিকারপূর্ণ কাজ হল অর্থ ব্যবস্থাকে সুদবিহীন করা। আর আন্তর্জাতিক সুদভিত্তিক অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ পরিচালনার পাশাপাশি টিকে থাকতে হলে, একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক সম্পন্ন অর্থ ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে যা অন্তত: মুসলিম দেশসমূহে লেনদেন কায়-কারবার করে উদাহরণ সৃষ্টি করা যায় এবং এটা সকল বা অধিকাংশ মুসলিম দেশ মিলে করা সম্ভব। আর এভাবেই মুসলিমরা নিজেদের ইসলামী জীবন যাপনের জন্য প্রথম পদক্ষেপ সম্পন্ন করবে।
বর্তমানে সুদবিহীন ইসলামী অর্থনীতি প্রবর্তন করা জরুরী। অন্যথা পরিবর্তিত বিশ্ব পরিমন্ডলে মুসলমানদের সুদে জড়িয়ে পড়ার সমূত সম্ভাবনা রয়েছে।
নিউ ইয়র্ক।