সুস্থ অঙ্গ কেটে পঙ্গু বানিয়েছে চিকিৎসক, অভিযোগ তসলিমা নাসরিনের

ছবি সংগৃহীত

ঠিকানা অনলাইন : ভারতে বসবাসরত বাংলাদেশের নির্বাসিত লেখক তসলিমা নাসরিন অভিযোগ করেছেন, ভুল চিকিৎসায় পঙ্গু হতে চলেছেন তিনি। চিকিৎসকেরা ভুলে তার শরীরের সুস্থ অঙ্গ কেটে নিয়েছেন। এক সার্জন অস্ত্রোপচার করে তার হিপ জয়েন্ট কেটে ফেলেছেন। সার্জনের ভুল সিদ্ধান্তে পঙ্গু হওয়ার পথে তিনি।

১৯ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার সকালে ফেসবুকে নিজের ভেরিফাইড অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ অভিযোগ করেন। এরপর এ বিষয়ে আরও দুটি পোস্ট দিয়েছেন তিনি।

সকালের পোস্টে তিনি লিখেছেন, “হাসপাতালের বেডে আমার শুয়ে থাকার ছবি দেখে অনেকে ভেবেছে আমার বোধ হয় হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হয়েছে। না, সেসব কিছুই হয়নি। সেদিন ওভারসাইজ পাজামা পরে হাঁটছিলাম ঘরে, পাজামা চপ্পলে আটকে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলাম। অগত্যা যা করতে হয়, করেছি। হাঁটুতে ব্যথা হচ্ছিল, আইস্প্যাক দিয়েছি, ভলিনি স্প্রে করেছি। মনে হলো হাঁটুর লিগামেন্টে হয়তো লেগেছে, কোনো হাসপাতালে গিয়ে এক্সরে করে দেখি কী হলো। গেলাম হাসপাতালে। এক্সরে আর সিটিস্ক্যান করে হাড়ের ডাক্তার বলে দিলেন, পায়ের ফিমার নামের হাড়টির গলায় একখানা ক্র্যাক হয়েছে। এর চিকিৎসা কী, চিকিৎসার জন্য ডাক্তার দুটো অপশন দিলেন, প্রথম অপশন ইন্টারনাল ফিক্সেশন, ফাটলের জায়গাটা স্ক্রু লাগিয়ে ফিক্স করে দেবেন। দ্বিতীয় অপশন হিপ রিপ্লেসমেন্ট, আমার হিপ কেটে ফেলে দিয়ে কিছু প্লাস্টিক মেটাল দিয়ে একটা নকল হিপ বানিয়ে দেবেন। কিন্তু ইন্টারনাল ফিক্সেশনের বিপক্ষে অজস্র বাজে কথা এবং হিপ রিপ্লেসমেন্টের পক্ষে অজস্র ভালো কথা বললেন আমার কানের কাছে।

আমি তার পরও প্রথম অপশনই নেব, যেটিকে সত্যিকারের ট্রিটমেন্ট বলে জানি। জোর দিয়ে বললাম, ফিক্সেশন করব। ডাক্তার খুশি হলেন না ততটা। বললেন ফিক্সেশনে সব সময় ফিক্স হয় না, ৮০% কাজ হয়, কিন্তু ২০% ফেইল করে। আমি বললাম, দেখা তো যাক ফিক্স হয় কি না, হয়তো হবে। সার্জন বললেন, ফিক্স না হলে কিন্তু আবার অপারেশন করতে হবে, আবার ওই হিপ রিপ্লেসমেন্টেই যেতে হবে। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে গেলাম। সকালে অপারেশন, আমাকে ওটিতে নিয়ে যাওয়া হবে, ফিক্সেশন করা হবে।

আচমকা সার্জন এসে বললেন, শুনুন, হিপ রিপ্লেসমেন্ট ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। করলে ওটাই করব। একটুও ভাব্বেন না রিপ্লেসমেন্টের পরদিনই আপনি হেঁটে বাড়ি চলে যেতে পারবেন। আমি সেকেন্ড অপিনিয়নের জন্য সময় চাইলাম। সার্জন খুশি হলেন না। বললেন, অপারেশন এক্ষুনি না করলে প্রব্লেম, ইনফেকশন হয়ে যাবে, এটা সেটা।

হাসপাতালের অন্য দুজন ডাক্তার যাদের আমি চিনতাম, তারাও আমাকে চাপ দিলেন সার্জনের উপদেশ মেনে নিতে, কারণ উনি অনেক বড় সার্জন। অগত্যা আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমাকে রাজি হতে বাধ্য হতে হলো। তারপর কী হলো, আমার হিপ জয়েন্ট কেটে ফেলে দিয়ে টোটাল হিপ রিপ্লেসমেন্ট করা হলো। একটা পঙ্গু মানুষের জীবন আমাকে দেওয়া হলো।

