সুরের যাদুকর আলাউদ্দীন আলী

কামাল হোসেন মিঠু

শরৎবাবুদের কল্যাণে যুগে যুগে প্রেমিকের পাশে ব্যর্থ শব্দটি ক্রেজী গ্লুর মত লেপ্টে আছে। সফল বা ব্যর্থ প্রেমিকের সংজ্ঞা আমি জানি না। শুধু জানি, প্রেমিকের সাথে ব্যর্থ শব্দটি যেন ডাল ভাতের পাশে এক টুকরো কাগজী লেবু। এ ধরনের একটা সময় ছিলো আমারও। উতলা দুপুরে ছন্নছাড়া যুবক মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। এখানে বলে রাখা জরুরী উতলা দুপুর হবে, সেই উতলা দুপরে কাছে দূরে কোকিল, বউ কথা কও, নিদেনপক্ষে একটা ঘুঘু ডাকবে অথচ যুবকের খোঁচা খোঁচা দাড়ি থাকবে না- আমাদের সময় বন্ধুমহলে তা রীতিমত অপরাধ বলেই গণ্য হতো।
যাহোক, যা ভাবছিলাম- সেই মন কেমন করা উদাস দুপুরে গন্তব্যহীন প্রেমিক যখন ব্যর্থ হবার জন্য বড়ই পেরেশান তখন গালে টোলপড়া তরুণী তাকাবে কিন্তু হাসবে না। বেনীটাকে ইচ্ছাকৃত একটু বেশি দুলিয়ে, নাক ফুলিয়ে হেঁটে যাবে। এমন না হলে বিশ্বাস করুন কিচ্ছু ভালো লাগতো না। কন্যার চোখের আগুনে যদি ঝলসেই না গেলাম তবে ঐসব উদাস দুপুর দিয়ে আমি করতামটা কি? বলুন না, উদাস দুপুরে বাউলা বাতাসে আমার কি আসতো যেতো যদি না প্রিয়ার অবহেলাভরা হেঁটে যাওয়ার সেই কলিজা-কাটা মুহূর্তে রহমত ভাইয়ের চায়ের দোকান থেকে ভেসে না আসতো,
-“যদি এমন হতো একটি শ্রাবণ
আমায় কাঁদিয়ে বলে যেত সে
এইতো মরণ,
এ জীবন তবু কিছু না কিছু পেত। একবার যদি কেউ ভালোবাসতো”….।
অথবা সেই গানটি,
-“আমায় দিয়ে ভুল ঠিকানা সে আছে কত দূরে
ছেঁড়া তার ভাঙা সেতার বাজে না আগের সুরে
তবু ফেলে আসা পথে যেতে সমুখে দাঁড়ায়, আমারে কাঁদায়।“
বুকের বামপাশে চিনচিন ব্যথা, প্রিয়ার চকিত চাউনি, আর সে সকল গান- ব্যাস এই হলো সফলতার সাথে একজন ব্যর্থ প্রেমিক হয়ে ওঠার ফর্মূলা। তারুণ্যে আমি একজন সফল ব্যর্থ প্রেমিক ছিলাম। শুধু আমি না, আমাদের পুরো বন্ধুমহলই ছিলো একেকজন চৌকস ব্যর্থ প্রেমিক। আমরা বুকের বোতাম খুলে, গলা ছেড়ে গাইতাম “হয় যদি বদনাম হোক আরো, আমি তো এখন আর নেই কারো।“ কিংবা “সুখে থেকো ও আমার নন্দিনী, হয়ে কারো ঘরণী”। আহা! সেইসব দীর্ঘশ্বাস, অব্যক্ত কষ্ট!! সেইসব সুখের অসুখ!! সেইসব দিন!!
বুঝতেই পারছেন, কোন সে ম্যাজিশিয়ান যার অপুর্ব সৃষ্টি আমাকে সফল করেছিলো একজন ব্যর্থ প্রেমিক হয়ে উঠতে!! আমার তারুণ্যের, আমার যৌবনের সেই অপরিহার্য ম্যাজিশিয়ানের নামটি হলো সুরস্রষ্টা আলাউদ্দিন আলী। তাঁর সুরের যাদুতে আমার তারুণ্য কেটেছে। এই মধ্যবয়সেও বুকের ভেতর ব্যর্থ প্রেমিকটিকে আমি পরম আদরে আগলে রাখতে পেরেছি। তাঁর সুরে বিশ্বাস রেখে আমি জেনেছি, “দুঃখ ভালোবেসে প্রেমের খেলা খেলতে হয়”। “আমার মনের ভেতর অনেক জ্বালা আগুন হইয়া জ্বলে”- আমি আজীবন সেই যন্ত্রণার, সেই আগুনের চাষাবাদ করতে পেরেছি। কৃতজ্ঞ তাঁর কাছে।
ব্যর্থ প্রেমিক দলের এই আমি তাঁর সুরের অমিত উস্কানীতে কোনদিন স্থির হতে পারিনি। সময় খিটমিট করেছে বলে বাহ্যিক পরিবর্তন কিছুটা আনতে হয়েছে বটে, তবে ভেতরের এই আমি সেই বোহেমিয়ান ব্যর্থ প্রেমিকই রয়ে গেছি। নির্দ্বিধায় আমার প্লে-লিস্ট সেই সাক্ষী দেবে,
সাক্ষী দেবে একান্ত সময়ের সুর,
সাক্ষী দেবে “এমনও তো প্রেম হয়, চোখের জলে কথা কয়”,
সাক্ষী দেবে “জন্ম থেকে জ্বলছি মাগো”।
আমার দেশভক্তি সাক্ষী দেবে যতবার আমি গলা খুলে গাইবো,
“আসি বলে আমায় ফেলে সেই যে গেলো ভাই,
তিনভুবনের কোথায় গেলে ভাইয়ের দেখা পাই
দেবো তারই সমাধিতে আমি তোমার হাতের মালা,
আমি জনম জনম রাখবো ধরে ভাই হারাণোর জ্বালা।“
শুনলাম অসুখ আর ওষুধের গন্ধে আমার ম্যাজিশিয়ান ভালো করে শ্বাস নিতে পারছেন না। তাঁর রোদ্দুরের দরজায় খিল দিতে চায় ঝড়। তাঁর আকাশে দৈত্যের মতো দাঁড়িয়ে আছে কালো মেঘ। যাদুকর, আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন বৃষ্টির শব্দ? জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখুন, আমাদের সম্মিলিত আবেদনে কল্যাণীয়া বৃষ্টি নেমেছে। মেঘ কেটে যাচ্ছে দ্রুত। প্রার্থনার অমোঘ শক্তিতে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে ঝড়। তাকিয়ে দেখুন, ভালোবাসার ঈমন -কল্যাণ আপনার শয্যাপাশে দাঁড়িয়ে আছে। হাত ধরে আছে। ওরা সুর তুলেছে, সে সুর বড় পবিত্র, বড় কোমল। একে কি করে অবজ্ঞা করবেন ঈশ্বর!! তিনি তো নিষ্ঠুর নন।

  • নিউ ইয়র্ক।