চেতন ফিরলে ব্যাপারটার আরও ভেতরে গিয়ে দেখলাম, যাদের হিপ জয়েন্টে প্রচণ্ড ব্যথা, বছরের পর বছর হাঁটতে বা চলতে ফিরতে পারে না, হিপ জয়েন্ট যাদের স্টিফ হয়ে গেছে জয়েন্টের রোগে, রিউমাটয়েড আর্থাইটিস, জয়েন্টে টিউমার বা ক্যান্সার–তাদের, সেই অতি বয়স্ক মানুষদের, টোটাল হিপ রিপ্লেসমেন্ট করা হয়, কিছুদিন জয়েন্টের যন্ত্রণা কমিয়ে হাঁটাচলা করতে যেন পারে। আমি ছিলাম এক্সারসাইজ করা প্রচণ্ড অ্যাক্টিভ মানুষ, সাইক্লিং, সুইমিং, ট্রেড মিল করছি, দৌড়োচ্ছি। শরীর থেকে ডায়াবেটিস, ব্লাড প্রেশার, ফাইব্রোসিস উবে গেছে। সেই আমাকে সান্ত্বনা দেওয়া হচ্ছে, চিন্তার কিছু নেই, তুমি হাঁটতে পারবে। ফাঁকে এও বলে দেওয়া হলো তবে, কোমোডে বসতে পারবে না, উবু হতে পারবে না, পায়ের ওপর পা রাখতে পারবে না, ওজন বহন করতে পারবে না, নরমাল চেয়ারে বসতে পারবে না, এ রকম হাজারো রেস্ট্রিকশন। এ কেমন জীবন আমাকে দেওয়া হলো! এই পঙ্গু জীবন পেতে কি আমি প্রাইভেট হাসপাতালে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে চিকিৎসা করতে এসেছিলাম!

যখন বুঝলাম ডাক্তার ভীষণ অন্যায় করেছেন, আমাকে ভুল কথা বলে, ভয় দেখিয়ে আমার হিপ কেটে নিয়েছেন, আমি জিজ্ঞেস করেছি, যে কারণে হিপ রিপ্লেসমেন্ট করা হয়, তার একটি রোগও আমার ছিল না, আমার জয়েন্টে কোনো ব্যথা ছিল না, কোনো আর্থ্রাইটিস ছিল না, নেক ফিমারের ফিক্সেশন করতে গিয়ে হিপ জয়েন্ট কেটে কেন ফেলে দিলেন? বললেন তার নাকি মনে হয়েছে ফিক্সেশন কাজ করবে না। একবার ট্রাই করে দেখা উচিত ছিল না? তার উত্তর, ফিক্সড না হলে আবার অপারেশন করতে হতো, সেই ঝামেলায় না গিয়ে পরে যেটা করতে হবে, সেটা আগেই করে দিলাম। আমেরিকানরা অল্প অল্প করে এগোয়, আমরা একটু এগ্রেসিভ, আমরা আগেই শেষটা করে দিই। কিন্তু অপারেশনের দিন তো বললেন, অন্য কোনো অপশন নেই হিপ রিপ্লেসমেন্ট ছাড়া! উত্তর নেই।

উপদেশ এল, আমি যেন একটু পজিটিভ হই। পঙ্গু জীবন নিয়ে ঠিক কী করে পজিটিভ হওয়া যায়, সেটা বুঝতে পারছি না। আমার কাছে মনে হচ্ছে, একটুও বাড়িয়ে বলছি না, মাথায় ব্যথা পেয়ে এসেছিলাম চিকিৎসার জন্য, আমার মাথাটা কেটে নেওয়া হয়েছে। সার্জনদের যুক্তি হলো, মাথা ফেলে দিলে মাথা ব্যথা করবে না।

প্রাইভেট হাসপাতালের টার্গেট মার্কেটের শিকার হলাম। লেখক এবং ডাক্তার হিসেবে হাসপাতালে আমার নাম লেখা হয়নি। ‘বাংলাদেশি রোগী’ হিসেবে লেখা হয়েছে।”

বৃহস্পতিবার রাতে আরেকটি পোস্টে তসলিমা লেখেন, “মানুষকে বিশ্বাস করার ফল কী হতে পারে, যারা বন্ধু নয়, তাদের বন্ধু ভাবার ফল কী হতে পারে, তা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। নিজের জীবন দিয়ে টের পেলাম। হাসপাতালের এক ডাক্তারকে বিশ্বাস করেছিলাম। ভেবেছিলাম তিনি বোধ হয় বন্ধু, তাকে জানিয়েছিলাম যে পড়ে গিয়েছিলাম ঘরে, এক্সরে করতে হবে। সেই বন্ধু আমাকে পাঠিয়ে দিলেন তার হাসপাতালের অর্থোপেডিক ডাক্তারের কাছে, যিনি হিপ রিপ্লেসমেন্টের এক্সপার্ট। সেই এক্সপার্ট শুরু থেকে আমার ফিমারের সামান্য ফ্র্যাকচারের ফিক্সেশন ট্রিটমেন্ট না করে আমার হিপ রিপ্লেসমেন্ট করার জন্য উঠেপড়ে লাগলেন। আমি বাধা দিয়েছি। তিনি বারবার এসেছেন আমাকে কনভিন্স করতে। তিন-চারজন ডাক্তারকে পাঠিয়েছেন কনভিন্স করতে। আমাকে কোনো সময় দেওয়া হয়নি নিজে চিন্তা করতে, বা শুভাকাঙ্ক্ষীদের কারও সঙ্গে কথা বলতে।

যে যে কারণে ‘হিপ রিপ্লেসমেন্ট’ করা হয় তার কোনোটিই তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল না। চিকিৎসাপদ্ধতির গাফিলতির কথা উল্লেখ করে তসলিমা লিখেছেন, ‘যে সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছিলাম, সেই সমস্যার ট্রিটমেন্ট না করে ক্রমাগত মিথ্যে কথা বলে আমার শরীরের সুস্থ অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কেটে নেওয়া হয়েছে। আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না বড় ডাক্তাররা এমন ভয়াবহ ক্রাইম করতে পারেন। আর আমারও বুদ্ধিসুদ্ধি কোথায় গিয়েছিল যে, এমন ক্রাইমের শিকার হতে নিজেকে দিলাম!”

তসলিমা তৃতীয় আরেকটি পোস্টে লিখেছেন, “ধিক্কার দিচ্ছি নিজেকে। ধিক্কার দিচ্ছি এতকালের আমার মেডিক্যাল জ্ঞানকে। আমাকে হাসপাতালে মিথ্যে কথা বলা হয়েছিল যে আমার হিপ বোন ভেঙেছে। আমার জীবনে কোনো জয়েন্ট পেইন ছিল না, জয়েন্ট ডিজিজ ছিল না। আমাকে মিথ্যে কথা বলে, ফিমার ফ্র্যাকচারের ট্রিটমেন্টের নামে আমার হিপ জয়েন্ট কেটে, ফিমার কেটে ফেলে দিয়ে আমাকে সারা জীবনের জন্য পঙ্গু বানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ধিক্কার দিচ্ছি আমি কেন ক্রিমিনাল টিমের ট্র্যাপে পড়লাম। আজ আমি এক্সরে রিপোর্ট দেখলাম আমার। আমার কোথাও কোনো ফ্র্যাকচার হয়নি সেদিন। ফ্র্যাকচার হয়নি বলে আমার হিপ জয়েন্টে কোনো ব্যথা ছিল না, কোনো সুয়েলিং ছিল না।

আমাকে বাংলাদেশি মুসলিম রোগী হিসেবে দেখা হয়েছে। যার কাছ থেকে প্রচুর টাকা নিয়ে অপারেশন করা হবে। সেই নিরীহ রোগী দেশে ফিরে যাবে এবং ভেবে সুখ পাবে যে তার ট্রিটমেন্ট হয়েছে।”

বেশ কয়েক দিন ধরেই ফেসবুকে তসলিমা ‘অদ্ভুত’ সব পোস্ট করছিলেন। কখনো মরণোত্তর দেহ হাসপাতালে দান করার কথা, কখনো-বা তার মৃত্যু হয়েছে- লিখছিলেন এ সবই। তা নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছিল। গত রোববার রাতে তার হাসপাতালে থাকার একটি ছবি পোস্ট করে বিভ্রান্তি আরও বাড়িয়েছিলেন তিনি। এরপর সোমবার একটি পোস্টে লেখেন, ‘এক মুহূর্তে একটি মৃত্যু ঘটেছিল। সেই মৃত্যু আমার উচ্ছল উজ্জ্বল জীবনকে গ্রাস করে নিয়ে একটি স্তব্ধ স্থবির জীবন ফেলে রেখে গেছে। এই জীবনটি আমার নয়, অথচ আমার।’

ঠিকানা/এনআই